নিজস্ব প্রতিবেদক

১০ এপ্রিল, ২০১৮ ১৯:১৮

কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সংসদে যা বলেছিলেন মতিয়া চৌধুরী

কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এক বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতা ইতিমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের অনেকেই তার বক্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সোমবার (৯ এপ্রিল) কোটা সংস্কার ইস্যুতে জাতীয় সংসদে মতিয়া চৌধুরীর সেই বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরা হল:-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং এক সময়ের ডাকসুর জিএস হিসেবে যেহেতু আমি কাজ করেছে আমি কিছু না বলে স্থির থাকতে পারলাম না।

তখনো আমরা আন্দোলন করেছি, অনেক কঠিন আন্দোলন করেছি। মোনায়েম খান ছিল চ্যান্সেলর। সেই কনভোকেশনে কিন্তু মোনায়েম খান শেষ পর্যন্ত সে কনভোকেশন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করে যেতে পারেনি। কিন্তু সেখানে এই উপাচার্যের গায়ে হাত দেওয়া, তার বাড়িতে গিয়ে যেটি তারানা হালিম বললেন যে বাড়ির মেয়েরা ভীত, কম্পিত এবং সময়টা কখন রাত। রাতের অন্ধকারে যে কোন একটা দুর্ঘটনা একটি মানুষের জীবন বিশেষ করে একজন নারীর জীবন শেষ করে দিতে পারে। সেইখানে এই ধরনের একটি জঘন্য হামলা, ভাংচুর। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা শিক্ষার্থী আমি মনে করি সত্যিকারের যারা জ্ঞানের চর্চা করতে এসেছে সবার জন্য এটা একটা কলঙ্কজনক অধ্যায়।

আমার একটা প্রশ্ন, প্রতিবাদ যদি করতে হত মুখোশ পড়তে হবে কেন? মুখোশ কারা পড়ে? ভণ্ড যারা তারা পড়ে, প্রতারক যারা তারা পড়ে, সিক যারা তারা পড়ে। সাহস থাকলে মুখটা দেখাও। লজ্জা করে না। ইতর হওয়ার একটা সীমা আছে।

আজকে এই সঙ্গে আমার মনে পড়ছে। আমি বগুড়ায় যখন সাঈদীকে চান্দে দেখা গেছে বলে তাণ্ডব করা হয়েছিল তখন আমি সেখানে গিয়েছিলাম। এইভাবে সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে বলে সেখানে আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ সাহেব তাঁর বাড়িতে আগুণ দেওয়া হয়েছে। বাড়িতে কিন্তু সেই ছেলেমেয়েরা তাঁর পরিবারের অন্যান্যরা ছিল। সেই ছাদের উপর দিয়ে অন্য বাড়িতে তাঁরা টপকে তাদের প্রাণে বেঁচেছে।

স্টাইলটা এক, একই ধাঁচ এবং একইভাবে এরা অন্ধকারে অন্ধকারে জীব হিসাবে। আর সেখানে পবিত্র মসজিদকেও ব্যবহার করা হয়েছিল। মসজিদের মাইকে বলা হয়েছিল সাঈদীকে চান্দে দেখা গেছে।

আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনায় ফেসবুক। কে আনলেন? আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। গ্রামে একটা কথা আছে 'যার শীল তার নোড়া, তারই ভাঙ্গে দাঁতের গোড়া।' এই ফেসবুক, এই আইটি, এই ইন্টারনেট এই সারা পৃথিবীকে হাতের আঙ্গুলের আগায় কে নিয়ে আসার সুযোগ দিয়েছেন? কে সেই অবকাঠামো তৈরি করেছেন? তিনি হলেন জাতির পিতার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আর তাঁর সুযোগ্য পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়।

আজকে সেই ফেসবুক ব্যবহার করে যে মারা যায়নি, আমরা তাঁদের কাছ থেকে কৈফিয়ত চাই। কি হবে মেরে ফেলবেন? আপনারা তো শহীদুল্লাহ কায়সারকে বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে মেরেছেন। আপনারা রশীদুল হায়দারকে মেরেছেন। এরা সেই ১৪ই ডিসেম্বরের সেই শক্তি। ১৯৭১ এ যারা বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করেছিল। যারা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস খুঁজে খুঁজে বাংলাদেশ যাতে এগুতে না পারে স্বাধীনতার বা মুক্তির সংগ্রাম যাতে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছাতে না পারে। এমনকি পরাজয়ের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এই বাংলাদেশ যেন তার নিজের সেই শক্তিতে দাঁড়াতে না পারে তখনো তারা এইভাবে খুন করে গেছে মানুষকে, শিক্ষককে, ডাক্তারকে, প্রকৌশলীকে।

আমি আবারো বলতে চাই মুখোশ কেন? কাপুরুষ মুখ দেখানোর সাহস রাখে না। আজ তারা সে সেই উপাচার্যের বাড়িতে এমনকি নারী-শিশু সেই সামান্য তাঁদের সঙ্গে যে সৌজন্য সেটা পর্যন্ত রক্ষার কোন প্রয়োজনবোধ করে না। আরা কোটা নিয়ে আমি একটা কথা খুব পরিস্কার বলতে চাই। আমরা মফস্বল এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে আসি। ঢাকায় যে ছেলে বা যে মেয়েটি পড়াশোনা করে একটু অভিজাত স্কুলে। আর শেখ হাসিনার বিনা পয়সার বই পাওয়ার সুবাদে যে মেয়েটি বা যে ছেলেটি সেই উচ্চশিক্ষার প্রবেশদ্বারে আজকে আসতে পেরেছে তার গ্রুমিং আর এই ঢাকায় ক্লাস এলাকার স্কুলের গ্রুমিং বা কলেজের গ্রুমিং এক না। মেধার বিচার সমপর্যায়ে এনে সমান সুযোগ দিয়ে তার পড়ে মেধার বিচার করেন।

