০৪ ফেব্রুয়ারি , ২০২৬ ১৯:৩৫
এক সময় নির্বাচন মানেই রঙিন পোস্টারে ঢেকে যেত দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি আর গাছ। রাতভর মাইকিং, রোডশো আর ব্যানার টাঙানো- শব্দে মুখর থাকত পাড়া-মহল্লা। কিন্তু সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন অতীত। বিয়ানীবাজার–গোলাপগঞ্জে এবারের নির্বাচন যেন নীরব—তবে উত্তেজনাহীন নয়।
সড়ক-মহাসড়ক কিংবা অলিগলিতে চোখ রাখলে পোস্টারের ভিড় নেই। অথচ দুই উপজেলাজুড়ে নির্বাচনী উন্মাদনা ঠিকই ছড়িয়ে আছে—মোবাইলের পর্দায়, ফেসবুকের টাইমলাইনে, মেসেঞ্জারের গ্রুপে। প্রচারের ক্ষেত্র বদলেছে, বদলেছে কৌশলও।
আগের নির্বাচনগুলোতে পোস্টার ছিল প্রধান অস্ত্র। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রতিপক্ষের ব্যানার-পোস্টার ছেঁড়া কিংবা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল নিয়মিত ঘটনা। এবারে সেই অধ্যায়ের ইতি টেনেছে নতুন নির্বাচন বিধান। পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় মাঠের বদলে প্রচারের কেন্দ্র এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
বিয়ানীবাজার–গোলাপগঞ্জে এবারই প্রথম ব্যাপক আকারে ডিজিটাল প্রচারণা চলছে। প্রার্থীর পক্ষে সমর্থকেরা ফেসবুক, টুইটার, মেসেঞ্জার ও ই-মেইলের মাধ্যমে দিনরাত প্রচারে ব্যস্ত। কোথাও জনসভা, কোথাও উঠান বৈঠক বা গণসংযোগ—মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই খবর ছবি ও ভিডিওসহ ভেসে উঠছে স্মার্টফোনের পর্দায়। মুহূর্তেই তা পৌঁছে যাচ্ছে দেশ-বিদেশের হাজারো মানুষের কাছে।
এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও ডিজিটাল প্রচারের ছোঁয়া লেগেছে। জেলা থেকে উপজেলা, আবার কেন্দ্র পর্যন্ত নেতারা এখন অনলাইনের মাধ্যমেই জানতে পারছেন—কে কোথায় কখন প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। তবে এই সুযোগের পাশাপাশি অপব্যবহারের আশঙ্কাও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে ডিজিটাল প্রচার হয়ে উঠেছে প্রধান হাতিয়ার। তথ্যভিত্তিক ও সচেতনতা-নির্ভর এই নতুন ধারার প্রচার ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে—যার চূড়ান্ত পরীক্ষা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন।
তবে ডিজিটাল প্রচারের পথ মসৃণ নয়। গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট সুবিধা সীমিত হওয়ায় অনেক ভোটার এখনো এর বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। প্রচারের মাধ্যম সীমিত হওয়ায় প্রার্থী পরিচিতি গড়ে তোলাও হয়ে উঠছে চ্যালেঞ্জ।
সুজন বিয়ানীবাজার শাখার সভাপতি এডভোকেট মো. আমান উদ্দিন বলেন, ‘২০২৫ সালের সংশোধিত আরপিও ও আচরণবিধি সময়োপযোগী সংস্কার। এখন নির্বাচনি প্রচার শুধু মাঠে নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই প্রধানত পরিচালিত হচ্ছে। পোস্টার নিষিদ্ধ ও সোশ্যাল মিডিয়া নিবন্ধনের বিধান নির্বাচনি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।’ তবে তিনি মনে করেন, এর সফলতা নির্ভর করবে বিধানগুলো কতটা সমানভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।
বিয়ানীবাজার আদর্শ মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান জানান, ডিজিটাল প্রচারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ন্ত্রণ। তিনি বলেন, ‘ফেক আইডি, থার্ড পার্টি প্রচার ও গোপন অর্থায়নের ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। এসব মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।’
পোস্টারনির্ভর উত্তেজনাপূর্ণ রাজনীতি থেকে সরে এসে ডিজিটাল নির্ভর এই নীরব প্রচার—বিয়ানীবাজার–গোলাপগঞ্জে এবারের নির্বাচনকে দিয়েছে ভিন্ন এক রূপ। প্রশ্ন এখন একটাই—এই পরিবর্তন কতটা প্রভাব ফেলবে ভোটের দিনে?
আপনার মন্তব্য