জুয়েল রাজ, লন্ডন

১২ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৯:০২

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন: ব্রিটেনকে পদক্ষেপ নিতে সাবেক ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল এমপির আহ্বান

বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে এবার সরাসরি সতর্কবার্তা দিলেন যুক্তরাজ্যের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল। ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান—বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি এমন এক সংকটময় পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

প্রীতি প্যাটেলের ভাষায়, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা হত্যা, নির্যাতন ও ভয়ভীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা, যা সংবিধান দ্বারা নিশ্চিত থাকার কথা, তা বাস্তবে ভেঙে পড়ছে। এই সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এগুলো লক্ষ্যভিত্তিক, পরিকল্পিত এবং চলমান।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এতদিন ধরে যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া ছিল ‘ভদ্র উদ্বেগ’ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান আর গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়—তা ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক বন্ধনে গাঁথা। প্রায় ১০ লাখ ব্রিটিশ নাগরিকের শিকড় বাংলাদেশে। ঢাকায়, চট্টগ্রামে বা সিলেটে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হলে তার প্রতিধ্বনি শোনা যায় লন্ডন, বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে। এটি আর দূরের কোনো দেশের সংকট নয়—এটি এখন যুক্তরাজ্যেরও একটি বিষয়।

প্রীতি প্যাটেল বলেন, হত্যা, গণহামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত নিপীড়নের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট শক্ত হয়নি। এর ফলে একটি বিপজ্জনক বার্তা যাচ্ছে—সংখ্যালঘুদের অধিকার যেন আলোচনার বিষয়, এবং ব্রিটেন প্রয়োজনে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাজ্যের হাতে এখনো প্রভাব রয়েছে—কূটনৈতিক ও নৈতিক উভয় অর্থেই। সেই প্রভাব ব্যবহার করাই এখন দায়িত্ব।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি সব দলের এমপিদের প্রতি আহ্বান জানান, পররাষ্ট্র দপ্তরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে—

সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার জবাবদিহি নিশ্চিত করা
হত্যা, গণহামলা, ঘরবাড়ি ও মন্দির ধ্বংসের ঘটনায় স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানাতে হবে। দায়মুক্তিই সহিংসতাকে উসকে দেয়।

আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সক্রিয় করা
কমনওয়েলথভুক্ত দেশ, জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে একত্র করে সুরক্ষা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

ধর্মীয় স্বাধীনতাকে যুক্তরাজ্য–বাংলাদেশ সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য শর্ত করা
বাণিজ্য, উন্নয়ন সহায়তা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

প্রীতি প্যাটেল বলেন, এটি কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়—এটি নীতিনিষ্ঠ কূটনীতি।

তিনি সতর্ক করে জানান, সংখ্যালঘুরা ভয়ে বসবাস করলে কোনো দেশ স্থিতিশীল হতে পারে না। সহিংসতাকে যদি রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো হয়, তাহলে গণতন্ত্র টিকে থাকে না। আর এমন পরিস্থিতিতে নীরব থেকে যুক্তরাজ্য মানবাধিকার রক্ষার দাবি করতে পারে না।

তার মতে, এই হস্তক্ষেপ এখন একটি মোড় ঘোরানোর সুযোগ। সংসদ সদস্যদের সামনে এখন স্পষ্ট দুটি পথ—জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া, অথবা পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে যেতে দেওয়া।

শেষে তিনি বলেন, যাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করা হচ্ছে, যুক্তরাজ্যকে তাদের পাশে দাঁড়াতেই হবে। ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। এবং স্পষ্ট করে জানাতে হবে—হিন্দু বা যে কোনো সংখ্যালঘুর ওপর নির্যাতনের কোনো স্থান নেই আধুনিক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত