ডেস্ক রিপোর্ট

২৭ ফেব্রুয়ারি , ২০১৫ ২৩:৩২

আতঙ্ক ছাপিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বইমেলা: প্রকাশকদের প্রতিবাদ শনিবার

লেখক অভিজিৎ রায়ের খুনের ঘটনায় তীব্র ভয়ে যেখানে আতঙ্কিত থাকার কথা ছিল সেখানে বাঙালির প্রাণের মেলা একুশে বইমেলা পেয়েছিল অন্য এক রূপ। বিশাল এই জনসমুদ্রের সবার মাঝেই শঙ্কা আর উদ্বেগ ছাপিয়ে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় দেখা গেল দিনভর। মাসব্যাপী একুশে বইমেলায় ঘুরে ঘুরে বই দেখা আর কেনার এই উৎসব হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার বিকেলের মেলা পরিণত হয় জনসমুদ্রে।

বৃহস্পতিবার রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলন চত্বরের উল্টো পাশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন ফুটপাতে হামলা হয় মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার ওপর। চাপাতির কোপে গুরুতর আহত অভিজিৎ রায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। মারাত্মকভাবে আহত হন রাফিদা আহমেদ বন্যা। উন্নত চিকিৎসার জন্যে তাঁকে ঢামেক থেকে স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই এলাকাতেই ২০০৪ সালের বইমেলার সময় একই কায়দায় জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছিলেন লেখক লেখক হুমায়ুন আজাদ। সেই ঘটনার বিচার না হওয়ায় এবার অভিজিৎকে খুন হতে হল বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। তাদের ধারণা বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের ক্রমে অন্ধকারের দিকে ধাবিত করছে। হুমায়ুন আজাদ, রাজীব হায়দারের হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করলে অভিজিৎকে এভাবে চলে যেতে হতো না।

সকালে টিএসসির রাজু ভাস্কর্য থেকে বইমেলা চত্বর পর্যন্ত এলাকায় জড়ো হয়ে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান লেখক-প্রকাশক-শিল্পীরা। যেখানে অভিজিৎ আক্রান্ত হয়েছিলেন সেখানে অনেকেই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছিলেন প্রকৌশল পেশায়। এবারের মেলায় তার দুটি বেরিয়েছে ।

অভিজিৎ রায়ের লেখা ডজনখানেক বইয়ের বেশিরভাগই প্রকাশ করেছে শুদ্ধস্বর। এ প্রতিষ্ঠানের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল জানান, অভিজিৎ খুন হওয়ার পর পাঠকরা এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তার বই কিনে। “তার লেখা ‘সমকামীতা’, ‘ভালোবাসা কারে কয়’, ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ বইগুলোর সব কপি দুপুরের মধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে। আর ‘অবিশ্বাসীর দর্শন; শেষ হয়েছে আগেই।”

আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনে শুদ্ধস্বরের টুটুল ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতালে। কর্তব্যরত ডাক্তারেরা যখন অভিজিৎকে মৃত ঘোষণা করেন তখন হু-হু করে কেঁদে ওঠেন তিনি। বলছিলেন- আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে, সাহিত্যের অনেক কিছু শেষ হয়ে গেছে। তুমি এভাবে চলে যেতে পারো না অভিজিৎ!

অনুপ্রাণন প্রকাশনের প্রকাশক আবু এম ইউসুফ আক্ষেপ করে বলেন- দীর্ঘ দিনের লেখালেখির মাধ্যমে অভিজিৎ রায় আজকের এই অবস্থানে এসেছিলেন, তাঁর চলে যাওয়া আমাদের জন্যে অনেক ক্ষতির। আমি জানি না কীভাবে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে কিন্তু লেখকদের থেমে থাকলে চলবে না। তিনি এই হত্যার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সব শ্রেণী-পেশার মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এক রঙা এক ঘুড়ি প্রকাশনীর প্রকাশক ও সাহিত্যের ছোটকাগজ মেঘফুল’র সম্পাদক কবি নীল সাধু বলেন- আমি বুঝতে পারছি না কী হতে যাচ্ছে, এভাবে লেখকেরা হারিয়ে গেলে আমাদের কিছু বাকি থাকে না।

একজন মানুষ এভাবে খুন হয়ে যাবে এবং ঘরে বসে থাকব এটা হতে পারে না এমন দীপ্ত উচ্চারণ করলেন কবি চৈতী আহমেদ। অভিজিৎ হত্যার প্রতিবাদ ও শাস্তির দাবিতে সবাইকে বইমেলায় আসার আহ্বান জানান তিনি।

ছুটির দিনের নিয়ম অনুযায়ী সকাল ১১টায় বইমেলা শুরু হওয়ার পর থেকে সব আলোচনায় বার বার ফিরে এসেছে অভিজিৎ প্রসঙ্গ। সে সময় অনেকের কথাতেই মেলার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা আর উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।

পুস্তক প্রকাশক, বিক্রেতা ও বিপণন সমিতির আহ্বায়ক ও শ্রাবণ প্রকাশনীর প্রকাশক রবীন আহসান জানান, শনিবার বিকাল ৪টা থেকে ১০ মিনিট মেলা বন্ধ থাকবে। অভিজিৎ হত্যার প্রতিবাদে প্রকাশকদের এই প্রতীকী কর্মসূচি।

এবারের অমর একুশে বইমেলা শেষ হচ্ছে শনিবার; সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলার পুরোটা সময় বই, পাঠক আর লেখকদের সঙ্গে অভিজিৎও থাকবেন, সন্দেহ নেই।

 

 

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত