নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:৫৯

২০ বছর আগে কী ঘটেছিলো টেংরাটিলায়, কেন মিলবে ৫১৬ কোটি টাকা?

২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাতটি ছিলো দোয়রাবাজারের টেংরাটিলা এলাকাবাসীর কাছে বিভীষিকাময়। রাত ১০ টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। এরপরই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুনময় হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে পুরো ছাতক ও দেয়ারাবাজার উপজেলাজুড়ে। পরে জানা যায় ‘ছাতক টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডে’ বিস্ফোরণ ঘটেছে। প্রথম দফা গ্যাস নিয়ন্ত্রনের আগেই ২য় দফা আবার বিস্ফোরণ ঘটে ওই বছরের ২৪ জুন রাত ২টায়।

দু’দফা বিস্ফোরণের ফলে গ্যাসফিল্ডের প্রোডাকশন কুপের রিগ ভেঙে বিকট আওয়াজে ভয়াবহ কম্পনসহ আগুনের লেলিহান শিখায় কমপক্ষে ৫২ বিসিক গ্যাসের রিজার্ভ ধ্বংস হয়। ২০০-৩০০ ফুট ওপরে আগুন ওঠানামা করে। এক মাসেরও বেশি সময় জ্বলার পর আগুন নিভে যায়।

এতে হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্টের পাশাপাশি আশপাশের টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশপুর, কৈয়াজুরি ও শান্তিপুর গ্রামের মানুষের বাড়ি-ঘর ক্ষতিগ্রস্ত ও পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছিল। এই গ্যাসফিল্ডর দায়িত্বে ছিলো কানাডিয়ান জ্বালানী প্রতিষ্ঠান ‘নাইকো’। তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকা অবস্থায়ই বিস্ফোরণ ঘটে টেংরাটিলায়।

এরপর থেকে ২০ বছর ধরেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে টেংরাটিলার গ্যাস ফিল্ড। আর ২০ বছর ধরেই জ্বলছে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড ও এর আশপাশ এলাকা। প্রতিনিয়ত গ্যাস উদগীরণ হচ্ছে এ এলাকায়।

টেংরাটিলা গ্রামের পুকুর, জমি, বিভিন্ন সড়ক এমনকি বসতঘরের ফাটল দিয়ে বুদ বুদ করে গ্যাস বেরোনোর ফলে আতংকে থাকতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের।

গ্যাস ফিল্ডে বিস্ফোরনের পর টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক দূষণ, শ্বাসকষ্ট, শ্রবণশক্তি হ্রাস, চোখে কম দেখা, চর্মরোগসহ নানা সমস্যায় আক্রান্ত হন এলাকাবাসী।

প্রায় ৫৮ একর আয়তনের গ্যাস ফিল্ডে দু’দফা বিস্ফোরণে টেংরাটিলা এলাকা অনেকটাই বদলে গেছে। টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, খৈয়াজুরি ও শান্তিপুরের মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বুদবুদ গ্যাস উদগীরণ হয় বছরের পর বছর। গাছ-পালা মরে গিয়ে বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয় ওই এলাকা। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে এলাকার পরিবেশও।

১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপুরণ চেয়ে মিলছে ৪২ মিলিয়ন

বিস্ফোরণের পর সরকারি তদন্তে নাইকোর খনন প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি পাওয়া যায়। এর প্রেক্ষিতে লোকসানের ক্ষতিপূরণ চেয়ে নাইকোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশি আদালতে মামলা করে পেট্রোবাংলা।

বিস্ফোরণের ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের ধ্বংস, পরিবেশগত ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক লোকসানের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ বাপেক্সের জন্য ১১৮ মিলিয়ন ডলার এবং সরকারের জন্য অতিরিক্ত ৮৯৬ মিলিয়ন ডলার মিলিয়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল।

মামলার রায় বাংলাদেশের পক্ষে আসে। তবে নাইকো আবার আপিল করে। সম্প্রতি আপিলেও হেরে রায় নাইকো। আপিলের কানাডীয় জ্বালানি কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেসকে ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক আদালত।

'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অফ ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস' (ইকসিড)-এর এই রায় কয়েক দিন আগে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে সরকারের কাছে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান।

যদিও বাংলাদেশ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল, তবে ট্রাইব্যুনাল এর চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম অর্থ দেওয়ার আদেশ দিয়েছে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এখনো রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাননি, তবে রায়ের একটি সারসংক্ষেপ পেয়েছেন। গত মঙ্গলবার বাপেক্সের এক বোর্ড সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, ‌‌'এটি একটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিষয়। আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পেলে সেটি আইনি মতামতের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠাব এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।'

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে কানাডা-ভিত্তিক নাইকো রিসোর্সেসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান নাইকো রিসোর্সেস (বাংলাদেশ) লিমিটেড ফেনী ও ছাতক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)-এর সাথে একটি যৌথ অংশীদারিত্ব চুক্তি সই করে। একটি পৃথক চুক্তির আওতায় ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত গ্যাস ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পেট্রোবাংলা।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত