মুনেম ওয়াসিফ

২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১৮:৫১

রঘু রাই: একটি মহাকাব্যের সমাপ্তি

ছোটবেলায়, ফটোগ্রাফি শেখার শুরুর সময়টাতেই রঘু রাইয়ের কাজের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। তখনই, রঘু রাই বিশাল এক নাম! তার বিশাল বিশাল সব কফি টেবিল সাইজ বইগুলো মাঝে মধ্যে পাওয়া যায় ঢাকায়—দিল্লি, কলকাতা, তাজমহল। এসব বই কেনার সামর্থ্য তখন আমার নেই। হঠাৎই আমরা তিন বন্ধু মিলে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে, কলকাতা বই মেলায় যাই। সেখানে রোলি বুকসের ছোট্ট একখানা বই, রঘু রাই–ইন হিজ ওন ওয়ার্ডস–বইটা পাই। তখন থেকেই সেই বইটি আমার নিত্য সঙ্গী। বলা যায়, সেই বই থেকেই আলোকচিত্রের সাথে আমার প্রেমের শুরু। পোস্টকার্ডের মতো ভারি ভারি পাতা, গোটা তিরিশেক ছবি, সবগুলো সাদা-কালো। কিছু দিনের মধ্যেই বাধাই খুলে যায়— তবুও জোড়া তালি দিয়ে বইটি প্রতি রাতে একবার উলটেপালটে দেখি। কি অসাধারণ মুহূর্ত ধরবার ক্ষমতা—একেকটা ছবি যেন এক এক মহাকাব্য।

আমার প্রিয় একটি ছবির কথা বলি। পুরানো দিল্লির এক বাড়ীর ছাদ। মধ্যবয়সী এক নারী এবং পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে—পেছন থেকে তোলা। সামনে একটি চেয়ার, পাশে কয়েকটি ড্রাম, আর পিছনে দিল্লির ব্যস্ত রাস্তা। শাড়িপরা ওই নারীর আঁচল বাতাসে উড়ছে, আর মধ্যবয়সী পুরুষ কোমরে হাত দিয়ে প্রেমিক নয়নে তাকিয়ে আছে নারীর দিকে। কী অসাধারণ এক ফ্রেম—ক্লাসিক সিনেমাটিক শট। এরপরও, লেখাটা লিখতে গিয়ে আরও অসখ্য ছবির কথা মনে পড়ছে। বেনারাসের নৌকায় দাঁড়িয়ে থাকা রবি শঙ্কর (১৯৮৬), হিমালয়কে পটভূমি করে ইন্দিরা গান্ধীর সিলুয়েট (১৯৭২), পুরনো দিল্লির সন্ধ্যায় নামাজরত এক নারী (১৯৮২), মল্লিকঘাটে ব্যায়ামরত সাধুবাবারা (১৯৯০), মুম্বাইয়ের চার্চগেট স্টেশনে সংবাদপত্রে ডুবে থাকা দুটি লোক (১৯৯৬), কিংবা দার্জিলিংগামী ট্রেনের জানালা থেকে বাইরে তাকিয়ে থাকা উদাসী যুবক (১৯৯৫)—এমন অসংখ্য মুহূর্তের ছবি তুলে গেছেন রঘু রাই।

রঘু রাইর কাজে আমরা ফরাসি আলোকচিত্রী অরি কার্তিয়ের-ব্রেসোঁর ‘ডিসাইসিভ মোমেন্ট’ -এর ধারাবাহিকতা দেখতে পাই। ১৯৭৭ সালে ব্রেসোঁর আমন্ত্রণে বিশ্ববিখ্যাত ম্যাগনাম ফটো এজেন্সির সদস্য হন রঘু রাই। পরবর্তী প্রজন্মের একমাত্র সোহরাব হুরা এই উপমহাদেশে থেকে ম্যাগনাম ফটোসের সদস্য হন। রঘু ‘ডিসাইসিভ মোমেন্ট’ বা বিশেষ মুহূর্তকে ধরার সেই শিল্পকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন; ছবির প্রতিটি ক্ষেত্রে যেন এক একটি নাটকীয় মুহূর্তে পরিপূর্ণ। আমরা মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে মজা করে বলতাম—রঘু রাইর সাথে মনে হয় সৃষ্টিকর্তার সরাসরি যোগাযোগ আছে! তা না হলে কীভাবে উনি একটি সঠিক সময়ে, একটি সঠিক জায়গায়, সঠিক মুহূর্তগুলো ধরতে পারেন! এই জনপদের আকাশ-বাতাস, জমিন, পাখি, কুকুর, সাধারণ মানুষ —সবকিছুই তার নখ দর্পনে। যেনবা তার চাহিদা মাফিক এসব উপকরনগুলো ফ্রেমের সামনেই হাজির থাকে সবসময়। যেন চলমান থিয়েটার এক। রঘু বুঝতে পেরেছিলেন, কিভাবে মানুষের ভিতরে ডুব দিতে হয়, অপেক্ষা করতে হয় সেই অভিনব সাধারণ মুহূর্ত নির্মান নিমিত্তে।

