আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৭ ফেব্রুয়ারি , ২০২২ ১৫:৪২

কমেডিয়ান থেকে ‘হিরো’ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি!

ভলোদিমির জেলেনস্কি যখন প্রথম ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হিসাবে টিভি পর্দায় উপস্থিত হন, সে সময় জনপ্রিয় এক কমেডি সিরিজের একটি চরিত্রে অভিনয় করছিলেন তিনি। তারপর ২০১৯ সালের এপ্রিলে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এখন তিনি ৪৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশ ইউক্রেনের নেতা।

সার্ভেন্ট অফ দ্য পিপল সিরিজে তিনি ইতিহাসের শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, ওই শিক্ষক ভাগ্যক্রমে প্রেসিডেন্ট হয়ে যান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ওই শিক্ষকের দেওয়া বক্তব্য অনলাইনে ভাইরাল হয়ে যায় তখন।

রাজনীতি নিয়ে হতাশাগ্রস্ত ইউক্রেনীয়দের এই গল্প নতুন আশার আলো দেখায়।  শান্তি ও সুস্থ রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনীতিতে আসেন জেলেনস্কি, তার দলের নাম দেন 'সার্ভেন্ট অফ দ্য পিপল'।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের এই সময়ে আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যমনি এখন তিনি। রাশিয়ার সঙ্গে শীতল যুদ্ধের স্মৃতি আবারও জেগে উঠেছে। ৪৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ এখন তার দেশকে নিরাপদ রাখতে ও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।

নাটকীয়ভাবে প্রেসিডেন্ট
অন্যান্যদের মতো গতানুগতিক পথে হেঁটে প্রেসিডেন্ট হননি তিনি। ইউক্রেনের কিরিভি রিহ শহরের এক ইহুদি পরিবারে জন্ম তার। জেলেনস্কি কিয়েভ ন্যাশনাল ইকোনমিক ইউনিভার্সিটি থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু, বাস্তবজীবনে তিনি সফলতা পান কমেডিয়ান হয়ে। তরুণ বয়সে তাকে নিয়মিত রাশিয়ান টিভিতে কমেডি শোতে দেখা যেত। ২০০৩ সালে তার কমেডি টিম কেভারটাল-৯৫ এর নামে একটি টিভি প্রোডাকশন কোম্পানি খোলেন তিনি।

কোম্পানিটি ব্যাপক সফলতা পায়। ইউক্রেনের ১+১ নেটওয়ার্কের জন্য শো বানাতো কোম্পানিটি। তবে কোম্পানিটির বিতর্কিত মালিক বিলিয়নেয়ার ইহোর কোলোময়স্কি পরবর্তী সময় নির্বাচনে জেলেনস্কিকে সমর্থন দেন। তবে ২০১০ এর দশকে টিভি ও চলচ্চিত্রে তার ক্যারিয়ার ভালোই চলছিল। ২০০৯ সালে 'লাভ ইন দ্য বিগ সিটি' ও ২০১২ সালে 'জায়েস্কি বনাম নেপোলিয়ন' নামের দুটি চলচ্চিত্র বানান তিনি।

সারভেন্ট অফ দ্য পিপল  
২০১৪ সাল ছিল ইউক্রেনের জন্য অশান্তির এক বছর। কয়েক মাস বিক্ষোভের পর ইউক্রেনের রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হয়। রাশিয়া তখন ক্রিমিয়া দখল করে,  দেশটির পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধাদের সমর্থন দেয়। এসব অঞ্চলে এখনও যুদ্ধ চলছে।

এসব ঘটনার এক বছর পর ১+১ নেটওয়ার্কে 'সার্ভেন্ট অফ দ্য পিপল' সিরিজটির সম্প্রচার শুরু হয়। সিরিজটিতে ভ্যাসিলি গোলবোরোদকো নামে একটি চরিত্র ছিল, ইতিহাসের এই শিক্ষকের প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার যাত্রা দেখানো হয় সিরিজটিতে। জেলেনস্কি এই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন,। তার বাস্তব জীবনেও পরে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। 

