২৮ ফেব্রুয়ারি , ২০১৫ ০২:১২
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বইমেলা চলছে সেখানে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য। টিএসসির বিভিন্ন জায়গায় টহল দিচ্ছে পুলিশ, টিএসসি থেকে শাহবাগ থানার দূরত্ব কয়েক শ’গজ তবু এখানেই শত শত লোকের সামনে জঙ্গিরা হত্যা করল বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে। কুপিয়ে আহত করল তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে।
অভিজিৎ রায় যেখানে আক্রান্ত হলেন সেখান থেকে হুমায়ুন আজাদের আক্রান্তস্থল খুব বেশি দূরত্বের নয়। আক্রমণের স্টাইল ছিল অভিন্ন, যেমনটা ছিল ব্লগার থাবা বাবা ওরফে রাজীব হায়দারের ক্ষেত্রেও। মাথা ও ঘাড় লক্ষ করে চাপাতির কোপ ছিল তাদের শরীরে।
ময়নাতদন্ত রিপোর্টে দেখা যায়, অভিজিৎ রায়ের মাথার ডান পাশে ‘অত্যন্ত দক্ষ হাতে হিংস্রভাবে’ ধারাল অস্ত্রের তিনটি কোপ দিয়েছিল খুনি, যার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্ম ব্যবসার বিরুদ্ধে সোচ্চার এই লেখকের মৃত্যু হয়।
শুক্রবার অভিজিতের লাশের ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ জানান- অভিজিৎ রায়ের মাথার পেছন দিকে ডান পাশে তিনটি গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল, যেগুলো করা হয়েছে চাপাতির মতো কোনো ধারাল অস্ত্র দিয়ে।
“একটি আঘত থেকে আরেকটি আঘাতের দূরত্ব আধা ইঞ্চি; সবগুলোই সমান্তরাল। ওই আঘাত এতোই মারাত্মক ছিল যে চামড়া ও হাড় কেটে একবারে মগজে পৌঁছেছে। এছাড়া পিঠে ও বাঁ চোখের ভ্রুর কাছে জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে।”
মূলত মাথার পেছনে তিনটি আঘাতের প্রচণ্ডতা ও অতিরিক্ত রক্তক্ষণেই অভিজিতের মৃত্যু হয়েছে বলে এই চিকিৎসকের ধারণা।
“এটি খুব দক্ষ হাতের কাজ। কোথায় মারলে মানুষ মারা যায়, সেটা হামলাকারীরা জানে। তারা অত্যন্ত দক্ষ ও হিংস্র ছিল। তিনটি আঘাত করেছে আধা ইঞ্চি ব্যবধানে, একটি আরেকটির ওপর পড়েনি।”
‘পরিকল্পনা, দক্ষতা আর হিংস্রতা’ ছাড়া এভাবে মানুষ হত্যা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে যে স্থানটিতে অভিজিৎ রায়ের ওপর হামলা হয়, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই ছোটবেলা কেটেছে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এই লেখকের। তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক অজয় রায় এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করেছেন ‘উগ্র জঙ্গিবাদীদের’। পুলিশও জঙ্গিবাদীদের দিকে আঙুল তুলেছে, কিন্তু শাহবাগ থানা থেকে মাত্র আড়াইশ গজ দূরত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে কীভাবে তারা একই কায়দায় বার বার হামলা করছে তার কোনে সদুত্তর পুলিশ কর্তাদের কথায় মেলেনি।
এদিকে অভিজিৎ রায় খুন হওয়ার পর একদিন পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া গোয়েন্দা পুলিশ কোনো অগ্রগতির খবরও দিতে পারেনি।
ঢাকার পুলিশ কামিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া শুক্রবার সংবাদমাধ্যমকে জানান- “জঙ্গিরা কতোটা ডেসপারেট হতে পারে তার প্রমাণ দিয়েছে গতকাল। পাশেই থানা, বইমেলার প্রবেশমুখে পুলিশ, সবগুলো প্রবেশপথে পুলিশ... এরপরও এখানে একটা ঘটনা ঘটিয়ে গেছে তারা।”
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা আসার পর প্রতিদিনই বইমেলায় যাওয়া আসা করছিলেন অভিজিৎ রায়। বৃহস্পতিবার রাতে যে জায়গায় তার ওপর হামলা হয়, ওই পথ দিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বইমেলায় যায়, চলাফেরা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মীরা। ঘটনাস্থল থেকে টিএসসি মোড় আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রবেশ পথের দূরত্ব ২৫/৩০ গজ। টিএসসি মোড়ে মেলার জন্য ব্যারিকেড দিয়ে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসই পাহারায় রয়েছে পুলিশ। এছাড়া দুই/আড়াইশ' গজ দূরে শাহবাগ থানা। শাহবাগ মোড়, বইমেলা পেরিয়ে দোয়েল চত্বর, ফুলার রোডের মোড়, নীলক্ষেতসহ ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রবেশমুখে রয়েছে সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তা। তারপরও কীভাবে এরকম একটি হত্যাকাণ্ড ঘটল, হামলাকারীরা কীভাবে কাজ শেষে নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেল, হত্যাকাণ্ডের পর একদিন পার হলেও পুলিশ কেন কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারল না- এসব প্রশ্নের জবাব নেই কারও কাছে।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি লেখক হুমায়ুন আজাদকেও কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয় এই টিএসসি এলাকায়। টিএসসি থেকে মাত্র শ’ খানেক গজ দূরে ফুটপাতের ওপর ফেলে কোপানো হয় তাকে, যে ঘটনায় জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। বইমেলার মাসে সেই তারিখের একদিন আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি খুন হলেন অভিজিৎ, যিনি সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর লেখালেখি করে আসছিলেন নিয়মিত। এ জন্য তাকে হুমকিও পেতে হয়েছে। একই স্থানে আবারও একজন লেখক হামলার শিকার হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বইমেলার প্রকাশক, লেখক, পাঠক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যেও।
এদিকে পুলিশের নিরাপত্তায় দুর্বলতার কথা মানতে চাননি পুলিশ কামিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তবে পুলিশের নাকের ডগায় আবারও একই ধরনের হামলায় তারাও যে স্তম্ভিত, তা তার কথাতেও স্পষ্ট। হুমায়ুন আজাদ, ব্লগার রাজিব আর অভিজিত হত্যার ঘটনা ‘একই সূত্রে গাঁথা’ বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মুক্তচিন্তার দুই লেখকের একইভাবে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকেই প্রশ্ন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা তাহলে কতখানি নিরাপদ? খোদ পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যেখানে বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাইরে থেকে কেউ না আসার সম্ভাবনা। সেক্ষেত্রে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয় কী তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে?
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গণজাগরণ আন্দোলন চলাকালীন সময়ে বুয়েটের দ্বীপ আক্রান্ত হয়েছিলেন মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে। হামলায় দ্বীপ নিহত হন, সে হত্যাকাণ্ডের বিচার থমকে আছে, বিচার থমকে আছে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধেও। হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘন্টার বেশি সময় পার হয়ে গেলেও কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা মুক্তচিন্তার প্রগতিশীল মানুষদের কাছে কতখানি নিরাপদ সে প্রশ্ন ঘুরছে সবার মনে।
আপনার মন্তব্য