০৬ জুন, ২০২৬ ১৬:৪৫
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে গত ২৭ মে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে ৬ নবজাতক মারা যায়। এ ঘটনায় সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি তাদের তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পায়।
৬ শিশুর মৃত্যুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের নোটিস দিয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারি এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দিয়েছে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পক্ষে এই মামলা লড়বেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জামায়াত নেতা মোহাম্মদ শিশির মনির।
তবে এই নোটিস আইনিভাবে মোকাবিলা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির লিগ্যাল টিমের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
শিশির মনির আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লিগ্যাল কমিটির সদস্য।
শনিবার (৬ জুন) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আইনি লড়াইয়ের কথা জানান।
শিশির মনির বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত প্রতিবেদন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে এবং আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে তারা ৭২ ঘণ্টার ভেতরে কারণ দর্শাতে বলেছেন যে, কেন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না। আগামীকাল বিকাল ৫টার মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওটা যেহেতু একটা লিগ্যাল প্রসেস, এটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিগ্যালি মোকাবিলা করবে।
তিনি বলেন, যে আইনের অধীনে তারা এই নোটিস দিয়েছেন ওই আইন অনুযায়ী এটিকে মোকাবিলা করা হবে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অতীতে আমরা রিসার্চ করে দেখেছি, ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর ভারতের উত্তরপ্রদেশের জানসি জেলার এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে ১০ জন শিশু অপ্রত্যাশিতভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল। একইসঙ্গে ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর ভারতের জয়পুর রাজ্যে আইসিইউতে একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। এটাও ছিল অপ্রত্যাশিত।
শিশির মনির নবজাতকদের মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ওই হাসপাতালে এ ঘটনার মতো আর কোনও দুর্ঘটনা একবারও সংঘটিত হয়নি। এই ঘটনায় হাসপাতাল পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। তারা তদন্ত করেছে। ইতোমধ্যে ওই সেকশনগুলোতে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক কন্ডাক্টেড একটি তদন্ত প্রতিবেদন আমাদের কাছে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পাশে আজীবন দায়িত্ব পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, প্রথমত, ভুক্তভোগী পরিবারের কোনও সদস্য অর্থাৎ মা-বাবা কিংবা ভাই-বোন যতদিন জীবিত থাকবেন তারা আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সব রোগের ফ্রি চিকিৎসা পাবেন, ওষুধ ছাড়া। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের মেডিক্যাল কলেজে কোনও উপযুক্ত ছাত্র যদি থাকে এই পরিবারের, তারা বিশেষ বৃত্তিতে এই মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পড়াশোনা করতে পারবেন। এছাড়াও এই পরিবারগুলোর কেউ যদি মনে করেন তারা উপযুক্ত, তাহলে হাসপাতাল সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে তারা চাকরি পাওয়ার হকদার হবেন। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল মনে করে, এই ঘটনার জন্য ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে একটি সম্মানজনক এবং রেসপেক্টফুল পজিশনে ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করবে।
শিশির মনির দাবি করেন, ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে প্রাপ্ত তথ্য এবং দুটো তদন্ত প্রতিবেদন একসঙ্গে পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের পক্ষ থেকে কমেন্ট হলো, ‘এটি একটি অনিচ্ছাকৃত অবহেলার ফল এবং ভুক্তভোগী পরিবার এবং আদ্-দ্বীন হাসপাতাল একসঙ্গে মনে করে, এই ঘটনার জন্য হাসপাতাল যেন পরিপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং বন্ধ না হয়। এ বিষয়ে সবাই একমত। কিন্তু যে বা যার অবহেলার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে সে বা তার উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপও তারা দাবি করেন। এছাড়াও তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের কোনও ঘটনা না ঘটে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সবার একসঙ্গে কথা হলো আদ্-দ্বীন হাসপাতাল অন্যান্য জায়গার চেয়ে আনুপাতিক হারে ৫০ থেকে ৭০ ভাগ কম খরচে চিকিৎসা দিয়ে থাকে। আজ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ মানুষকে ফ্রি চিকিৎসা দিয়েছে। যা ঘটেছে এটার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মর্মাহত। আমরা মনে করি, বিষয়টি সামনে রেখে আদদ্বীন হাসপাতাল ভুক্তভোগীর পরিবারের পাশে থাকবে। একইসঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবার মনে করে, হাসপাতালের সেবা কন্টিনিউ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু উপযুক্ত ব্যক্তির উপযুক্ত কারণে সুনির্দিষ্টভাবে উপযুক্ত শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। এই বিষয়ে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ একমত। ইতমধ্যেও আদদ্বীন কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এরআগে, গত ৪ জুন ছয় নবজাতকের মৃত্যুতে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেছে। পরবর্তী প্রক্রিয়া হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে গত ২৭ মে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে ৬ নবজাতক মারা যায়। ঘটনাটিকে আমরা খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি, তাদের ৩ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। আজ বিকেল ৩টায় সেই প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। তদন্ত কমিটি দেখেছে যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ভবনটি একটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য উপযোগী না।’
তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষ নম্বর-২ পরিদর্শন করেছে। তাদের কাছে মনে হয়েছে, কক্ষটিতে দীর্ঘসময় এসি বন্ধ থাকায় ও স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন কার্যক্রম না থাকায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের মাত্রার ঘাটতি হয়েছে। পাশাপাশি, কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত সংশ্লিষ্টরা সংশ্লিষ্ট কক্ষের দায়িত্বরত সব সেবিকা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মৃত নবজাতকদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাতে প্রমাণ পেয়েছে যে সেবিকাদের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা ছিল।’
আপনার মন্তব্য