আর আমার এলাকায় আদিবাসী আছে। আমার এলাকায় বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী আছে। আর আসল গাত্রদাহ কোথায়? মুক্তিযোদ্ধার কোটায়। কেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । একটি প্রজন্ম তো, যখন আমরা ৯৬তে সরকার গঠন করলাম। আবার ২০০১ এ আমরা আসতে পারলাম না ষড়যন্ত্রের কারণে। ২০০৯ এ ঐ একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের সরকারি চাকরি করতে মানে যাওয়ার বয়স তো পার হয়ে গেছে। সে তো পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে পারছে না। আর পৃথিবীর দেশে দেশে মুক্তিযুদ্ধ, দেশের স্বাধীনতা রক্ষা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যারা লড়াই করে, জীবন দেয়, জীবনকে বাজি রাখে তাঁদের জন্য সুযোগ আছে। এটা কোন নতুন কিছু নয়। ওয়ারব্যাটলদের ছেলেমেয়েরা সুযোগ পায়। আর যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল মুক্তিযুদ্ধ তাঁদের ছেলেমেয়ে বা বংশ সেই আরেকটি সিঁড়ি তারা সুযোগ পাবে না, ঐ রাজাকারের বাচ্চারা সুযোগ পাবে। তাঁদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংকুচিত করতে হবে। মফস্বলের সেই আমাদের কলিমুদ্দি-সলিমুদ্দির ছেলেমেয়েরা যাতে উপরের দিকে উঠতে না পারে। রাখো তাঁকে এক জায়গায়। একটা স্তরের উপরে সে মাথা তুলে না দাঁড়ায়। এইভাবে রাজধানী কেন্দ্রিক, উঁচুতলা কেন্দ্রিক একটা এলিট শ্রেণী তৈরির করার যে একটা সুপরিকল্পিত যে পরিকল্পনা বা চক্রান্ত তারই আজকে আমরা কালকে রাতে তার মহড়া দেখলাম।

পরিস্কার বলতে চাই মুক্তিযুদ্ধ করেছি, মুক্তিযুদ্ধ চলছে, চলবে। আর এই রাজাকারের বাচ্চাদের অবশ্যই আমরা দেখে নেব।

আর ছাত্ররা, তাদের প্রতি আমাদের কোন রাগ নেই। কিন্তু স্ট্যাটাস যারা দিয়েছে তারা তো ছাত্র না, অছাত্র, মতলববাজ, জামায়াত-শিবির স্বাধীনতাবিরোধীদের এজেন্ট। এদের সম্বন্ধে সামান্যতম শৈথিল্য আমরা দেখতে চাই না, দেশবাসী দেখতে চায় না।

আর আমি আবারো বলি আমার ঐ বউরাধানি গ্রাম, আমার ঐ কাকরকান্দি গ্রাম, আমার ঐ পানিহাদা গ্রাম সেখান থেকে একটি ছেলে তাঁকে আমি সে আবছায়া জায়গায় আছে। তাঁকে আমি আলোতে আনার জন্য সুযোগ দেব সব অধিকার দেব। এটাই আমার দেশের শাসনতন্ত্র আমাকে এটা বলতে শিখিয়েছে, এই সাহস যুগিয়েছে। অবশ্যই সেই অধিকার আমরা নেব। এটা নিয়ে আন্দোলন তথাকথিত।

এটা শুরু হওয়ার আগেই আমি একজন প্রাক্তন আমলাকে বলেছিলাম আপনাদের তো মোক্ষ লাভ হয়ে গেছে, আপনাদের মোক্ষ লাভ হয়ে গেছে। আপনারা ঢাকায় বাড়িও করছেন, প্লটও নিছেন, আবার ছেলেমেয়েরে উচ্চ শিক্ষিত করছেন, আবার সেই রেফারেন্সে একেকজন উপরের দিকে উঠার সিঁড়িও তৈরি করে দিছেন। তাই মফস্বলের, গ্রামের, ঐ প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেউ এসে আপনার ছেলের বা মেয়ের সঙ্গে এসে হাত মিলাক আপনি তো এখন উঁচুতলার। সেই জন্য ছোঁয়ও না, ছোঁয়ও না ঐখানে থাকো এই লক্ষ্যে এবং সাঈদীদের চান্দে নিয়ে যারা অরাজকতা এই বাংলাদেশের স্বাধীনতারে আঘাত করতে চায় ধিক তাঁদের। তাঁদের মুখে আমি থুথু নিক্ষেপ করি এবং তাঁদের আমি উপযুক্ত শাস্তি দাবি করি।

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরে বলবো এদের কোন ক্ষমা নাই, এদের ক্ষমা করা সম্ভব না। হয় ওরা থাকবে না হয় আমরা থাকব। এই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা। জয় বাংলা এবং আমরাই থাকব।

ভিডিও :

আপনার মন্তব্য

আলোচিত