প্রতিদ্বন্দ্বী পেট্রো পোরোশেঙ্কোকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। পোরোশেঙ্কো তাকে অনভিজ্ঞ প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতেন, কিন্ত পরে এই অনভিজ্ঞতাই জেলেনস্কির শক্তি হিসেবে কাজ করে। জেলেনস্কি নির্বাচনে ৭৩.২ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, এরপর ২০১৯ সালের ২০ মে ইউক্রেনের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেন। 

প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দেশের পূর্বাঞ্চলের গৃহযুদ্ধ শেষ করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি তা পূরণের চেষ্টা করেন। এই যুদ্ধে মারা গেছে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ।

শুরুতে তিনি সমঝোতার চেষ্টা করেন। রাশিয়ার সাথে আলোচনা করেন ও বন্দী বিনিময় করেন। শান্তি চুক্তির প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের চেষ্টাও করেন তিনি। এটি মিনস্ক চুক্তি হিসেবে পরিচিত। যদিও এই চুক্তি কখনোই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

পরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সংঘাত-কবলিত অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাসকারীদের রাশিয়ান পাসপোর্ট দেওয়ার ঘোষণা দেন। এতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। ২০২০ সালের জুলাই মাসে একটি যুদ্ধবিরতি হয়, কিন্তু তখনও বিক্ষিপ্তভাবে সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল। একই সময়ে জেলেনস্কি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোতে ইউক্রেনের সদস্যপদ নিয়ে আরও জোরালোভাবে কথা বলতে শুরু করেন। এতে ক্ষুব্ধ হন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

রাশিয়া যে কোনো সময় হামলা চালাতে পারে বলে ইউক্রেনকে সতর্ক করেছিল পশ্চিমা দেশগুলো। জেলেনস্কি বলেছিলেন, আট বছর যুদ্ধের পর এটা নতুন কিছু নয়।

বিলিয়নেয়ারদের সাথে যোগাযোগের সমালোচনা
জেলেনস্কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি রাজনীতিকে বিলিয়নিয়ারদের প্রভাবমুক্ত রাখবেন। কিন্তু ইহোর কোলোমোইস্কির সাথে তার সম্পর্ক বিভিন্ন সময় সমালোচনার জন্ম দেয়। ইহোর জেলেনস্কির নির্বাচনী প্রচারণায় সমর্থন দিয়েছিলেন।

যদিও তিনি উচ্চপদস্থদের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করে গেছেন। তার সরকার দেশের শীর্ষ ধনীদের টার্গেট করেছিল। রুশপন্থী বিরোধী দলীয় নেতা ভিক্টর মেদভেদচুক, তাকে গৃহবন্দী করা হয়েছিল। মেদভেদচুকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়, যদিও এ অভিযোগকে তিনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছিলেন।

জেলেনস্কি তখন একটি আইন নিয়ে আসেন যার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলিতে ধনীদের অনুদান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

কিছু সমালোচক তার দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপগুলোকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে পাশে রাখার প্রচেষ্টা বলেও মন্তব্য করেছেন। বাইডেনের সমর্থন পেতেও জেলেনস্কিকে কিছু অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ২০১৯ সালের জুলাইতে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প জেলেনস্কিকে ফোন করে কিছু সহযোগিতা চেয়েছিলেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাইডেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে জেলেনস্কির সহযোগিতা চেয়েছিলেন। এই তদন্তে সহযোগিতার বিনিময়ে ট্রাম্প জেলেনস্কিকে ওয়াশিংটন সফর ও মার্কিন সামরিক সহায়তার আশ্বাস দেন।

এই ফোনকলের তথ্য যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জেলেনস্কিকে চাপ দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর ক্ষতি করার অভিযোগ ওঠে।

প্যান্ডোরা পেপারসে নাম
২০২১ সালের অক্টোবরে প্যান্ডোরা পেপারসে তার নাম আসে। এই নথিতে বিশ্বের প্রভাবশালী সব ধনীদের লুকানো সম্পদের তথ্য রয়েছে৷

প্যান্ডোরা পেপারসে উঠে এসেছিল, জেলেনস্কি ও তার কাছের মানুষরা বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কিছু কোম্পানির নেটওয়ার্কের সুবিধা পেয়ে থাকে।

তবে, জেলেনস্কি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন তিনি নিজে বা তার কোম্পানির ভার্টাল-৯৫ এর সাথে যুক্ত কেউই অর্থ পাচারের সাথে জড়িত ছিলেন না।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত