৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ০০:১৭
সাদিয়া নৌশিন তাসনিম চৌধুরী (বাঁয়ে) ও তাহসিনা রুশদীর লুনা। ছবি: সংগৃহীত
সিলেট বিভাগের ১৯ টি আসনের মধ্যে মাত্র দুজন নারী প্রার্থী হয়েছেন। তাদের একজন সিলেট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা ও অপরজন মৌলভীবাজার-২ আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) মনোনীত প্রার্থী সাদিয়া নৌশিন তাসনিম চৌধুরী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগে দলের প্রার্থিতার দৌড়ে ছিলেন আট নারী। তবে শেষ পর্যন্ত এই দুজনই দলের মনোনয়ন পান। বিভাগের ১৯ আসনে মোট প্রার্থী ১০৪ জন। লুনা আর সাদিয়া ছাড়া বাকী ১০২ জনই পুরুষ।
সিলেটে ভোটযুদ্ধের মাঠে থাকা সিলেট-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা বিএনপির নিখোঁজ কেন্দ্রীয় নেতা এম. ইলিয়াস আলীর স্ত্রী। তাঁর প্রার্থিতা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। বিভাগ বিভিন্ন আসন থেকে আরও ছয় জন নারী বিএনপির মনোনয়ন চাইলেও তারা পাননি।
আর মৌলভীবাজার-২ আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) দল থেকে প্রার্থী সাদিয়া নৌশিন তাসনিম চৌধুরী। তিনি কাঁচি প্রতীক নিয়ে ভোটে লড়ছেন।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই সিলেটে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করে। মাঠে নেমে পড়েন সিলেটের ১৯ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। সে তালিকায় ছিলেন অন্তত আট নারী, যাঁরা সরাসরি দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন।
লুনা ছাড়া বাকি সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন সিলেট-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা মরহুম দিলদার হোসেন সেলিমের স্ত্রী ও জেলা মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. জেবুন্নাহার সেলিম, সিলেট-৫ আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব মরহুম আবুল হারিস চৌধুরীর মেয়ে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ব্যারিস্টার সামিরা তানজিম চৌধুরী এবং মহিলা দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক লুৎফা খানম চৌধুরী স্বপ্না, সিলেট-৬ আসনে জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠ যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি মরহুম কমর উদ্দিনের মেয়ে ও যুক্তরাজ্যের কাউন্সিলর সাবিনা আক্তার পপি, সাবেক সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন লেছু মিয়ার মেয়ে সামিরা হোসেন, হবিগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শাম্মী আক্তার এবং মৌলভীবাজার-২ আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) নেত্রী সাদিয়া নৌশিন তাসনিম চৌধুরী।
তবে তাঁদের মধ্যে তাহসিনা রুশদীর ও সাদিয়া নৌশিন ছাড়া বাকিরা মনোনয়ন পাননি।
মাঠে কর্তৃত্ব ধরে রেখেছেন তাহসিনা রুশদীর
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল স্বামী এম ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর থেকেই মূলত বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসনে দলের কর্তৃত্ব তাহসিনার হাতে চলে যায়। এরপর দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই দুই উপজেলায় বিএনপির অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনিই দলের প্রার্থী হবেন এটি অনুমেয় ছিল। যদিও যুক্তরাজ্য বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবীর (বর্তমানে দলের যুগ্ম মহাসচিব)-এর নাম প্রার্থী হিসেবে মাঝখানে শোনা যাচ্ছিল। তবে শেষপর্যন্ত দল তাহসিনাকেই মনোনয়ন দেয়। এরপর থেকেই নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন তিনি। প্রতীক পাওয়ার পর থেকে পুরো দমে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন লুনা।
সাদিয়া নৌশিন তাসনিমে মুগ্ধ ভোটাররা
