০৯ জুলাই, ২০২৫ ১০:৫৪
এক নৈঃশব্দ প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে
শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণি সেবা ফাউন্ডেশন—যাকে স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরেই আদর করে কিংবা কেউ বাঁকা স্বরে পরিহাসে ডাকেন ‘সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’। বাইরের চোখে এটি যেন এক সেবাশ্রম—আহত ও বিপন্ন প্রাণিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আশ্রয়স্থল।
কিন্তু যতই ভেতরে ঢোকা যায়, ততই প্রশ্ন জাগে—এই ‘সেবা’ কি আসলেই সেবা? নাকি এক নান্দনিক শিকল?
এই প্রশ্ন কেবল প্রাণি অধিকারকর্মী বা পরিবেশবাদীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এ প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের আলোচনায়, সোশ্যাল মিডিয়ার আবেগঘন পোস্টে, এবং বিভিন্ন আইনি পরিসরে। এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সেই দ্বন্দ্বের কিছুটা হলেও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ।
ভেতরের দৃশ্য: মনোরমতা নাকি মায়ার খাঁচা?
চিড়িয়াখানাটির প্রবেশপথে চোখে পড়ে প্রাণিবিষয়ক রঙিন চিত্র, শিক্ষামূলক পোস্টার ও বনভূমির ছায়ায় পাখির কিচিরমিচির। প্রথম দর্শনে এটি যেন প্রকৃতি ও করুণার মেলবন্ধন। কিন্তু অল্প কিছুক্ষণেই চিত্র বদলে যায়—একটার পর একটা খাঁচা, কোথাও অস্বাভাবিকভাবে ছোট, কোথাও অন্ধকার ও নির্জীব। তাতে বন্দি রয়েছে বিপন্ন স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ ও দুর্লভ পাখি।
বন্দি প্রাণিদের একটি সম্ভাব্য তালিকা
স্তন্যপায়ী প্রাণি: লজ্জাবতী বানর (Slow Loris) – চরম বিপন্ন; মেছোবাঘ; ভাল্লুক (এশিয়ান কালো); সোনালি ও সাদা বাঘ; উড়ন্ত কাঠবিড়ালি; সজারু, মায়া হরিণ, গন্ধগকোল, সোনালি হনুমান, হিমালয়ান সিভেট।
সরীসৃপ ও উভচর: অজগর সাপ; গুইসাপ; সোনালি কচ্ছপ (বিরল গাছচর প্রজাতি)।
পাখি: ধনেশ, লক্ষণ টিয়া, বনমোরগ, পাহাড়ি ময়না, বসন্ত বৌরি, ডাহুক, জল কবুতর, ঘুঘু, তিতির।
একসময় দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল ‘সাদা বাঘ’, ‘গোল্ডেন টাইগার’, এবং আলোচিত ৩৮টি অজগরের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার ঘটনা। সেই সময়ে ফাউন্ডেশনের দাবি, কিছু সাপ লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করা হয়েছিল! মোদ্দা কথা হলো
অধিকাংশ প্রাণির জীবন এখানে খাঁচাবন্দি।
জনমতে মুগ্ধতা বনাম নৈতিক জিজ্ঞাসা
প্রায়শই ফেসবুকে আবেগঘন ভিডিও ভাইরাল হলে বহু মানুষ মন্তব্য করেন—“সিতেশ বাবু অসাধারণ কাজ করছেন”, “এমন সেবাশ্রম দেশজুড়ে হোক”।
কিন্তু যারা সরাসরি ফাউন্ডেশনটিতে গেছেন, বিশেষ করে নানা বয়সী দর্শনার্থী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা, তাদের অভিজ্ঞতাতে ভিন্নতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাংবাদিক বলেন: “প্রাণি চিকিৎসার নামে খাঁচায় বন্দি রেখে টিকিট বিক্রি করাটা এক ধরনের প্রহসন। এটিকে সেবা বললে সেবার সংজ্ঞাই ক্ষুণ্ণ হয়।”
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র তালেব মিয়া মন্তব্য করেন: “সত্যিকারের সেবা হলে তো প্রাণিদের জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। চিরতরে বন্দি করে রাখার নাম সেবা হতে পারে না —এটা আসলে শৃঙ্খল।”
তাদের মতে, এটি এক ধরনের “সহানুভূতির বিপণন”—যেখানে দর্শনার্থীদের আবেগ ব্যবহৃত হয়, আর প্রাণিগুলো রয়ে যায় চোখের সামনে, কিন্তু মনের আড়ালে।
আইনের আয়নায়: ‘সেবা’র সীমা কোথায়?
“বন্যপ্রাণি (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২” অনুযায়ী—
• লাইসেন্স ব্যতীত বন্যপ্রাণি সংগ্রহ, প্রদর্শন বা বিক্রয় ফৌজদারি অপরাধ
• কোনো উদ্ধারকেন্দ্র হলে বন বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন
• চিকিৎসার পর পুনর্বাসন ও অবমুক্তকরণ বাধ্যতামূলক
• খাঁচা ও আবাসন মানদণ্ড না মানলে সেটি আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়
এই আইনের নিরিখে প্রশ্ন ওঠে— ‘সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’ কি উপযুক্ত লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও অনুমোদিত? যদি অনুমোদিত হয় তবে তার সীমারেখা কতটুকু?