গত দুই যুগ ধরে আমি পুরোনো ঢাকায় ছবি তুলছি। স্বীকার করতে হয়, ছোটবেলায় রঘু রাই, ব্রেসো; কিশোর সময়ে ফ্রাঙ্ক, এগলেসটন না দেখলে; সাধারণের মাঝে যে ‘বিশেষ’ লুকিয়ে আছে—এই গভীর অনুধাবনটাই হয়তো আমার হত না। এখন ফিরে তাকালে দেখি, রঘু এই জনপদের দৈনন্দিন জীবনে এক বিশেষ গভীরতা খুঁজে পেয়েছিলেন। একে কেবল ব্রেসোঁর ‘ডিসাইসিভ মোমেন্ট’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক লেখায় রঘু বলেছিলেন, “ আমি একসময় পত্রিকার জন্য কাজ করতাম—যতক্ষণ না বুঝলাম যে দৈনিক খবরগুলো প্রতিদিনই মারা যায়। আমার মনে হলো, একটি ছবি বেঁচে থাকা উচিত, ছবির গুণেই টিকে থাকবে, চিরন্তন হবে। পত্রিকার জিনিস টেকে না। হিন্দিতে একটি সুন্দর শব্দ আছে, ‘দারশান’ [দর্শন] যা এই ভাবনাটিকে যথাযথ প্রকাশ করে। আক্ষরিক অর্থে এর মানে ‘দেখা’, কিন্তু এটি কেবল দেখা নয়, বরং সমগ্রতা নিয়ে দেখা, বস্তুর মধ্যে সংযোগ দেখতে পাওয়া।

রঘু রাই ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি (এক্সপোজার: পোর্ট্রেট অব আ কর্পোরেট ক্রাইম, ২০০২) প্রসঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানা থেকে বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে ইতিহাসের ভয়াবহ এক শিল্প দুর্ঘটনার ঘটে। বিষক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং পরবর্তীতে মৃতের সংখ্যা ১৫,০০০ ছাড়িয়ে যায়; পাশাপাশি ৫ লক্ষাধিক মানুষ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোগেন। রঘু রাই ভোপালের এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়-বিপর্যস্তদের ছবি তুলেছেন। ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি কাজে তার সাদা কালোর ছবির ধরন বদলে যায়; সাধারণত তার ছবির চরিত্ররা প্রাণবন্ত থাকলেও, ভোপালের ছবিতে তাদেরকে নিষ্প্রাণ দেখায়। কর্পোরেট পুঁজিবাদ যেভাবে দানবীয় হয়ে উঠতে পারে, রঘুর ছবির মানুষদের অভিব্যক্তি দেখলে আমরা সেটা উপলব্ধি করতে পারি। বিষাক্ত গ্যাসের কারণে এখনও পালমোনারি ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় বসে থাকা মোহাম্মদ আরিফের সেই পোর্ট্রেটটি স্মরণে আসে—কি ভয়াবহ চাহনি। অন্যদিকে তিনি যখন ইন্দিরা গান্ধীর ছবি তুলেছেন, সেখানেও অসাধারণ মুহূর্ত ধারণ করেছেন। প্রেস ফটোগ্রাফির অফিসিয়াল ন্যারেটিভের বাইরে যেয়ে ক্ষমতাবান একজন ব্যক্তিত্বের এমন ছবি কেমন করে তোলা যায়— ইন্দিরা গান্ধী প্রসঙ্গে করা তার কাজ এমন একটা উদাহরণ। ইন্দিরা গান্ধীর মতো একজন ক্ষমতাবান নেত্রীর সামনে কীভাবে পুরুষ নেতারা চুপসে যাচ্ছেন, তোষামদী চেহারা সমেত গলে পরছেন— তিনি অবলীলায় এই ছবিগুলো তুলে ধরেছেন। একটি ছবি আছে, ১৯৬৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী অফিসে পিছনে থেকে তোলা, ফ্রেমের ডান দিকে ইন্দিরা গান্ধী কাগজে সাইন করছেন, বাম দিকে দুটো ল্যান্ড ফোন; নেত্রীর সামনে অর্ধবৃত্তের মতো দাঁড়িয়ে আছেন সাদা পাঞ্জাবি আর গান্ধী টুপি পরহিত কংগ্রেসের নেতারা। একেক নেতার কি অদ্ভুত এক এক অভিব্যক্তি।

প্রশ্ন হলো—এই সময়ের কোনো আলোকচিত্রী কি রাজনৈতিক নেতাদের এতটা কাছাকাছি গিয়ে, এমন সব ছবি তুলতে পারবেন? সম্ভবত না। পৃথিবী পালটে গেছে। “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” পরবর্তী অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা। রঘু জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের যে এক ‘আদর্শ’ চিত্র নির্মাণ করেছেন, তার ভেতরে এক ধরনের জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক পাঠের জন্ম দিয়েছে। তবে এটাও উল্লেখযোগ্য যে, সমকালীন আলোকচিত্রীরা এই আদর্শ চিত্রের কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান নির্মাণ করে চলেছেন।

১৯৭১ সালে রঘু রাই স্টেটসম্যান পত্রিকায় তরুণ ফটো-সাংবাদিক ছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণে অগণিত বাংলাদেশি মানুষেরা যখন ভারতীয় সীমান্তে আশ্রয় নিতে শুরু করল, রঘু সেই সময়ে আগস্ট মাসের কোন এক সকালে কলকাতা পৌঁছে যান। তখন ঘোর বর্ষা, বনগাঁতে রিফিউজি ঠাই হচ্ছে না। যশোর রোডে হাজারে হাজারে মানুষ, বৃদ্ধ-শিশু বাঁচার আশায় ঠাই খুঁজছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭২ সালে ভারতে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। পরবর্তীতে ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে “ফ্রেন্ডস অব লিবারেশান ওয়ার অনার” প্রদান করে। ২০২৪ সনে চারুকলার জয়নুল গ্যালারীতে দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন আয়োজিত প্রদর্শনীর সুবাদে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার তার বিরল কাজ আমরা দেখতে পাই।

রঘু রাই বহুবার ছবি মেলা উৎসবে অংশ নিয়েছেন। ২০১৯ সালে ছবি মেলায় তিনি যখন তাঁর কাজ নিয়ে কথা বলছিলেন, গ্যেটে ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে তখন তিল ধরবার ঠাই নেই। পাঠশালা-তে ছাত্র থাকাকালীন সময়ে রঘুর আলোকচিত্র নিয়ে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমাদের। বিগত সরকারের সময় ছাত্র আন্দোলন নিয়ে আল জাজিরা-তে সাক্ষাৎকার দেওয়ার কারণে শহিদুল আলম যখন কারাবন্দি ছিলেন, তখন যে অল্প কয়েকজন মানুষ আমাদের পাশে দৃঢ় দাঁড়িয়েছিলেন—রঘু রাই তাদের অন্যতম।

খুব কম শিল্পী, ব্যক্তি-ইমেজের সীমানা পেরিয়ে প্রকৃত বড় হয়ে উঠতে পারেন— রঘু রাই ছিলেন তেমনই এক লার্জার-দ্যান-লাইফ ব্যক্তিত্ব। তিনি আলোকচিত্রের মাধ্যমে এই উপমহাদেশের ভিন্ন এক মানচিত্র নির্মাণ করেছেন। আমরা আলোকচিত্রের জগতে বিশাল এক মহীরুহ হারালাম আজ।
বিদায়, মায়েস্ত্রো।

লেখক: শিল্পী, পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইন্সটিটিউটের শিক্ষক এবং ছবি মেলার কিউরেটর।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত