২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:১৩
ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে অনুষ্টিত করার পথে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ । অবৈধ অস্ত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, গুজব ছড়ানো, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ঢালাও জামিন, সীমান্তে নিরাপত্তার দুর্বলতাসহ নানা চ্যালেঞ্জ ও আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন প্রশাসন ও পুলিশের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
গতকাল মঙ্গলবার গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের মতবিনিময় ও ব্রিফিংয়ে এসব চ্যালেঞ্জের কথা উঠে আসে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে নানা পরামর্শও দেন কর্মকর্তারা।
আলোচনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। চার নির্বাচন কমিশনারও তাঁদের বক্তব্যে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্বাচনসংক্রান্ত নানা দিকনির্দেশনা দেন।
রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবন মিলনায়তনে এই মতবিনিময়/ব্রিফিংয়ে ৮ বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশের ৮ উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি), ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, ইসির ১০ আঞ্চলিক কর্মকর্তা, ৬৪ জেলার নির্বাচন কর্মকর্তাসহ মোট ২২৬ জন কর্মকর্তা অংশ নেন।
কর্মকর্তাদের পরামর্শ
কর্মকর্তারা সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জামিন বন্ধ রাখতে বিচার বিভাগের সঙ্গে আলোচনায় বসা যায় কি না, জামিনে থাকা অপরাধীদের গতিবিধি নজরে রাখা, কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের অবাধে মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধের ব্যবস্থা, কারাবন্দী অপরাধীদের কর্মকাণ্ড নজরে রাখা, নতুন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা , দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিরাপত্তায় জোরদার, যে এলাকায় কর্মরত সেখানে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে কাউকে নিয়োগ না দেওয়া, ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো এবং গণভোটের প্রচারে রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্পৃক্ত করা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা বাড়ানো, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা, কিছু ভোটকেন্দ্রের সংস্কার, অতিরিক্ত যানবাহনের ব্যবস্থা, সময়মতো প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ , সহ নানা পরামর্শ দিয়েছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে শঙ্কা
ঢাকা মহানগরে আইনশৃঙ্খলা একটা বড় ইস্যু বলে মনে করেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। তিনি বলেন,অপরাধীদের জামিনের বিষয় আলোচনায় এসেছে। যদিও এটি বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট, নির্বাচনের আগে অপরাধীদের জামিনের বিষয়টি একটু নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ভালো হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে, যৌথ বাহিনীর অভিযান প্রয়োজন বলেও জানান কেউ কেউ। বেশির ভাগ কর্মকর্তা আশঙ্কা করেন, এবারের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও গুজব বড় বাধা হতে পারে।
খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মোখতার আহমেদ বলেন, দৌলতপুরে কালু-কাঁকন বাহিনীর সঙ্গে প্রশাসন পেরে উঠছে না। অস্ত্রের ঝনঝনানি, অবৈধ অস্ত্র, এআই ও গুজব—এগুলো মোকাবিলা করতে হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।
সীমান্তে নজরদারির বিষয়টি উঠে আসে কয়েকজন কর্মকর্তার বক্তব্যে। এর মধ্যে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী বলেন, সিলেটের তিন দিকে সীমান্ত। অস্ত্র, টাকা ও অপরাধীরা সীমান্ত পার হয়ে আসে। অপরাধ করে তারা আবার পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নেয়। তিনি সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা, এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা যাতে সহজে জামিন না পায়, সেটা বিবেচনার পরামর্শ দেন।
রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার জিল্লুর রহমান বলেন, পুলিশের অনেক অস্ত্র খোয়া গেছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এখনো ৪৫৫টি পিস্তল বাইরে। ভারী অস্ত্রও আছে। এসব উদ্ধারে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। অস্ত্র উদ্ধারে প্রণোদনা ঘোষণার পরামর্শ দেন তিনি।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব বলেন, তাঁরা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু যথাযথ সহায়তা পাচ্ছেন না। অপরাধীদের ধরতে গেলে নানা তদবির আসে। দিনে যাঁরা বক্তৃতা দেন, রাতের বেলা তাঁরা তদবির করেন।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) কিছুটা সীমিত পরিসরে কাজ করছে। এ সংস্থাকে আগের অবস্থায় নেওয়া গেলে তা সহায়ক হবে।
সম্পূর্ণ সক্ষমতা আছে: আইজিপি
মতবিনিময় সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, জুলাই আন্দোলন-উত্তর বাংলাদেশের বাস্তব কারণে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সময় নানা অসুবিধা ভোগ করছে পুলিশ। নির্বাচনের আগে এই পর্যায়ে এসে পুলিশ যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করেছে। ইসির কাছে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে অব্যাহত সমর্থন চান তিনি। আইজিপি বলেন, সমাজের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ইস্যুতে দাবি, রাস্তা অবরোধ এবং মহাসড়ক অবরোধ করে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এগুলো বন্ধের সময় এসেছে। তিনি বলেন, ‘ যদি সব জায়গায় অর্ডার (শৃঙ্খলা) প্রতিষ্ঠিত করতে না পারি, আমাদের পক্ষে নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে না।’
নিরপেক্ষভাবে কাজ করুন: সিইসি
মতবিনিময়ের শেষ পর্যায়ে সিইসি ও চার নির্বাচন কমিশনারেরা নানা দিকনির্দেশনা দেন। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে কাজ করবেন না। পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য মাঠ প্রশাসন ও পুলিশের আশ্বাসে তাঁর বুকের জোর বেড়েছে বলে সিইসি জানান। তিনি কর্মকর্তাদের ইসির নির্বাচন-সংক্রান্ত সব পরিপত্র, নির্বাচন পরিচালনা বিধিসহ সব আইন-বিধি, নির্দেশনা পড়ার নির্দেশনা দেন।
সম্প্রতি ময়মনসিংহে দীপুকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার কথা উল্লেখ করে সিইসি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এমন উসকানিমূলক ঘটনা আরও ঘটতে পারে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে হবে। এটা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা যেন নিরাপদে ভোট দিয়ে ঘরে ফিরে যেতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে সকালে উদ্বোধনী বক্তব্যে সিইসি বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থতা ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য ঢালাওভাবে ইসিকে দায়ী করা হচ্ছে। সিইসি বলেন, ‘এই অপবাদ থেকে আমরা মুক্তি চাই। প্রমাণ করতে চাই, আমরা সুষ্ঠু,সঠিক-সুন্দর নির্বাচন করতে পারি। এটা সম্ভব কেবল আইনের শাসনের মাধ্যমে।’
সভায় নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ও আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বক্তব্য দেন।
সামনের চ্যালেঞ্জ এবং করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বাস্তব ভিত্তিতেই চ্যালেঞ্জগুলোর কথা বলেছেন। এ বাস্তবতা মেনে সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
বদিউল আলম মনে করেন, তফসিল ঘোষণার পর এখন মূল দায়িত্ব ইসির। সবার সহায়তা নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সবাই দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তা নিশ্চিত করা ইসির দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলগুলোর সদাচরণ নজরদারী করা গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানান তিনি।
আপনার মন্তব্য