ডেস্ক রিপোর্ট

২৭ ফেব্রুয়ারি , ২০১৫ ১৪:০৯

অভিজিৎ রায়ের হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল শাহবাগ-টিএসসি

২৬ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে বইমেলা থেকে ফেরার পথে মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হন বিশিষ্ট লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঠিক এভাবেই বইমেলা থেকে ফেরার পথে মৌলবাদী জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করেছিল হুমায়ুন আজাদকে।

লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যার জন্য ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার ডাক এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ এবং টিএসসিতে ব্লগারস অ্যাণ্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক (বোয়ান)-র কর্মসূচি থেকে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে ফাঁসিতে ঝুলানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
লেখক হুমায়ুন আজাদ ও ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার ধারাবাহিকতায় জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী বিজ্ঞানমনস্ক ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখক অভিজিৎকে হত্যা করেছে অভিযোগ করেন বক্তারা। অন্ধকারের এই শক্তির আঘাতের পাল্টা আঘাত দেওয়ার আওয়াজ তুলেছেন তারা।

সমাবেশে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “অভিজিৎকে যখন হত্যা করা হয়েছে তখন রাত গভীর হয়নি। টিএসসির সামান্য দূরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। হুমায়ুন আজাদকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল সেভাবে রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হয়। একইভাবে গতকাল অভিজিৎকে হত্যা করা হয়েছে।” জঙ্গিরাই এসব হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “তাদের হত্যাকাণ্ডের ধরণ দেখে সাধারণ মানুষও বলতে পারবে একই জঙ্গিগোষ্ঠী এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে।” এই হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শুধু স্লোগান দিলে হবে না অভিজিতের ওপর আঘাতের প্রতিঘাত আমাদের দিতে হবে।”

অভিজিৎকে হত্যার জন্য সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে দায়ী করে প্রবীণ রাজনীতিক পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, “একাত্তরের পরাজিত শক্তি দেশের বিরুদ্ধে ঘোষণা করেছে। তারা শুধু যুদ্ধ ঘোষণাই নয়, বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী দেশ করতে চায়, বাংলাস্তান করতে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। “এটা হতে পারে না। আমরা এটা হতে দেব না। এদের প্রতিহত করতে আমাদের একই কাঁতারে দাঁড়াতে হবে।”

টিএসসি এলাকায় পুলিশের উপস্থিতির মধ্যে অভিজিৎ ও তার স্ত্রীর ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষোভ জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এসএম মাসুদ কামাল। তিনি বলেন, “কয়েক বছর আগে আজকের এই দিনে যখন হুমায়ুন আজাদকে হত্যা করা হয় তখন ওই এলাকায় পুলিশ উপস্থিত ছিল। তাদের উপস্থিতিতে কিভাবে একজনকে হত্যা করা হয়েছিল তা আমার প্রশ্ন।

সমাবেশে অন্যদের মধ্যে কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, মানবাধিকার কর্মী হামিদা হোসেন, খুশী কবির, মুক্তিযোদ্ধা সারোয়ার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস উপস্থিত রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী অভিজিৎ, যিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লিখতেন। লেখালেখি নিয়ে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল জঙ্গিবাদীরা। হামলায় তার স্ত্রী ব্লগার রাফিদা আহমেদ বন্যাও গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

অভিজিৎ ও বন্যার ওপর কারা হামলা চালিয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কিছু বের করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। জঙ্গিগোষ্ঠীই এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বলে অভিজিতের পরিবার থেকে বলা হয়েছে।

অভিজিৎ রায়ের বাবা শিক্ষাবিদ অজয় রায় হত্যার মামলা করেছেন শাহবাগ থানায়।

যতক্ষণ পর্যন্ত না অভিজিৎ হত্যাকারীদের গ্র্রেপ্তার করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে এগারোটায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে শুরু হওয়া গণজাগরণ মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তৃতাকালে তিনি এ কথা বলেন।

