২০ মে, ২০২০ ০১:০০
সংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। প্রায় ১০ একরের বিশাল জায়গা নিয়ে নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এ হাসপাতাল। তবে এখন সংক্রামক ব্যাধি করোনাভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করার সময়ে এই হাসপাতালটি কোনো কাজেই লাগছে না। বরং দীর্ঘ অবহেলা আর নানা সঙ্কটে নিজেই ধুঁকছে এ হাসপাতালটি।
সিলেটে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত সিলেটের একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালকে রোগী চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় সিলেটের বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে করোনা চিকিৎসায় ব্যবহার করতে চাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে সিলেটে সংক্রামক ব্যাধি চিকিৎসার জন্য আলাদা একটি হাসপাতাল থাকলেও তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রথমে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিলো। তবে এখানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার আনুসাঙ্গিক কোনো যন্ত্রপাতি না থাকা ও লোকবল সংকটে এই পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে স্বাস্থ্য অধিপ্ততর।
কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো এই হাসপাতাল
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্রে থেকে জানা যায়, ১৯৬২ সালে ‘কলেরা হাসপাতাল’ নামে ১০ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত হয় ২০ শয্যার এই হাসপাতাল। পরে এটিকে ‘সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল’ হিসেবে নামকরণ করা হয়। সংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য তৎকালীন সময়ে শহরের বাইরে নির্জন স্থানে নির্মাণ করা হয় এই হাসপাতাল। প্রথমে হাসপাতালটি সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদারকির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসলেও বর্তমানে দ্বৈত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ব্যাহত হচ্ছে সেবা কার্যক্রম। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও সিলেটের সিভিল সার্জনের মাধ্যমে এখন পরিচালিত হচ্ছে হাসপাতালটি।
কমেছে জমি, কমেছে সেবার সুযোগও
৫৮ বছর আগে ২০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ হাসপাতালটির শয্যার সংখ্যা না বাড়লেও কমেছে জায়গার পরিমাণ। সে সময় জায়গার পরিমাণ ১০ একর থাকলেও বর্তমানে মোট জায়গার পরিমাণ নেমে এসেছে এক একর সাত শতকে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ভূমি অধিগ্রহণের কারণে কমেছে জায়গার পরিমাণ। এছাড়া হাসপাতালের চার শতক জায়গা নিয়ে তৈরি হয়েছে সদর উপজেলা খেলার মাঠ। যা এখন শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম। সংক্রামক হাসপাতালের চারপাশে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য স্থাপনা।
কয়েকমাস পূর্বে হাসপাতালটিতে যুক্ত হয়েছ একটি এ্যাম্বুলেন্স। এই এ্যাম্বুলেন্স ছাড়া এখানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদানের তেমন কোনো যন্ত্রপাতিই নেই। এমনকি নেই একটি এক্স-রে মেশিনও। রয়েছে তীব্র জনবল সঙ্কটও।
হাসপাতালের কর্মরতদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ হাসপাতালটিতে মঞ্জুরীকৃত পদের সংখ্যা ৪৫ টি। তবে মঞ্জুরীকৃত পদের ৬৩ শতাংশই শূন্য রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে দুই চিকিৎসকসহ কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৭ জন।
এখানে একজন সিনিয়র কনসালটেন্ট, একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট, দুইজন মেডিকেল অফিসার ও একজন প্যাথলজিস্ট থাকার কথা কেবল মেডিকেল অফিসার পদে দুজন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন।
জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের চিকিৎসকের পদটিতে একজন কর্মরত থাকলেও, তিনি গাইনি বিভাগের চিকিৎসক হওয়ায় তিনি বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন।। হাসপাতালটিতে তিনটি মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ থাকলেও তিনটিই খালি রয়েছে। খালি রয়েছে স্টুয়ার্ডের পদ। হাসপাতালে ৫টি সিনিয়র স্টাফ নার্স পদে ৫ জনই কর্মরত থাকলেও সহকারি স্টাফ নার্সের ৪ টি পদের তিনটিই খালি।
সঙ্কট রয়েছে প্রশাসনিক পদেও। হাসপাতালটির প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মঞ্জুরীকৃত ৭ টি পদের বিপরীতে ৬টিই শূন্য রয়েছে।। একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ও ৬ জন অফিস সয়াহক (এমএলএসএস) থাকার কথা থাকলেও শুধু একজন অফিস সয়াহক দিয়ে চালানো হচ্ছে গোটা হাসপাতালের প্রশাসনিক কার্যক্রম। সঙ্কট আছে কর্মচারী পদেও।
কী বলছেন সংশ্লিস্টরা
হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে এখানে ডাইরিয়া, ধনুষ্টংকার, জলবসন্ত, জলাতঙ্ক, টিটেনাস, হাম, মামস-জাতীয় রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। করোনা রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের জন্য এখানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নেই বলে জানান তারা।
সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. এহসানুন জামান খান সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, হাসপাতালটি প্রধান সমস্যা হচ্ছে জনবল ঘাটতি। একটি কনসাল্টেন্টের পদ থাকলেও সেটি খালি রয়েছে। এছাড়া নেই রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার সুযোগ সুবিধা। এদিকে হাসপাতালটিতে চারটি অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকলেও নেই সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা।
তিনি বলেন, হাসপাতালটিতে আইসিইউ বা ভেন্টিলেশন প্রতিষ্ঠাপন জরুরী হলেও এ ব্যাপারে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষের সাথে কথা হয়েছে এবং তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইউনুছর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালটির উপ পরিচালক হিমাংশু লাল রায় বলেন, এখানে দ্বৈত প্রশাসন থাকার কারণে জনবল থেকে শুরু করে কোন ব্যাপারে তেমন ভাবে পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তারপরেও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে সম্প্রতি একটি এ্যাম্বুলেন্স ও চালক নিয়োগ দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, আমি সিভিল সার্জন থাকাকালীন সময়ে এ ব্যাপারটা নিয়ে ঊর্ধ্বতন মহলে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছি এবং দুই-তিনবার চিঠি দিয়েছি। বর্তমানে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে এ হাসপাতালের প্রয়োজনীয় উন্নয়নে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে খুব দ্রুতই এটি একক প্রশাসনের আওতায় চলে আসবে। তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণও সম্ভব হবে।
এছাড়া তিনি আরও বলেন, কোভিড চিকিৎসার জন্য সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের পরেই আমরা সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালকে ঠিক করে রেখেছি। তবে এখানে শুধু রোগীদের আইসোলেশনে রাখা হবে। যেহেতু বর্তমানে সেখানে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা নেই তাই বেশি ইমার্জেন্সি রোগীদের স্পেশালাইজড হাসপাতালেই চিকিৎসা দিতে হবে।
সিলেটে কোথায় মিলছে করোনার চিকিৎসা
সরকারি উদ্যোগে সিলেট বিভাগের মধ্যে এখন একমাত্র শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালেই করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ১০০ টি। কিন্তু রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় আক্রান্ত অনেকেই এখানে ভর্তি হতে পারছেন না। ফলে বিপাকে পড়তে হচ্ছে তাদের।
এ ব্যাপারে উন্নয়নকর্মী হাসান মোরশেদ বলেন, ঢাকা এবং চট্টগ্রামে সরকারি উদ্যােগে কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সিলেটে এমন কোনো উদ্যোগ নেই। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলো বেশিরভাগের করোনা রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের সক্ষমতা নেই। আবার যেগুলোতে সেবা দেওয়া হচ্ছে সেগুলোর ব্যয়ও সাধারণের নাগালের বাইরে। ফলে মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আপনার মন্তব্য