২৯ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৫০
প্রতীকী ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তাপ ও যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। জ্বালানির আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র গ্যাসসংকট এবং সার উৎপাদনে স্থবিরতায় ব্যাহত হচ্ছে শিল্প কারখানা ও কৃষি। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে—এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের এই মূল্যায়নে উঠে এসেছে দেশের অর্থনীতির নাজুক চিত্র। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং সরকারের সীমিত রাজস্ব ব্যয়ের সামর্থ্যের মধ্যে নতুন এই ধাক্কা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলেছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই দেশে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। ২০০৬ সালের মধ্যে দারিদ্র্য থেকে ১৭ লাখ মানুষের বেরিয়ে আসার কথা থাকলেও, চলমান পরিস্থিতিতে তা নেমে আসতে পারে মাত্র ৫ লাখে।
দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা সরবরাহে কোনো বড় সমস্যা হলেই বাংলাদেশ সরাসরি ধাক্কা খায়। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিতেই 'ফোর্স মেজার' (জরুরি সরবরাহ স্থগিত) ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণ মূল্যে (প্রতি ইউনিটে ২৪ থেকে ২৮ ডলার) এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, এ বছর দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে অন্তত ১০ শতাংশ ভূমিকা রাখবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও কারখানার উৎপাদন খরচ একযোগে বেড়ে যাবে, যা সরাসরি আঘাত হানবে সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায়।
গ্যাসে ঘাটতির কারণে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিরই উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববাজারে আন্তর্জাতিক সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায় সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা সরাসরি দেশের ৪০ শতাংশ কৃষিভিত্তিক পরিবারকে সংকটে ফেলবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ বাড়ায় দেশের প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬,২০০টি বেসরকারি হাসপাতালের পরিচালন ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কাঁচামাল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে বাড়তি জাহাজভাড়ার কারণে ওষুধ শিল্পের ওপরও বড় প্রভাব পড়ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেবল জ্বালানি খাতেই সরকারের ভর্তুকি জিপিজির ২.৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে, যার অর্থমূল্য প্রায় ২.৫ থেকে ৪.৮ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বাজেট কাটছাঁট হতে পারে।
অবশ্য অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এসব জটিল অর্থনৈতিক সংকট রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়, কিছুটা সময় লাগবে।
তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের এই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকা এবং কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর প্রমাণ করে যে সংকট কতটা গভীর।
আপনার মন্তব্য