পুনর্বাসনের নথিপত্র কি জনসমক্ষে আছে? এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সরাসরি উত্তর পাওয়া যায়নি। এমনকি কাউন্টারে প্রশ্ন করলেই দেখা যায় উষ্মা বা এড়িয়ে যাওয়া মনোভাব।
শিকলের গায়ে সেবার লেবেল—না দেখেও দেখতে পাওয়া কিছু প্রশ্ন
এই ফাউন্ডেশন ঘুরে দেখা আমার জীবনের একটি অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। এখানে শুধু প্রাণি নয়—দেখেছি বন্দি নিশ্বাস, আটকে রাখা দৃষ্টির নীরব আর্তি।
ভাল্লুকটি, একাকী বসে মাথা দোলাচ্ছিল বারবার—ক্ষুধা? বিষণ্ণতা? নাকি নিছক ক্লান্তি? তার দৃষ্টিতে যেন প্রশ্ন ছিল: “এটাই কি সেবা? আমাকে পাথরের মেঝেতে বন্দি রেখে কাদের উপকার হচ্ছে?”
এক কোণে সিঁতিয়ে থাকা লজ্জাবতী বানর যেন এক জীবন্ত প্রশ্নপত্র—তার চোখের ভেতরে আতঙ্ক, শরীরে স্তব্ধতা।
পাখিদের খাঁচায় দেখা গেল রঙের বাহার, শব্দের জটলা—কিন্তু কোথাও ওড়ার আওয়াজ নেই। “ডানা আছে, কিন্তু উড়তে নেই—এই কি পাখির জীবন?”
সাদা খরগোশটি একপাশে লাফ দিতে গিয়ে খাঁচার জালে আটকে যাচ্ছিল বারবার—জমে থাকা মল-মূত্রে ভেজা মেঝে যেন সাক্ষ্য দিচ্ছিল তার লাঞ্ছনার।
প্রতিটি প্রাণির চোখে ছিল অনুচ্চারিত এক অভিমান—যা খাঁচার গা ছুঁয়ে ফিরে আসে, কিন্তু কোনো ক্যামেরা তা ধারণ করতে পারে না।
এসব দেখে নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম: “আমরা কেমন সেবার পক্ষে? সেই সেবা, যেখানে প্রাণি চিকিৎসা শেষে মুক্ত হয়? নাকি যেখানে দর্শনার্থীদের চোখে ভালো লাগার ছবি হয়, কিন্তু প্রাণিটির জীবনে যুক্ত হয় আরেকটি খাঁচা?”
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদী কণ্ঠ
কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন ইতিমধ্যে সরব হয়েছে। একজন প্রাণি অধিকার কর্মী বলেন: “বন্যপ্রাণিকে যত যত্নেই রাখা হোক, খাঁচা কখনও স্বাধীনতার বিকল্প হতে পারে না।”
অন্যদের মতে, এখানকার প্রাণিদের জন্য প্রকৃতি হয়ে গেছে একটি গল্প—যা তারা অনুভব করতে পারে, ছুঁতে পারে না।
সরল সেবার মুখোশে শৃঙ্খলের ছায়া
কেউ যদি বলে সেবা’ নামের আড়ালে এই প্রতিষ্ঠান অনেকাংশেই হয়ে উঠেছে বিনোদনের কেন্দ্র—যেখানে প্রাণিদের দুঃখ রঙিন দেয়ালে ঢাকা পড়ে যায়, দর্শনার্থীর হাসিতে। তার মুখে কি লাগাম দেয়া যাবে?
তবুও থেকে যায় এক মৌলিক প্রশ্ন: এই আনন্দ কার? আর তার মূল্য কে দিচ্ছে?
সুপারিশ ও করণীয়: এখনই ব্যবস্থা নেওয়ার সময়
১. বন বিভাগ কর্তৃক জরুরি তদন্ত ও লাইসেন্স যাচাই
২. যদি লাইসেন্স ও অনুমোদন না থাকে, চিড়িয়াখানার কার্যক্রম স্থগিত করা
৩. বন্দি প্রাণিদের উপযুক্ত পুনর্বাসন ও অবমুক্তকরণ নিশ্চিত করা
৪. সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি
৫. “সেবা বনাম শৃঙ্খল” বিষয়ক গণতান্ত্রিক আলোচনা সোশ্যাল মিডিয়ায় উৎসাহিত করা
প্রকৃত ভালোবাসা মানে মুক্তি
প্রকৃত সেবা মানে প্রাণিকে তাদের প্রাকৃতিক জগতে ফিরিয়ে দেওয়া। খাঁচা যতই রঙিন হোক, সেটি স্বাধীনতার বিকল্প হতে পারে না। একদিন হয়তো আমাদের সমাজ বুঝবে— প্রাণির চোখের সেই একাকী চাহনিতেই লুকিয়ে থাকে একটি জাতির বিবেক।
তাই যদি আওয়াজ উঠে ‘সেবার’ নামে আর কোনো শৃঙ্খল নয়—মুক্তির দিগন্ত উন্মুক্ত হোক। তবে সে আওয়াজে বাধা দেয়ার সাধ্য কারো নাই।
এখনো পৃথিবীর বহু মানুষ বিশ্বাস করেন পৃথিবীটা কেবল মানুষের নয়।...
আপনার মন্তব্য