নিজস্ব প্রতিবেদক ও বড়লেখা প্রতিনিধি

২৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:৫৮

‘হুনরাম মেশিনে ভোট অইবো, কিভাবে অইবো ফরমুলা জানি না’

বড়লেখা পৌর নির্বাচন

শীতের সকাল। চা স্টলের বেঞ্চে বসে আছেন কয়েকজন দিনমজুর। কাজের আশায় তাদের অপেক্ষা। তাদের পাশে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পৌরসভা নির্বাচনের ভোট নিয়ে আলোচনা করছিলেন আরও তিন-চারজন দিনমজুর। সেই আলোচনা কিছু সময়ের মধ্যে তর্ক-বিতর্কে গড়ায়।

কে জিতবে? আওয়ামী লীগ, বিএনপি? না-কি স্বতন্ত্র? এটা নিয়েই তাদের মধ্যে চলা আলোচনা গড়ায় তর্ক-বিতর্কে। মিনিট দশেক চলে এই বিতর্ক। চা দোকানীর মধ্যস্থতায় বন্ধ হয় বিতর্ক।

শুক্রবার (২৫ ডিসেম্বর) সকালে মৌলভীবাজারের বড়লেখা পৌরসভার বাস স্ট্যান্ড এলাকায় রাস্তার ধারের একটি চা স্টলে চায়ে চুমুক দিতে দিতে তাদের এই আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক শোনা গেল।

সেখানেই কথা হয় দিনমজুর কুদ্দুছ মিয়ার সাথে। তিনি তার পাশে বসা রহিম মিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘ভাই কইন, আমরা দিনমজুর মানুষ। রুজি করলে খাইতাম। রুজি না করলে পেটে ভাত জুটত নায়। বেটায় ভোট নিয়া চিন্তা করে। ভোট নিয়া আমরা গরীবের চিন্তা করি লাভ নাই। চেয়ারা যে বইতা তাইনউ রাজা। তবে ভোট দিমু একজনরে। দেওয়া তো লাগব একটা। এর লাগি যে উন্নয়ন করতা পারবা, তানোরে বুঝিয়া দিমু। ভোটতো পানিত পাইলাইয়া লাভ নাই।’

কুদ্দুস মিয়ার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রহিম মিয়া বলেন, ‘তুমারে অত সময় কিতা কইছলাম তে? অতাউ মাতিছলাম। যে উন্নয়ন করবা তানোরেউ দিলাইমু। কেউ তো আর ঘরে নিয়া ভাত খাওয়াই তা নায়।’ রহিম জানান, ‘ভোট দিমু ভালা মানুষ দেখিয়া। যে কোনো জাগায় ভোট দিয়া লাভ নাই। তবে হুনরাম মেশিনে ভোট অইবো। ইটাত কিভাবে ভোট অইবো। বুঝিয়ার না। ফরমুলা কিলা জানি না।’

তাদের সাথে কথা বলতে বলতেই একটি বাস ছেড়ে গেছে গন্তব্যের দিকে। আরেকটি বাস এসে পৌঁছেছে। চা দোকানী চা তৈরিতে ব্যস্ত। ততক্ষণে কুয়াশা ভেদ করে সূর্য উঁকি মেরেছে। বাজারে মানুষ বাড়তে শুরু করেছেন। দোকানে আড্ডা চলছে। কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে জটলা করছেন। একটা হইচই করা শান্ত পরিবেশ। বাজার থেকে মোটরসাইকেল যোগে বের হয়ে পৌরসভার গ্রামের দিকে এগোই।

বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সব গ্রামেই পৌর নির্বাচনের প্রার্থীদের সাদাকালো পোষ্টার গাছে, রাস্তার পাশে ঝুলছে। একটা ভিন্ন আমেজ তৈরি করেছে। কিন্তু লোকজনের কেউ সবেমাত্র কেটে তোলা আমন ধান খলায় (ধান শুকানোর মাঠ) শুকাচ্ছেন। কেউ খড় শুকাচ্ছেন। কেউ গোবাদিপশুর সেবাযত্ন, কেউ সবজিখেতে পরিচর্যা করছেন। তবে এর ভেতরই নির্বাচনের হাওয়াটাও টের পাচ্ছেন। অনেকেই শুনেছেন, নতুন পদ্ধতিতে মেশিনে ভোট হবে। এ নিয়ে সকলেরই দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। কৌতূহল আছে। আগ্রহও আছে। প্রার্থী পছন্দের ক্ষেত্রে অনেকেই বলেন, সবাই যাকে দিবে। তারাও তাকে দিবেন। তবে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ আছে অনেকের। দলও আছে অনেকের।

মুড়িরগুল গ্রামের (মুড়িরগুল) সুলতান আহমদও বলেন, ‘নতুন পদ্ধতির ভোট অইবো (হবে) জানি। কিভাবে অইবো ফরমুলা জানি না।’

মুছেগুল গ্রামের লাল মিয়া বলেন, ‘মানুষের মধ্যে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে ইভিএম নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। কেউ মনে করছেন এ পদ্ধতিতে সুষ্ঠু হবে। কেউ মনে করছেন কারচুপি হতে পারে। তবে ভোটের পরিবেশ এখনও ভালো।’

পেশায় রাজমিস্ত্রি হিনাইনগরের তরুণ জাকারিয়া আহমদ বলেন, ‘ভোট আইলে খোঁজ পড়ে। আইলা চাইলা (বাড়িতে আসলেন ভোট চাইলেন)। ভোট গেলে শেষ। আপনিও নাই আমিও নাই। এখন মেয়রে পাইলে বুকুত জড়াইয়া (বুকে জড়িয়ে) ধরবা। তবে ভোটারদেরও দোষ আছে। ৫০০ টাকা খাইয়া (খেয়ে) ভোট দিলে পাচ বছরের জন্য মাথা নিচুতো থাকবই।’

নতুন ভোটার মাদ্রাসা ছাত্র হিনাইনগরের রায়হান হোসেনের প্রবল আবেগ ভোট নিয়ে। বলেন, ‘খুব আগ্রহ হচ্ছে। আজকে ভোট হলে আজকেই দিতাম।’

এলাকাটি পৌরসভার হলেও হিনাইনগর, দক্ষিণ মুছেগুলসহ কিছু স্থানে এখনও বেশকিছু কাঁচা রাস্তা দেখে গেছে।

এতক্ষণ পায়ে হেঁটে পাড়ায়, বাড়িতে প্রচারণা চলছিল। দুপুর দুটা বাজতেই মাইকে প্রার্থী ও প্রতীকের গুনগানে বাতাস ঝনঝন করে বাজতে থাকে।

প্রথম ধাপে আগামী ২৮ ডিসেম্বর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে বড়লেখা পৌরসভায় নির্বাচন হবে। বড়লেখা পৌরসভায় মেয়র পদে ৩ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২৬ জন ও নারী কাউন্সিলর পদে ১১ জন প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। মোট ভোটার সংখ্যা ১৫ হাজার ৪৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭ হাজার ৫২৩ জন ও নারী ভোটার হচ্ছেন ৭ হাজার ৯২০ জন। পৌরসভার ১০টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হবে। ভোট কক্ষের (বুথের) সংখ্যা ৪৩টি।

স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাইদুল ইসলাম এখন পর্যন্ত পরিবেশ ভালো জানিয়ে বলেন, ‘আগে নির্বাচিত হই। মিথ্যা কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না।’

বিএনপির মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনী কার্যক্রম চালাচ্ছি। তবে ইভিএম সম্পর্কে ধারণা নেই। বলা হয়েছে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’ নির্বাচিত হলে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, গরিব মানুষের ওপর কর কম ফেলা, নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির পরিকল্পনা আছে তাঁর।

এদিকে বড়লেখা পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বর্তমান মেয়র আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করছেন। বৃহস্পতিবার (২৪ ডিসেম্বর) পৌরসভা মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ৩৬ দফার ইশতেহার ঘোষণা করেন।

বর্তমান মেয়র ও আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী গতকাল সোমবার বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার সময় রাস্তা ভঙ্গুর ছিল। ৭০ ভাগ রাস্তার উন্নয়ন হয়েছে। বাকি ২০ ভাগের টেন্ডার হয়েছে। শহরের ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন হয়েছে। শহরের বন্যা সমস্যা সমাধানে ষাটমা ও নিকড়িছড়া খনন হয়েছে। স্ট্রিট লাইট স্থাপন হয়েছে।’

তিনি জানান, বিশুদ্ধ পানির জন্য ৭০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ১০ কোটি টাকার কাজ চলছে। ঘরে ঘরে পানি পৌঁছে দেওয়া একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। এছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পৌরসভার নিজস্ব ভবন নির্মাণ, বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা হিসেবে সকল রাস্তা আরসিসি ঢালাই করা। ষাটমা ও নিকড়িছড়ার উজানে আরও খনন করা। নির্বাচিত হলে এ কাজ সম্পন্ন করা হবে।

নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বড়লেখা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সাদিকুর রহমান শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায় বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ নেই।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত