ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ

০৭ অক্টোবর, ২০২২ ১৮:০২

শান্তিগঞ্জের ঘরে ঘরে চোখওঠা রোগ, ফার্মেসিতে ঔষধ সংকট

পঞ্চাশোর্ধ ভ্যান চালক আসকর আলী। সন্তান-সন্ততি নিয়ে পাঁচ জনের সংসার। শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা বাজারে ভ্যান চালান তিনি, ভাড়ায় কোথাও না গেলে প্রতিনিয়ত থাকেন পাগলা বাজারের ব্রিজ কিংবা ব্রিজের পূর্বপাড়ে দুদু মিয়া এলাহী সুপার মার্কেটের সামনে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে পাগলা বাজারের একটি ঔষধের দোকান থেকে মন খারাপ করে বের হচ্ছিলেন তিনি। তাৎক্ষণিক এ প্রতিবেদকের কথা হয় তাঁর সাথে। জানতে চাওয়া হয় আক্ষেপের কারণ। তিনি জানান, পরিবারের পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিনি বাদে বাকী সকলেই চোখওঠা (কনজাংটিভাইটিস) রোগে আক্রান্ত হয়ে চোখের ব্যথায় রীতিমতো কাতরাচ্ছেন। ডাক্তারের সাথে কথা বলে চোখের ড্রপ নিতে এসেছেন। ১শ ৪০ টাকা দাম। সারাদিন কোনো ট্রিপ না পেলেও কষ্ট করে এই টাকার ব্যবস্থা করেছেন। দোকানে ঔষধ নিতে এসে দেখেন ড্রপের সংকট। কোনো ফার্মেসিতেই চোখের ড্রপ নাই। বাড়িতে গিয়ে সকলের কাতরানো দেখতে ভালো লাগবে না বৃদ্ধ আশকর আলীর। তাই তাঁর মন খাপার।

চোখওঠা রোগ এখন শুধু গ্রামাঞ্চল নয় সারা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। ডাক্তারি ভাষায় রোগটির নাম কনজাংটিভাইটিস। এটি মূলত একটি ব্যাকটেরিয়া জনিত ছোঁয়াচে রোগ। ইদানিং শান্তিগঞ্জ উপজেলায় রোগটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলার এমন কোনো গ্রাম, পাড়া বা মহল্লা বাকী নেই যেখানে রোগটির ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়নি। কোনো কোনো ঘরে পরিবারের সকল সদস্যরাই এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, এখনো হচ্ছেন একের পর এক। হাট-বাজারে হাঁটলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি চোখ রাখলে রোগটির ভয়াবহতা লক্ষ করা যায়। উপজেলায় কনজাংটিভাইটিস রোগে আক্রান্ত অধিকাংশ ব্যক্তিরা চোখে কালো চশমা পরতে দেখা যায়।

তবে ডাক্তাররা বলছেন, এ রোগ নিয়ে এতো আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি একটি ব্যাকটেরিয়াল এবং মৌসুমি রোগ। ১৫ থেকে ২০দিন, অথবা ২৫দিন স্থায়ী হবে রোগটি। একজন রোগীর কাছে রোগটি ৫ থেকে ৭দিন স্থায়ী থাকে। ইতোমধ্যে সারা দেশেই ব্যাপকহারে ছড়িয়েছে এ রোগের ব্যাকটেরিয়া। যদিও রোগটি ছোঁয়াচে তবে বাতাসে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে গেলে রোগটি ছড়ায়। যেহেতু চোখ মানব দেহের একটি অতি সংবেদনশীল জায়গা তাই এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের অবস্থা বেশি খারাপ হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ঔষধ খেতে হবে, আইড্রপ ব্যবহার করতে হবে।

এ ব্যাপারে শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. মো. জসিম উদ্দিন শরীফি বলেন, চারদিকে কনজাংটিভাইটিস (চোখওঠা) রোগের ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। আতঙ্কের কিছু নেই। ২০/২৫ দিনের মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব শেষও হয়ে যাবে। সারা দেশেই এই সমস্যা। এরকম রোগ হলে প্রথমত, মানুষের কাছ থেকে আলাদা থাকতে হবে। কালো চশমা ব্যবহার করতে হবে। সামান্য উষ্ণ কিছু একটা দিয়ে চোখের পাতার উপরের অংশে আলতো করে ভাপ নিতে হবে। ৯০ শতাংশ মানুষের রোগ ৫/৭দিনের মধ্যে এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। চোখওঠা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির চোখে চোখ রাখলে রোগ ছড়ায় না। সরাসরি সংস্পর্শে গেলে এ রোগ ছড়ায়। সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

এদিকে, উপজেলার বিভিন্ন ফার্মেসিতে আইড্রপের চরম সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলার বিভিন্ন বাজারের একাধিক ফার্মেসির ঔষধ বিক্রেতা ও ঔষধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। তারা জানান, ফার্মেসিতে যতজন গ্রাহক ঔষধের জন্য আসছেন তার মধ্যে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ গ্রাহকেরাই আসছেন চোখের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি। তাদের চাহিদা আইড্রপ। মক্সিব্যাক, আইভেনটি, ক্লোরাম, অপসোফেনিকল ও এ ফ্যানিকলসহ সব ধরণের আইড্রপের সংকট রয়েছে উপজেলাব্যাপী। তবে, কিছু কিছু ফার্মেসিতে মক্সিব্যাক ও আইভেনটি আইড্রপ মিললেও বাকীগুলোতে নেই বললেই চলে। গত এক সপ্তাহ ধরে উপজেলায় আইড্রপের এমন সংকট চলছে বলে জানিয়েছেন তারা।

পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. হুমায়ুন কবির জানান, আমার এখানে গড়ে প্রতিদিন ৫০/৬০ জন রোগী আসেন চিকিৎসা নিতে। এই দুই সপ্তাহে যেসব রোগীরা আসছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী কনজাংটিভাইটিস বা চোখওঠা রোগে আক্রান্ত। তাদের প্রতিনিয়ত সেবা দিচ্ছি। পরামর্শ দিচ্ছি। আমাদের সাধ্য অনুযায়ী আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি।

মেডিকন ফার্মাসিউটিক্যালের বিপণন কর্মকর্তা ফয়সল আহমদ বলেন, শান্তিগঞ্জ উপজেলায় একটি ফার্মেসিতে আমার কোম্পানির কিছু আইড্রপের একটি অর্ডার ছিলো। চাহিদা বেশি সাপ্লাই সীমিত হওয়ার কারণে ফার্মেসির লোকজন আমার সাথে রাগারাগি করেছেন। মানুষের মাঝে এখন আইড্রপের খুবই চাহিদা।

পাগলা বাজারের সাগর ফার্মেসির পরিচালক লাভলু দেব, পপুলার ফার্মেসির রাজীব চক্রবর্তী ও শ্যামলী ফার্মেসির পরিচালক রজত দেবনাথ বলেন, চোখওঠা নিয়ে প্রচুর রোগীরা আসছেন। সবার চাহিদা আইড্রপ আর চোখে ব্যবহার করার মতো ক্রিম৷ এটা তাদের দরকারও। কিন্তু আমরা দিতে পারছি না। প্রচুর ড্রপ আর ক্রিম অর্ডার দিচ্ছি কিন্তু কোম্পানি আমাদের চাহিদার তুলনায় সাপ্লাই দিচ্ছে কম। তাই বাজারে ঔষধের সংকট তৈরি হয়েছে। আমাদের জানা মতে, প্রায় সবখানেই আমাদের মতো অবস্থা।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত