সিলেটটুডে ডেস্ক

০৮ ফেব্রুয়ারি , ২০১৮ ০১:২৮

কী আছে খালেদার ভাগ্যে?

বহুল আলোচিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় আজ। সারাদেশের চোখ আজ এই রায়ের দিকে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আজকের রায়ে দণ্ডিত হবেন না খালাস পাবেন- এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র।

নির্বাচনের বছরের শুরুতেই এই রায়কে ঘিরে রাজনীতিতে দেখা দিয়েছে উত্তাপ। সংঘাত এড়াতে দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্থানে স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে চলছে তল্লাশী। গ্রেপ্তার অভিযান তো কয়েকদিন ধরেই চলছে।

আজকের রায়ের উপর নির্ভর করছে বিএনপির ভবিষ্যত। এই মামলা ছাড়াও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরও একটি দুর্নীতি মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাও শেষ হয়ে রায়ের পর্যায়ে চলে আসবে যে কোনো দিন।

এ ছাড়াও দুর্নীতির আরও তিনটি মামলা ছাড়াও পুরান ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে স্থানান্তর হয়েছে আরও ১৪টি মামলা। এসব মামলার বিচার চলতি বছর শেষ হবে কি না সেটা নিশ্চিত নয়, তবে বছর জুড়েই তাকে আদালতে ছুটতে হবে পারে।

আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিলেও বিএনপি নিশ্চুপ। দলটি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না, সেই কৌতূহলেরও জবাব মিলবে আরও পরে।

তবে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর থেকে বিএনপিতে যে বিভ্রান্তির বেড়াজাল তৈরি হয়েছে, সেটি এখনও কাটছে না। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুচিন্তিত অবস্থান নেয়ার বদলে একেক নেতা একেক অবস্থানের কথা বলে যাচ্ছেন। আর এ নিয়ে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও আছে বিভ্রান্তি।

বিএনপির নেতারা স্পষ্ট করে বলছেন না রায় প্রসঙ্গে তাদের কৌশল কী? তবে অনেক নেতাই বলেছেন- রায় বিপক্ষে গেলে তারা মানবেন না।

রায়ের আগে এবং পরে রাজধানীতে বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার কাজটিও ভেতরে ভেতরে চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। সারা দেশেও নেতাকর্মীদের সজাগ থাকার জন্যও নির্দেশনা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তবে পুলিশ সেদিন বিএনপিকে জড়ো হতে দেবে-এমনটাও না। কারণ মিছিল সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ, চলছে গ্রেপ্তার অভিযান, বিএনপির হিসাবে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত এক হাজার একশ, পরে বেড়েছে আরও।

বিএনপি নেতারা প্রকাশ্যে যা বলছেন, তাতে এটা স্পষ্ট যে খালেদা জিয়ার সাজার আশঙ্কা করছেন তারাও। মামলাটিকে মিথ্যা আখ্যা দিয়েই নেতারা বলছেন, নির্বাচন থেকে তাদের নেত্রীকে সরিয়ে দিতে আদালতের মাধ্যমে রায় দেয়ার চেষ্টায় সরকার।

আর এই আশঙ্কা থেকে দলের গঠনতন্ত্রও পাল্টে ফেলেছে বিএনপি। পাল্টানোর আগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দণ্ডিতদের দলের সদস্যপদ থাকার কথা না। দলের ভবিষ্যত নেতা হিসেবে পরিচিত তারেক রহমান অর্থপাচার মামলায় দণ্ডিত হয়ে আছেন আগেই। এখন খালেদা জিয়াও দণ্ডিত হলে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাদের নেতৃত্ব থাকা নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারত।

গঠনতন্ত্রের ৭ এর ‘ঘ’ ধারায় ‘দুর্নীতিপরায়ণ কেউ’ দলে থাকতে পারবে না, বলা ছিল। এখন সেই ধারাটিই তুলে দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে দলটি।

গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনার ফলে কারাগারে যেতে হলেও দল পরিচালনায় খালেদা জিয়ার কোনো বাধা থাকছে না। তিনি কারাগারে থেকেই নির্দেশনা দিতে পারবেন।

এই পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে আসলে ২০১৩ সালের আন্দোলনের আগের মতো পরিস্থিতি ফিরে এসেছে। বিএনপি নেতারা জোরালো আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছেন জনগণের কথা বলে। আওয়ামী লীগের নেতারাও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন জনগণের কথা বলেই।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বিএনপি সহিংসতার পথে হাঁটলে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি তারাও রাজপথে থাকবে। সহিংসতা মোকাবেলা করবে।

দুই পক্ষের এই মুখোমুখি অবস্থানে উদ্বেগ আছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষা বিঘ্নিত হয় কি না, সে নিয়ে আছে প্রশ্ন। আবার ২০১৫ সালের পর থেকে বাধাহীনভাবে চলে যাওয়া অর্থনৈতিক কর্মকা-ে আবার কোনো ছেদ পড়ে কি না, এ নিয়েও ভীতি আছে।

অবশ্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তারা আন্দোলন করবেন, সহিংসতা নয়। যা হবে শান্তিপূর্ণভাবে। তবে কেউ তাদের আন্দোলনের সুযোগে অপ্রীতিকর কিছু করে তাদের ঘাড়ে দোষ চাপাতে পারে, এই শঙ্কাও আছে।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতি বা কোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন বলে উল্লেখ আছে।  কিন্তু  তারেক রহমান একটি মামলায় দণ্ডিত, তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে লন্ডনে। এ অবস্থায় তিনি কীভাবে নেতৃত্ব দেবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও তারেক লন্ডনে বসেই নেতৃত্ব দিতে চাইছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে।

দলের এমন গুঞ্জনও আছে যে, তারেক রহমানের বিকল্প হিসেবে তার স্ত্রী জোবাইদা রহমান সামনে আসতে পারেন। নেতাকর্মীদের কাছে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পর তার গ্রহণযোগ্যতাও আছে। যদিও এতে তারেক রহমানের সম্মতি নেই বলে শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া ‘অবৈধ সম্পদ অর্জনের’ অভিযোগে জোবাইদার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি মামলা রয়েছে। সেক্ষেত্রে দেশে আসলে তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন এমন আশঙ্কা আছে।

বিএনপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া বেশ কয়েকমাস লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তখন দল চলেছে না? তার যদি সাজা হয় তাহলে দল চালাতে সমস্যা হবে এটা ঠিক না।’

রায় বিপক্ষে গেলে কর্মসূচি কি হবে তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য না মিললেও আপাতত কঠোর কর্মসূচির দিকে যাওয়া ঠিক হবে না বলে বিএনপির একাধিক নেতা মনে করেন।

শনিবার দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠক শেষে খালেদা জিয়া স্পষ্টতই বলেছেন, রায়কে কেন্দ্র করে হঠকারিতা চান না তিনি।

নেতারা বলছেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের মত আবার কঠোর কর্মসূচি দিলে সরকার ফায়দা নিতে পারে। তারা নিজেরা নাশকতা করে বিএনপিকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করবে। কর্মসূচির বিষয়টি রায় ঘোষণার পর বলতে চান বিএনপি নেতারা।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘বিএনপি এবং খালেদা জিয়া একে অপরের পরিপূরক। খালেদা জিয়াকে দণ্ডিত করা হলে আন্দোলন জোরদার হবে। বিএনপির পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাই সামনে না গিয়ে আর উপায় নেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা কর্মসূচি নিয়ে অবশ্যই মাঠে নামব।’

খালেদা জিয়ার রায়কে সামনে রেখে যে প্রসঙ্গটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, সেটা হচ্ছে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আসবে কি না।

অন্যান্য অনেক প্রশ্নের মতো এই বিষয়টিতেও বিএনপির সুস্পষ্ট অবস্থানের কথা জানা যাচ্ছে না। বিএনপির কোনো নেতা বলছেন, সরকার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাজা দিয়ে আবার একতরফা নির্বাচনের ছক কষছে। কিন্তু বিএনপি তা হতে দেবে না।

এই রায়ের প্রসঙ্গ আসার আগ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচন নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়ে আসছিল। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিও জানিয়ে আসছেন নেতারা।

বিএনপির তোলা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি নিয়ে সরকারি দল হাস্যরসের সুযোগ পেয়েছে বিরোধী দলটির নেতাদের বক্তব্যইে। ২০১৬ সালের শেষ দিকে বেগম খালেদা জিয়া সহায়ক সরকারের প্রসঙ্গটি সামনে আনেন। এরপর থেকে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ‘ভুলে গিয়ে’ এই দাবিটিই সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু সহায়ক সরকারের রূপরেখা দিতে না পারার পর ২০১৭ সালের শেষ দিকে এই সরকারের বদলে আবার তত্তাবধায়কের দাবিতে ফিরে যায় দলটি।

তবে সম্প্রতি আবার সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দেয়ার কথা জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এই প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়েছে। যে কোনো দিন তোলা হবে।

এর মধ্যে ২৫ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণার পর প্রসঙ্গ পাল্টে গেছে। তখন থেকে প্রশ্ন আসে, খালেদা জিয়ার সাজা হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না।

আইন অনুযায়ী মামলায় কারও দুই বছরের সাজা হলে তিনি নির্বাচনে লড়াইয়ের যোগ্যতা হারাবেন। তবে বিচারিক আদালতের রায়েই বিষয়টি চূড়ান্ত হবে কি না, এ নিয়ে আইনজীবীদের মতভেদ আছে। খালেদা জিয়ার সাজা দলে তিনি আপিল করবেন-এটা আইনজীবীরা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন। আর আপিল গ্রহণ করা হলে দণ্ডিতদের নির্বাচনে লড়াইয়ের উদাহরণ আছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত