০৩ অক্টোবর, ২০২২ ১১:০১
একসময় দেশিয় মাছের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিতি ছিল হবিগঞ্জ। এখানকার হাওর-বিল-নদী থেকে সংগৃহীত দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হতো বিদেশে। এ জন্য বেসরকারিভাবে একটি ফিস ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠেছিল। গেল এক দশকে জেলায় সার্বিক মাছের উৎপাদন বাড়লেও দেশিয় মাছের উৎপাদন কমেছে সাড়ে ৭ হাজার মেট্রিকটন।
মৎস্যখাতে জড়িতরা বলছেন, হাওরের মাঝ দিয়ে সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্নভাবে হাওর নষ্ট হওয়া, অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার, জলাশয় সেচে মাছ ধরা এবং ফসলি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় দেশি মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। যার ফলে বিলুপ্ত হচ্ছে দেশি প্রজাতির মাছ। দেশিয় মাছের উৎপাদন কমায় হাওরের জেলেদের আয়ও কমেছে। নিরুপায় হয়ে অনেক জেলে পাড়ি জমিয়েছেন শহরে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় প্রাকৃতিক জলাশয়ের পরিমাণ ৮১ হাজার ৬৭১ হেক্টর। এক দশক আগে (২০১২ সালে) জেলায় দেশিয় মাছের উৎপাদন ছিল ৩৩ হাজার ৬৯৩ মেট্রিকটন। যা বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ১৬৭ মেট্রিকটনে। অর্থাৎ গেল এক দশকে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের উৎপাদন কমেছে ৭ হাজার ৫২৬ মেট্রিকটন।
তবে জেলায় বেড়েছে চাষ করা মাছের পরিমাণ। ২০১২ সালে ২৪ হাজার ২৬৪টি পুকুরের ৪ হাজার ১৯১ হেক্টর এলাকায় মাছ চাষ হতো ১৬ হাজার ১৪৫ মেট্রিকটন। বর্তমানে পুকুরের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৩১টিতে। যার ৫৮ হাজার ৯০ হেক্টর এলাকায় মাছের উৎপাদ হচ্ছে ২১ হাজার ৮৫৩ মেট্রিকটন। অর্থাৎ এক দশকে চাষ করা মাছের উৎপাদন বেড়েছে ৫ হাজার ৭০৮ মেট্রিকটন।
বর্তমানে জেলায় রেজিস্ট্রিভুক্ত জেলের সংখ্যা ৪১ হাজার ২৯৪ জন। জেলায় মাছের চাহিদা ৪৫ হাজার ৯২ দশমিক ১২ মেট্রিকটন। সার্বিক উৎপাদন হচ্ছে ৪৯ হাজার ৩৭৬ দশমিক ৪৬ মেট্রিকটন।
ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবীরা জানান, জেলার হাওর অঞ্চল আজমিরিগঞ্জ, বানিয়াচং ও নবীগঞ্জের হাওরে পাওয়া যেত বোয়াল, চিংড়ি, রুই, কাতলা, শিং, মাগুর, কৈ, ট্যাংরা, পুঁটি, বইচা, শোল, বাইমসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। এখন আর আগের মতো এসব মাছ পাওয়া যায় না। এছাড়া পাবদা, ঘাঘট, চাপিলা, ট্যাংরা, চিতল, কালবাউশ, খালিশা, গুতুমসহ বেশ কিছু প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
বানিয়াচংয়ের মৎস্যজীবী হারুন মিয়া বলেন, ৮/১০ বছর আগে হাওরে জাল ফেললেই মাছ ভরে যেতো। কিন্তু এখন সারাদিন জাল বেয়েও ২ হাজার টাকার মাছ মারা যায় না।
হাওরের বিক্রি করে সংসার চালাতেন রাকিল হোসেন। তিনি বলেন, এখন আর আগের মতো জালে মাছ আসে না। তবে মাছ না আসার কয়েকটি কারণও দেখিয়েছেন তিনি। রাকিল বলেন, এখন আর আগের মতো পানি হয় না। যখন পানি শুকায় তখন কিছু জেলে হাওর সেচে মাটির নিচ থেকেও মাছ ধরে নিয়ে আসে। কারেন্ট জাল ও বেড়জাল দিয়ে মাছ শিকার করেন। যে কারণে পোনামাছগুলোও জালে আটকা পড়ে। আর এতেই মাছ আর হাওরে থাকে না। যে কারণে অধিকাংশ মাছের প্রায় বিলুপ্তি পথে।
মৎস্য ব্যবসায়ী খোকন মিয়া বলেন, আগের মতো এখন দেশিয় মাছ পাওয়া যায় না। যে কারণে মাছের দামও এখন বেশি। যদি সরকার উদ্যোগ নিয়ে দেশিয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারে তাহলে মাছের দামও কমবে পাশাপাশি দেশিয় মাছের পুষ্টিও পাবে মানুষ।
হাওরে অপরিকল্পিত উন্নয়ন হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবেশকর্মীরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন হবিগঞ্জ’র (বাপা) সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, হাওর আমাদের ঐতিহ্য। হাওর রক্ষায় আমাদের বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা করতে হবে। এখন হাওরে বাঁধ দিয়ে সড়ক নির্মাণ হচ্ছে। এতে হাওরে আন্দোলিত করে পানি আসতে পারছে না। মাছ তার প্রসারিত জায়গাও পাচ্ছে না। যে কারণে দেশিয় মাছের উৎপাদন দিন দিন কমছে।
জেলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, হাওরে দেশিয় মাছের পরিমাণ বাড়াতে বর্ষা মৌসুমে নিয়মিত পোনামাছ অবমুক্ত করা হচ্ছে। সেই সাথে অবৈধ কারেন্ট জাল ও বেড়জাল বন্ধে চালানো হয় অভিযান।
উপকুলের ন্যায় মাছের প্রজনন মৌসুমে হাওরের জেলেদের প্রণোদনা দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ রাখার পরিকল্পনার কথাও জানান এই কর্মকর্তা।
আপনার মন্তব্য