০৩ ফেব্রুয়ারি , ২০১৭ ২৩:২৫
চয়ন জামান। ক্ষণকালের একজন অদম্য লড়াকু যোদ্ধা। কলমে, কণ্ঠে, সুতীব্র চিৎকার-ভাষণে, অধিকারের লাল দরজায় সর্বত্র যার বলিষ্ঠ বিচরণ। যাকে আমরা হারাইনি। হারাতে পারি না।
তাকে যদি হারাই তাহলে তো স্পেনের কবি লোরকা, ফরাসি কবি আর্তুর র্যাঁবো থেকে শুরু করে আমাদের ক্ষুদিরাম, সুকান্ত, আবুল হাসান, রুদ্র সবাইকে হারাবো। আমরা কি এইসব ক্ষণজন্মাদের হারিয়েছি? কক্ষনোই না। আমরা আমাদের স্বপ্নগুলোকে হারাতে পারি না। কারণ বেঁচে থাকার অবলম্বন যে এই স্বপ্নগুলোই! তাদের হারালে আমাদের চলবে কি করে? তাঁরা যে আমাদের চেতনায় এক একটা লাল টুকটুকে স্বপ্ন। মানুষ নামের প্রাণীদের এই পৃথিবীটা মানুষের স্বপ্নেই এগিয়েছে। এগিয়ে চলেছে।
চয়ন তার কবিতায় সেই ইঙ্গিতটাও দিয়েছে- পৃথিবীর অতলান্তে ঋদ্ধ হয়েছে যে সীমানা/ সেখানে দাঁড়িয়ে হিসাব রাখে বেঁচে থাকা মানুষ-/ বৃষ্টির পতন/ কত মিলিমিটার/ কত হাজার মিলিমিটার/ জীবন, মৃত্যু আর পতনের মাপকাঠি?
চয়নের সাথে আমাদের হৃদ্যতা গড়ে ওঠেনি এমনি এমনি। ছোট্ট ছেলেটির সেই কচি বয়সের জিজ্ঞাসা, জানার কৌতুহল আমাদের তখনকার ছোট্ট মনে প্রতিফলিত হয়েছিলো। আমরা তাই সহজেই একাকার হয়ে গিয়েছিলাম হাতে হাত ধরে। ছড়া লিখা, কবিতা লিখা, ছোট গল্প আর হাস্যরসের জমানো পাঠশালায়; কিসে নেই আমরা? কুলাউড়ার লাল ইশতেহার কবিতা পরিষদের ব্যানারে কত না অনুষ্ঠান করেছি, নাটক করতে গিয়ে কুলাউড়ায় মার্কস থিয়েটারের জন্মলগ্ন থেকে জড়িয়েছি, লিটল ম্যাগাজিন সংশপ্তক থেকে শুরু করে সাহিত্যের অনেক ছোট-বড় কাগজে লিখেছি। জিয়ন কাঠি সাহিত্য পরিষদের নিয়মিত ভাঁজপত্রে অংশগ্রহণতো আছেই। ঠিকানার সাহিত্য পাতায় প্রতিযোগিতা করে লিখা ছিলো আমাদের স্বভাবের অংশ। সেটা প্রথম দিকের কথা। তারপর অন্যান্য সাপ্তাহিকে সেই স্বভাবটা ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে এক নিঃশ্বাসে আরো অনেক অনেক বলা যায়।
আমাদের সৃজনশীল কর্মকান্ডের ফিরিস্তি বাড়ানো যায়। কত স্মৃতি কত বিস্মৃতি নিয়ে আমাদের পথচলা ছিলো। আমাদের সেই পথচলার সহযোদ্ধা চয়নকে আমরা দেখছি এখন অন্তস্থ চোখ দিয়ে। কষ্টকর হলেও মেনে নিতে হচ্ছে। মেনে নিতে হয় বলে। ‘দাদা, এই বানানটা কি রকম হবে? কিংবা চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তাৎপর্য বা নকশাল বাড়ি নিয়ে ওই ফিল্মটা দেখেছেন কি?’ মুঠোফোনে ওপর প্রান্ত থেকে চয়নের এইরকম প্রশ্নের আওয়াজ আর আসবে না। লাল সালাম জানিয়ে ফোন রেখে দেবার শব্দও না।
চয়ন যা ধারন করতো তা অকপটে বলতো। আমাকে তার চিন্তাটা শেয়ার করতো প্রতিনিয়ত। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে চরম বৈষম্যের ঘেরাটোপে আটকে যাওয়া মানুষগুলো নিয়ে তার ভাবনার অন্ত ছিলোনা। এ নিয়ে অযৌক্তিক কথা বললে সে কাউকে একচুলও ছাড় দিতো না। হোক সে সমাজপতি কিংবা হোমরাচোমরা টাইপের কেউ। এই সৎ সাহসটাই চয়নকে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা করেছে। তার আর আমার মধ্যে সম্পর্কের রসায়নটা ছিলো দারুন। কারণ আমাদের বর্তমান সময়ে আগের সবাই কুলাউড়ার বাইরে চলে গিয়েছে। চিন্তা আর কবিতার পাঠশালায় আমরা হারাধনের মতোই ছিলাম কুলাউড়ায়। গ্রামের বাড়ি থেকে রওয়ানা হওয়ার আগেই আমরা দু’জন মুঠোফোনে যোগাযোগ করেই বের হতাম।