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত প্রার্থী হয়েছেন বাসদ (মার্কসবাদী) নেত্রী সাদিয়া নৌশিন তাসনিম চৌধুরী। কাঁচি প্রতীকে লড়ছেন মৌলভীবাজার-২ আসনে। তরুণ এই নেত্রী তাঁর নির্বাচনী এলাকায় সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। দলের বাইরের অনেকে তাঁকে সমর্থন দিচ্ছেন। প্রবাসী বাংলাদেশি প্রখ্যাত জিন বিজ্ঞানী ও ধান গবেষক ড. আবেদ চৌধুরী তাঁদের একজন। নিজের এলাকায় প্রথম নারী নৌশিনকে সমর্থন জানাতে নিজের উদ্যোগে ছুটে এসেছেন।
গত ১৪ জানুয়ারি কুলাউড়া উপজেলার লস্করপুরে বাসদের কর্মী সভায় এসে নৌশিনকে সমর্থন জানিয়ে এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘এটা একেবারে অসম্ভব একটা জিনিসের মতো। এই এলাকায় আমি বড় হয়েছি। ৪৫ বছর বিদেশে থাকি। তার পরও এ দেশকে পর্যবেক্ষণ করি। কিন্তু রাজনীতিতে এরকম মানুষ তো আমি দেখিনি। সে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।’
ভোটের মাঠে নারী প্রার্থীদের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের হার কম হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করে ড. আবেদ বলেন, ‘অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’-১০০ বছর আগে নজরুল লিখেছেন। অথচ এখনো আমরা তামাশা করছি। নির্বাচনে পুরো প্রার্থীদের মধ্যে মেয়েরা মাত্র তিন শতাংশ। এর চেয়ে অপমানজনক আর কিছু হতে পারে না।’
এটি রাষ্ট্রকে কালিমালিপ্ত করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এটা অন্তবর্তীকালীন সরকার এবং পুরো শাসকগোষ্ঠীতে যাঁরা আছেন, তাঁদের কালিমালিপ্ত করছে। সেই তিন শতাংশের মধ্যে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হলো নৌশিন।’
নারী সংসদসদস্য প্রার্থী সাদিয়া নৌশিন তাসনিম চৌধুরীও হতাশা নিয়ে বলেন, ‘ঐক্যমত্যের কমিশনের আলোচনায়ও সর্বনিম্ন পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা। অথচ ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থীই দেয়নি। যাঁরা দিয়েছেন তার মধ্যে আমাদের দল ৩৩ প্রার্থীর মধ্যে ১০ জনই নারী প্রার্থী। বিএনপির মতো দলে মাত্র ১০ জন নারী প্রার্থী। এতে জুলাই সনদের যে বাস্তবায়ন, এ ক্ষেত্রে শুরুতেই তা খারিজ হয়ে গেল। তাহলে সনদ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে।’
সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক রেহানা আফরোজ খান বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের যে আকাঙ্খা তার অন্যতম নারীর ক্ষমতায়ন। এই আন্দোলনে নারীরা সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঢাল হিসেবে সামনে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু নতুন বাংলাদেশে আমরা নারীর প্রতি সেই ইনসাফ দেখতে পাচ্ছি না। যার একটি বড় উদাহরণ হতে পারে এবারের নির্বাচনে পুরো বিভাগ থেকে মাত্র দুইজন নারী প্রার্থী দেওয়া।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের সভাপতি ও বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি সিলেটের বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ শিরিন আক্তার বলেন, ‘নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা ছিল, বেশিরভাগ দল দেয়নি। পাঁচ শতাংশের কথা বলা হলেও বাস্তবায়িত হয়নি। জামায়াতে ইসলামী তো একজনও দেয়নি। এটি নারীদের প্রতি বৈষম্য, তাঁরা কথা রাখেননি।’
হতাশা ব্যক্ত করে শিরিন আক্তার বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে তাঁরা বলেছেন, পর্যায়ক্রমে নারী আসন বাড়ানো হবে। কিন্তু তার প্রতিফলন কই? তবু আমরা অপেক্ষায় আছি। আমরা বঞ্চিত হয়েছি; ক্ষুব্ধ, ব্যথিত, হতাশ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি। বিশেষ করে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রতি। তারা পারেননি। ঐক্যমত্যের কমিশনেও কোনো নারী প্রতিনিধি নেই। এগুলো হতাশার।’
যাঁরা নির্বাচনী বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবেন তাঁরা কী করেন দেখার বিষয় উল্লেখ করে শিরিন আক্তার বলেন, ‘নির্বাচনে যারা বিজয়ী হবেন বা যেসব দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে, অথবা জাতীয় সনদ যারা বাস্তবায়ন করেন, তারা যদি এ বিষয়টি বাস্তবায়ন করেন। না হলে অধিকার আদায় আমরা প্রতিবাদ, আন্দোলন চালিয়ে যাবো।’
আপনার মন্তব্য