১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৯:০৩
সিলেট নগরের রায়নগরের ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় নতুন আরেকটি তথ্যে দিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, রংমিস্ত্রি বাবুলকে গালি দিয়েছিলেন গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম। তাই বুধবার ওই বাসায় তিনি ছুরি নিয়ে যান। এরপর একে একে তিনজনকে খুন করেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রায়নগরের ওই বাসার পাশ থেকে ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ। এই ছুরিটি বাবুল মিয়া ‘হত্যাকান্ডে ব্যবহার করেন’ বলে জানায় পুলিশ।
ছুরি উদ্ধারের পর সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, গালি দেওয়ায় তাহমিনার উপর ক্ষুব্দ ছিলেন বাবুল।
সিলেট মহানগর পুুুলিশের (এসএমপি) উপ-কমিশনার (ডিসি) সাইফুল ইসলাম জানান, সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির গৃহকর্মী তাহমিনা রংমিস্ত্রি বাবুলকে গালি দিয়েছিলেন। এই গালিতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাবুল প্রথমে তাহমিনাকে ছোরা দিয়ে বুকে আঘাত করেন। পরে সাত্তারের স্ত্রী ও সাত্তারকে ছোরা দিয়ে আঘাত করে পরে গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
যদিও এরআগে বুধবার সন্ধ্যায় বাবুল মিয়াকে আটকের পর সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেছিলেন, বাবুল মিয়া ওই বাসার রংমিস্ত্রির কাজ করত, মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করত। ওই বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসায় গিয়ে গৃহকর্মীকে নিয়ে একটি কক্ষে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরে একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে মেয়েটিকে আঘাত করে।
তিনি বলেন, শব্দ পেয়ে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। তাদের চিৎকার শুনে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে আসেন। তখন তাকেও ছুরি মেরে হত্যা করে বাবুল। পরে সে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়।
বুধবার সকালে নিজ বাসায় খুন হন সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক, ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০) তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৫) ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (২৫)। সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির চার সন্তানই ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় থাকেন।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রায়নগরে মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার পাশের একটি ঝোপ থেকে এই ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। ছোরাটি রক্তমাখা ছিল।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির।
পরে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল মিয়া রায়নগরের একটি খালি জায়গায় ছোরাটি ফেলে দেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে বলেন। বুধবার সন্ধ্যায় সেখানে খোঁজাখুঁজি করেও ছোরাটি পাওয়া যায়নি। পরে বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে ওই এলাকায় আবার তল্লাশি চালানো হয়। একপর্যায়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম সমন্বয় করা এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ছোরাটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠাব। ছোরায় থাকা রক্তের সঙ্গে ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে কার রক্ত সেখানে রয়েছে, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যাবে। হত্যাকাণ্ডের পর ছোরাটি ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণে ধারণা পাওয়া গেছে। বাসার বেসিন ও হাত ধোয়ার স্থানে রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ছোরার ধাতব অংশেও শুকনো রক্তের দাগ রয়েছে। এছাড়া একটি ব্যাগেও রক্তের দাগ পাওয়া গেছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রেমের সম্পর্ক নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া জানিয়েছেন, রং করার কাজ করতে গিয়ে নিহত গৃহকর্মীর সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ হয়। তাদের মধ্যে সম্পর্কটি প্রেমের পর্যায়ে গিয়েছিল কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। গৃহকর্মীর বাদ আচরণে বাবুল মিয়া ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি ছুরি নিয়ে ওই বাসায় গিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন।’
সিলেটে লোডশেডিংয়ের সুযোগে বাসা ও মহল্লা সিসি (ক্লোজ সার্কিট) ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত আবাসিক এলাকায় নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটে।
বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছিল। এই সুযোগে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। লোডশেডিংয়ের সুযোগে হত্যার ঘটনায় প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল দুর্বৃত্তরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ঘটনার পরপরই সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) তিনটি শাখা তদন্তে নামে।
স্থানীয়রা জানান, নিহত আব্দুস সাত্তার দম্পতি রায়নগরের মিতালি আবাসিক এলাকার প্রথম বাসিন্দা। তাদের মূল বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও তৃণমূলে আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ সংগঠক হিসেবে মহল্লায় পরিচিত। তিনি ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা। তবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য পদে থাকা সাত্তার সাবেক পরিচালক ছিলেন।
সাত্তার-সুরাইয়া দম্পাতির দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। তারা সপরিবারে লন্ডন ও আমেরিকায় থাকেন। সাত্তারের স্ত্রী সুরাইয়া আমেরিকার পাসপোর্টধারী ছিলেন।
আপনার মন্তব্য