এ সময় তিনি বলেন, অভিজিতের ওপরে হামলা অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপরে হামলা। এ হত্যাকাণ্ড আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না।

এখনই আমাদের সবাইকে ঘুরে দাঁড়াতে। জঙ্গিবাদী ও মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশ পাকিস্তানে পরিণত হওয়ার জন্য সবাইকে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না, বলেন ইমরান।

অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, জঙ্গিবাদী মৌলবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্র্রে ঢুকে গেছে। এদেরকে এখনই ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। না হলে কারও রক্ষা পাবার উপায় নেই।

এ সময় তিনি মৌলবাদীদের অর্থনৈতিক শক্তি গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

অবস্থান কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত আছেন, গণজাগরণ কর্মী জীবনানন্দ জয়ন্ত, উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সনাতন মালো, মানবাধিকার সংগঠক অ্যারোমা দত্তসহ গণজাগরণ, উদীচীর নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ।

বিজ্ঞান লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়ের খুনিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। এ ঘটনার গভীর সমবেদনাও জানান তিনি।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েশন অব বুয়েট অ্যালামনাইয়ের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

হাসনুল হক ইনু বলেন, সভ্যতার বাহক প্রকৌশলী অভিজিৎ মারা গিয়েছেন, কিন্তু আমরা বেঁচে আছি। আমরাই এই খুনি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে দানবের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তিন দাগের এ দেশকে রক্ষা করতে হলে এদের মোকাবেলা করতে হবে।

যুক্তিবাদী লেখক অভিজিৎ রায়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সংগঠনের সভাপতি বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, সহ-সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ও সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানানো হয়।

এতে বলা হয়-মুক্তমনা ওয়েব সাইটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, যুক্তিবাদী তরুণ লেখক অভিজিৎ রায়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী জঙ্গি মৌলবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিজিৎ রায় ও তার পিতা মানবাধিকার আন্দোলনের পুরোগামী নেতা অধ্যাপক অজয় রায়ের বিরুদ্ধে তাদের বিভিন্ন পুস্তিকা ও প্রকাশনায় ধারাবাহিকভাবে বিষেদগার করে আসছে।

মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী নাগরিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১২ সালে ‘মুক্তমনা’ ওয়েব সাইটকে জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক প্রদান করে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, মৌলবাদীরা ২০০৪ সালে বইমেলায় প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদের ওপর চাপাতি দিয়ে যেভাবে হামলা করেছিল, একইভাবে তারা অভিজিৎ রায়কে হত্যা ও তার সহধর্মিনী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে গুরুতর জখম করেছে।

এগারো বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ হত্যার বিচার হয়নি। ১৯৯৯ সালে কবি শামসুর রাহমানের উপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার ঘটনা থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী জঙ্গি মৌলবাদীরা যাদের হত্যা করেছে শতকরা দশ ভাগেরও বিচার হয়নি। বিচার না হওয়া ও বিএনপির মতো বড় দলের ছত্রছায়ায় থেকে জামায়াত ও জঙ্গি মৌলবাদীদের দেশ ও জাতিবিরোধী এবং মুক্তচিন্তা, মানবাধিকার ও সভ্যতাবিরোধী নৃশংস কর্মকাণ্ড সহ্যের সব সীমা অতিক্রম করেছে বলেও বিবৃতে উল্লেখ করা হয়।

অভিজিৎ রায়ের আত্মস্বীকৃত ঘাতকদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদসহ ২০০১ সাল থেকে জামায়াত-বিএনপির ‘সন্ত্রাসীরা’ যে সব বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিচারক, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করেছে তাদের সবার বিচার ও শাস্তি দাবি করেছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

একই সঙ্গে সব ‘মৌলবাদী’ সন্ত্রাসী গঠনের ‘মাতৃসংগঠন’ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিসহ সব কর্মকাণ্ড অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন তারা।

 

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত