০৭ নভেম্বর, ২০২৬ ১২:১২
১৫ আগস্টের ঘটনা ছিল সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সিপাহিরা, আর তাতে সংহতি জানিয়েছিল জনগণ- এমন মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতি উপহাস, তাদের অগ্রাহ্য করা ও অপমান করার প্রতিশোধ নিতেই মূলত ১৫ আগস্টের ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। এতে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
৭ নভেম্বরের ঘটনাকে জনগণের সমর্থনপুষ্ট সিপাহি বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করে শফিকুর রহমান বলেন, ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৭ নভেম্বর সিপাহিরা বিপ্লব ঘটান এবং জনগণ তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে।
তিনি বলেন, 'বিপ্লবটা করেছে সিপাহীরা, সংহতি করেছে জনগণ। প্রকাশ্যে এই বিপ্লবকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছিল এ দেশের মানুষ।'
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সরকার দেশের প্রায় সব ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এসব সংগঠন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। নির্বাচনের আগে কোরআন-সুন্নাহর ওপর কোনো আঘাত করা হবে না বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত অবস্থান নেওয়া হয়। জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার জনগণের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে।
সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য বাহিনী থাকা সত্ত্বেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি নিয়ে শঙ্কিত হয়ে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করা হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। রক্ষীবাহিনীকে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়; তাদের বিরুদ্ধে বিচার ও জবাবদিহির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এ বাহিনীর হাতে ৩৪ হাজার মানুষ নিহত হন, যাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারকে বিনা বিচারে হত্যার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। দেশে হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট ও মানুষের সম্মানহানির বিচার ছিল না। একদিকে বিরোধী মত দমন করা হয়েছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।
একজন কর্মরত সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীকে অপহরণের ঘটনায় বিচার চাইতে গিয়ে ওই কর্মকর্তাকে চাকরি হারাতে হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন জামায়াতের আমীর। ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ব্যাংক লুট ও নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। হোটেল শেরাটনের একটি স্যুটকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভয়ে অভিভাবকেরা মেয়েদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের জন্য বিদেশ থেকে পাঠানো ত্রাণসামগ্রীও যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি; অনেক ত্রাণ বাইরে বিক্রি হয়ে গেছে। এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সাত কোটি মানুষের জন্য আট কোটি কম্বল আসার হিসাব তুলে ধরে নিজের কম্বল না পাওয়ার কথা বলেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের সম্পদ লুটপাট, দুর্নীতি, মানুষের অধিকার হরণ এবং বিনা বিচারে হত্যার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকার একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। সংবিধানে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাতে শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত থাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে বহাল থাকতে পারেন। বহুদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়।
সেনাবাহিনীকে অবজ্ঞা ও অপমান করার পাশাপাশি সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পেছনে সেটিও একটি কারণ ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। ১৫ আগস্টের পর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে একের পর এক ক্ষমতার পালাবদল ও অস্থিরতা চলতে থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বন্দি ছিলেন। ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহিরা সংগঠিত হয়ে তাকে মুক্ত করেন।
সিপাহিরা ট্যাংক নিয়ে রাস্তায় নামলে মসজিদ থেকে নামাজ শেষে বের হওয়া মানুষ তাকবির ধ্বনি দিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। সেই ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সিপাহিরা বিপ্লব সংঘটিত করেছিলেন, আর জনগণ তাতে সংহতি প্রকাশ করেছিল। এ কারণেই দিনটি 'জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বলে জানান তিনি।
আপনার মন্তব্য