২৬ মে, ২০১৫ ১২:০৬
মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের ১৩৯টি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির পুলিশ। থাই সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় মানব পাচারকারীদের ২৮টি পরিত্যক্ত আস্তানায় এ কবরগুলো পাওয়া যায়। এর মধ্যে কয়েকটি থেকে বেশকিছু মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ দেহাবশেষগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
মালয়েশিয়ার পুলিশ প্রধান খালিদ আবু বকর বলেন, ‘গণকবরগুলোয় কতগুলো মরদেহ আছে, এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। তবে একেকটি গণকবরে একাধিক অভিবাসীর মরদেহ থাকতে পারে। আজ সকালেই আমাদের কর্মকর্তারা উদ্ধারকাজ শুরুর জন্য পৌঁছেছেন।’
খালিদ জানান, থাই-মালয়েশীয় সীমান্তে প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অভিযান চালিয়ে এ বন্দিশিবির ও গণকবরগুলোর খোঁজ পাওয়া যায়। কিছুদিন আগে থাইল্যান্ডের শঙ্খলা প্রদেশে সন্ধান পাওয়া বন্দিশিবির ও গণকবরগুলো থেকে এ স্থানের দূরত্ব মাত্র কয়েকশ মিটার। ২৮টি বন্দিশিবিরের মধ্যে কয়েকটিতে একসঙ্গে তিন শতাধিক বন্দি রাখার মতো জায়গা আছে বলে জানান খালিদ। বন্দিশিবির ও গণকবরের সন্ধান পাওয়ার ঘটনা তদন্তকালে মানব পাচারে জড়িত বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। দুই দেশের উপকূল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত পাঁচ বছর ধরে প্রত্যন্ত অঞ্চলটিতে অভিবাসীদের বন্দিশিবির তৈরি করে মানব পাচারকারীরা। এ কাজে মালয়েশিয়ার কিছু নাগরিকও জড়িত থাকতে পারে।
বেশ কয়েক বছর ধরে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল ও মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলের জঙ্গলপথ ধরে মানব পাচার করে আসছিল পাচারকারীরা। পরবর্তীতে মানব পাচার বন্ধে থাই সরকার দমন অভিযান শুরু করলে এ কাজে স্থলপথে ব্যবহূত সব রুট বন্ধ হয়ে যায়। পাচারকারীরা তখন এ কাজের জন্য পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে জলপথের ওপর। সাগরপথে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া উপকূলের দিকে পাড়ি জমাতে থাকে তারা। কিন্তু সেখানেও থাই নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের তৎপরতায় গভীর সাগরে অভিবাসীদের ফেলে পাচারকারী নৌকা থেকে পালিয়ে যায় তারা। এ নৌকাগুলো ভাসতে ভাসতে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের জলসীমায় পৌঁছলে অভিবাসীদের আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানায় দেশগুলো। পরবর্তীতে এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার পর এ অভিবাসীদের আশ্রয় দিতে শুরু করে দেশগুলো।
অভিবাসীদের মধ্যে অধিকাংশই মিয়ানমারে জাতিগত দাঙ্গার শিকার রোহিঙ্গা শরণার্থী। প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় আশ্রয় নেয়ার জন্য ছুটে যাচ্ছেন তারা। বাকি সবাই জীবিকার খোঁজে মালয়েশিয়ার দিকে রওনা হওয়া বাংলাদেশী।
সম্প্রতি বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, থাই সমাজের ‘প্রায় সবাই’ কোনো না কোনোভাবে মানব পাচারে যুক্ত। তবে মালয়েশিয়ায় গণকবরের সন্ধান পাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। যদিও কিছুদিন আগে সেখানে পাচারকারীদের কোনো ক্যাম্প নেই বলে দাবি করেছিল দেশটির সরকার।
এ প্রসঙ্গে জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনে অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সভাপতি আব্দুল বাশার বলেন, যেসব লোক অবৈধভাবে সমুদ্রপথে যাত্রা করছেন, তাদের ৯০ শতাংশই অশিক্ষিত। এ কারণে তাদের সহজেই প্রলোভনে ফেলতে পারছে মানব পাচারকারী চক্রগুলো। স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হবে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিবাসীদের সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশ যাত্রার হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বঙ্গোপসাগর দিয়ে ২৫ হাজার লোক মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছে। এর অর্ধেকেরও বেশি বাংলাদেশী। ২০১৪ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে অবৈধভাবে যাত্রা করেছে। এদের মধ্যে শুধু বঙ্গোপসাগর দিয়ে যাত্রা করেছে ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের বেশির ভাগেরই গন্তব্য থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া। এভাবে ২০১২ সাল থেকে গত তিন বছরে বঙ্গোপসাগর দিয়ে মালয়েশিয়া গেছে কমপক্ষে দেড় লাখ।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির অন্যতম বাজার মালয়েশিয়া। ২০০৭ সালে ২ লাখ ৭৩ হাজার ২০১ এবং ২০০৮ সালে ১ লাখ ৩১ হাজার ৭৬২ জন মালয়েশিয়া গেছেন। ২০০৯ সালে দেশটি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করে দেয়। এর পর বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিদের বাদ দিয়ে সরকারিভাবে দেশটিতে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর সরকারিভাবে কর্মী পাঠাতে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়।
জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, কর্মসংস্থানের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে দেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় সাত লাখের বেশি লোক বিদেশে পাড়ি দিতে চায়। কিন্তু গত দুই বছরে গড়ে চার লাখের কিছু বেশি শ্রমিক বৈধ পথে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। আর যারা যেতে পারছে না, তারা মানব পাচারকারী চক্রের শিকারে পরিণত হয়। এসব চক্রের প্রলোভনে পড়ে গ্রামাঞ্চলের সহজ-সরল মানুষ মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড যাওয়ার জন্য নৌপথে যাত্রা করছে। বহু অভিবাসী মাসের পর মাস নৌকায় সমুদ্রে ভেসেছেন। পানি ও খাবারের অভাবে তাদের অনেকেই সাগরে প্রাণ হারিয়েছেন। জানা গেছে, মালয়েশিয়াগামী অভিবাসীদের অনেক সময় থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গল, আন্দামান ও ইন্দোনেশিয়ার উপদ্বীপে নিয়ে ছেড়ে দেয় মানব পাচারকারীরা।
আপনার মন্তব্য