চয়ন কুলাউড়ার সংলাপ পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে ছিলো। সিলেটের প্রাচীন পত্রিকা যুগভেরীসহ অনলাইন পত্রিকাতেও জড়িয়েছিলো নিজেকে। সাংবাদিক হিসাবেও সে সফল। আমি তার অনেক আগে থেকেই একটি জাতীয় দৈনিকের স্থানীয় রিপোর্টার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেও তার মতো এতো অল্প সময়ে এতো কিছু আয়ত্ত করতে পারিনি। কতটুকু নিষ্ঠা আর অধ্যবসায় থাকলে সেটা করা যায় চয়ন তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন- পৃথিবীতে সবাই জিনিয়াস, কিন্তু আপনি যদি একটি মাছকে তাল গাছ বেয়ে ওঠার ক্ষমতা দিয়ে বিচার করেন, তবে সে সারাজীবন নিজেকে অপদার্থই ভেবে যাবে। চয়ন জামান ছিলো সেই রকম একজন স্বাতন্ত্রিক মেধার অধিকারী। এক কথায় জিনিয়াস। আশাবাদী থেকেছে, মানুষকে আশার স্বপ্ন দেখিয়েছে বলায়-লেখায়-উচ্চারণে-সংবাদে। নিজের উপলব্ধি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তার কবিতায়- বিরহীদেরও চলে যাওয়ার তাগিদ এসেছে। সুদূর বিপ্লব/ এখন নিকটবর্তী! এখন দিন আসবে দিনের মত। শঙ্খ/ চিলেরা গাইবে তাদের কোরাস। আগামী সন্ধ্যায়/ তুমি যদি থাকো মেয়ে আমার হাতটি ধরে বিকশিত/ সভ্যতা উজাড় করে আসবে সুদিন। ফাগুনের মোহনায়/ মাখামাখি করে থাকবো দুজন একধাপ প্রজন্মের প্রত্যাশায়!
চয়ন সাংবাদিকতায় এসে এক পরিমন্ডল তৈরি করেছিলো। সে পেয়েছিলো অনেক সাংবাদিক বন্ধু। তাকে সেই বন্ধুরা দিয়েছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধেছে, তাঁর কাছ থেকে পেয়েছে সংবাদের সত্য এবং বস্তুনিষ্ঠ ভাষ্য। যারা তাঁর জীবনের শেষদিনেও পাশে থেকেছে, তাঁর অন্তিম সময়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। আমিও ছিলাম সেইদিন আমার সহযোদ্ধার কাছে। আমি সহ্য করতে পারিনি। আমার দু’চোখ ভিজিয়ে দিয়েছিলো অজস্র কান্নার শ্রাবণ। আমার অনুভূতিগুলো আমি প্রকাশ করতে পারিনি অন্যদের মতো। লিখেছিলাম ফেসবুকে কয়েকটি পংক্তি-
আজ আমার সমস্ত অস্তিত্ব লোনা জলে ঢাকা
আজ আমার সমস্ত ভাষা ম্রিয়মাণ বধির
আমি চিৎকার করে দেয়াল ফাটিয়ে ফেলছি
অথচ সে আওয়াজ আমার অস্তিত্বের চারপাশ ঘিরে-
কেউ তা শুনছে না... কেউ তা বুঝছেনা
আমার স্বপ্নটি সাইত্রিশ বসন্ত পার করে ঝরে গেলো
আমার জিজ্ঞাসা ফিনিক্স পাখি হয়ে উড়ে গেলো
দৃষ্টির বাইরে...
আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠি সহযোদ্ধার জন্য
আমার হৃদয় কেঁপে ওঠে স্বপ্নের জন্য...
চয়ন জামান তুমি বেঁচে আছো আমি, আমাদের, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অন্তরে।
লেখক : সঞ্জয় দেবনাথ, শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক- সাপ্তাহিক সীমান্তের ডাক
আপনার মন্তব্য