COVID-19
CORONAVIRUS
OUTBREAK

Bangladesh

Worldwide

56

Confirmed Cases,
Bangladesh

06

Deaths in
Bangladesh

25

Total
Recovered

961,448

Worldwide
Cases

49,163

Deaths
Worldwide

203,176

Total
Recovered

Source : IEDCR

Source : worldometers.info

দেবব্রত চৌধুরী লিটন

০৭ ফেব্রুয়ারি , ২০২০ ২৩:৫৪

এ জার্নি বাই ট্রেন: ঢাকা টু সিলেট

সকাল ১১টা। রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ২নং প্লাটফর্মে দাড়িয়ে আছে ঢাকা থেকে সিলেটগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেন। ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময় বেলা সোয়া ১১টা। নতুন ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী ট্রেনটি সিলেটে পৌঁছানোর নির্ধারিত সময় সন্ধ্যা ৭টা। কিন্তু, নির্ধারিত সময়ের ৩৫ মিনিট বিলম্বে কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস।

স্টেশনের কাউন্টারে বিক্রিত টিকেটের সাথে ট্রেনের একটি কামরার বরাদ্দকৃত সিটের অসামঞ্জস্যতার কারণে ট্রেন ছাড়তে বিলম্ব হয়েছে বলে জানান 'ক' কামরার নিরাপত্তায় থাকা রেলওয়ের পুলিশের সদস্য শান্তি রঞ্জন। ষ্টেশনে ট্রেন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একাধিক ব্যক্তি জানান, বিক্রিত টিকেটের সাথে অসামঞ্জস্যতার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। ট্রেনে সংযুক্ত ছোট কামরাটি বিচ্ছিন্ন করে টিকেটের সাথে মিল রেখে বড় কামরা সংযুক্তির পর ট্রেন ছাড়ে।

কমলাপুরগামী একটি ট্রেনের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ক্রসিংয়ের জন্য জয়ন্তিকাকে আরও ১০মিনিট অনির্ধারিত বিরতি করতে হলো ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ষ্টেশনে। দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে উঠে হিজড়া। নানা ছলাকলা ও কখনোবা হুমকি দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে শুরু করে তারা। ১০ মিনিট বিরতির পর চলা শুরু করে ট্রেন। বেলা সাড়ে ১২টায় ট্রেনটি পৌছায় ঢাকার বিমানবন্দর রেলওয়ে ষ্টেশনে। এই স্টেশনে যাত্রা বিরতি ছিলো ১০ মিনিট। মাঝখানে আরও একটি ট্রেনকে চলাচলের সুবিধা দিতে আরও ১০ মিনিট থেমে থাকলো জয়ন্তিকা। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অদূরে আবারও থামানো হলো ট্রেন। এবার অজ্ঞাত কারণে মিনিট পনেরোর বিরতি শেষে ট্রেনটি ছাড়লো সিলেট অভিমুখে। ইতিমধ্যে ট্রেনের ভেতরে ঢুকে পড়ে আরও দুই হিজড়া। শ্রীমঙ্গলের এক যাত্রীসহ কামরায় থাকা আরো কয়েকজন যাত্রীর সাথে এবার বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে তারা। এক পর্যায়ে যাত্রীদের গায়েও হাতে তুলে হিজাড়ারা।

পাশের সিটে বসা যাত্রী মৌলভীবাজারের উত্তর কলিমাবাদের বাসিন্দা আশরাফ জাহান ঢাকায় গিয়েছিলেন চাকুরীর পরীক্ষা দিতে। তিনি জানান, হিজড়াদের এসমস্ত যন্ত্রণা সহ্য করেই নিয়মিত পথ চলতে হয় রেলওয়ের যাত্রীদের।

বেলা আড়াইটায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ষ্টেশনে পৌছায় ট্রেন। ষ্টেশন থেকে ট্রেনটি ছাড়ার পর 'ক' কামরার ৩৪ নম্বর সিট খালি পেয়ে বসে পরেন এক যাত্রী। নিজেকে 'মাষ্টার' পরিচয় দেয়া ওই যাত্রীটি ওই সিটের নির্ধারিত যাত্রীর সাথে সিটে বসা নিয়ে বাদানুবাদে জড়িয়ে পরেন। পরে অন্যান্য যাত্রীদের মধ্যস্থতায় আসনটি ছেড়ে দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ট্রেনে উঠা ওই যাত্রী। পথ চলতে চলতে বেলা ৩টায় আজমপুর রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে ছেড়ে যায় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস। বিমানবন্দর ষ্টেশন পেরোনোর পর ট্রেনের প্রায় প্রতিটি কামরায়ই আসনবিহীন দাঁড়ানো জনাপঞ্চাশেক যাত্রী। এদের মধ্যে প্রতিটি কামরায়ই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী যাত্রী রয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ষ্টেশন পেরোনোর পর দাঁড়ানো যাত্রী সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে মুকুন্দপুর ষ্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়লে ২মিনিট পরেই ধীরলয়ে চলা শুরু করে। ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু মেরামতের জন্য ট্রেনটির এই ধীরলয়ে চলা। সেতুটি পেরিয়ে আবারও গতি বাড়লো ট্রেনের।

৩টা ৩৫ মিনিটে ট্রেন পৌছায় হরষপুর ষ্টেশনে। ৫মিনিট পরই ছেড়ে যায় ট্রেন। ৩টা ৪০ মিনিটে মাধবপুরের গাংগাইল এলাকায় ৩মিনিটের জন্য দাঁড়ায় জয়ন্তিকা। সেখান থেকে ছাড়ার মিনিট দুয়েক পর ট্রেন পৌছায় মনতলা ষ্টেশনে। নির্ধারিত বিরতি শেষে আবারও চলা শুরু করে ট্রেনটি। বিকেল ৪টা ২৫মিনিটে নোয়াপাড়া ষ্টেশনে নির্ধারিত বিরতি শেষে ট্রেন আবারও চলা শুরু করে। ট্রেন চলার দীর্ঘ যাত্রায় অন্তত ৩টি স্থানে দেখা মেলে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু মেরামত কাজের। শাহজিবাজার ষ্টেশনে ট্রেন ৩মিনিট যাত্রা বিরতি শেষে বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আবারও যাত্রা শুরু করে।

বিকেল পৌনে ৫টার দিকে শায়েস্তাগঞ্জ ষ্টেশনের অদূরে ট্রেনের কামরা লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ে মারে অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত। এতে আহত হয় ঢাকার একটি বেসরকারি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মাহিম ও পাশে থাকা যাত্রী আশরাফ। শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে ষ্টেশনের পৌঁছানোর আগে আবারও হিজড়াদের উৎপাত। এবারও যাত্রীদের কাছে টাকার দাবি তাদের। সন্ধ্যা পৌনে ৬টা শ্রীমঙ্গল ষ্টেশন ছেড়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস।

সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে ভানুগাছ ষ্টেশনের আউটারে আবারও ক্রসিংয়ের জন্য ১০ মিনিটের মতো দাঁড়ায় এক্সপ্রেস ট্রেনটি। সেখানে ট্রেন দাঁড়ানো অবস্থায় পাবনার ঈশ্বরদীর সীমান্ত (১০) নামে মাদ্রাসা পড়ুয়া এক ছাত্রের দেখা মেলে। সীমান্তকে পাবনার ট্রেনের বদলে ভুলবশত সিলেটগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে তুলে দেন তার খালা।

সীমান্ত জানায়, সে তার খালার বাড়িতে বেড়াতে ঢাকায় আসছিল। পরে শামীম আহমদ নামে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের এক যাত্রী সীমান্তের পরিবারের সাথে মুঠোফোনে কথা বলেন। তাকে ঢাকায় পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। অনেকক্ষণ চলার পর সন্ধ্যা ৭টায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ষ্টেশনে পৌছায় ট্রেনটি। ৫মিনিট বিরতির পর সিলেটের মাইজগাঁও ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে আবার যাত্রা করে। জয়ন্তিকা যখন মাইজগাঁও ষ্টেশনে পৌছায় ঘড়ির কাটায় তখন রাত ৭টা ৪০ মিনিট। মিনিট তিনেক মাইজগাঁও ষ্টেশনে বিরতি দিয়ে ট্রেনটি তার সর্বশেষ গন্তব্য সিলেট রেলওয়ে ষ্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

এইসময়ে ট্রেনের এই কামরাতে বেহালা হতে নিয়ে উঠেন বাউল সবুজ মিয়া। তিনি বেহালায় সুর তুলে গান ধরেন- 'যদি থাকে নসিবে আপনে আপনে আসিবে'। ট্রেনের কামরায় উপস্থিত শ্রোতাদের মনে খানিক সময়ের জন্য আনন্দ যোগায় বাউলের এই গান।

দিনভর ভোগান্তি শেষে নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় পর ট্রেনটি সিলেট রেল ষ্টেশনে পৌছায় রাত ৮টা ২০মিনিটে। এতটা সময় রেলপথ ভ্রমণের ক্লান্তি ভুলে যাত্রীরা নিজ নিজ গন্তব্যের দিকে যে যার মতো চলে যান। ট্রেনটি ষ্টেশনে রয়ে যায় ভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের অপেক্ষায়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত