নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:৪৮

সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির জানাজায় মানুষের ঢল, প্রবাস থেকে এসে অংশ নিলেন ছেলে

খুন হওয়া সিলেটের প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম দম্পতির জানাজা সম্পন্ন হয়েছে।

শুক্রবার বাদ আসর সিলেট নগরের ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দানে এই দম্পতির জানাজা সম্পন্ন হয়। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন।

জানাজায় যুক্তরাজ্য থেকে এসে অংশ নেন এই দম্পতির একমাত্র ছেলে আরিফ ইফতেখার। শুক্রবারই তিনি দেশে আসেন।

জানাজার পূর্বে মুসল্লিদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন, আমার বাবা যদি কোন ভুল করেন আপনারা ক্ষমা করে দেবেন। আর কেউ তার কাছে টাকা পয়সা পেয়ে থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন।

এরপর পাশাপাশি খাটিয়ায় মরদেহ রেখে একসাথে এই দম্পতির জানাজা সম্পন্ন হয়। তার আগে বিকেলে দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের মরদেহ রায়নগরের বাসা থেকে ঈদগাহ ময়দানে আনা হয়।

জানাজার আগে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও মুসল্লিদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শান্তির নগরী হিসেবে পরিচিত সিলেটে অতীতে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা খুব কমই ঘটেছে।

সিসিক প্রশাসক আরও বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। ঘটনার নেপথ্যে কেউ থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা চাই, দ্রুতবিচার আদালতের মাধ্যমে মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি করে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।”

সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিমের পরিচালনায় জানাজায় মেক্সিকোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, সিলেট জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা ফখরুল ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিপুলসংখ্যক নগরবাসী অংশ নেন।

জানাজা শেষে নিহত আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের মরদেহ মানিকপীর (রহ.) কবরস্থানে দাফন করা হয়।

দাফন ও জানাজায় অংশ নিতে যুক্তরাজ্য থেকে এই দম্পতির একমাত্র ছেলে ও এক মেয়ে আজ দেশে ফিরেন। এরআগে বৃহস্পতিবার দেশ ফিরেন দুই মেয়ে।

দাফনর পর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত দম্পতির ছেলে আজ থানায় মামলা করবেন বলে জানা গেছে।

এর আগে বুধবার সকালে রায়নগরে নিজেদের বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও তাদের কাজের মেয়ে তাহমিনার (১৮) গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

গৃহকর্মী তাহমিনার জানাজা ও বৃহস্পতিবারই সুনামগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে সম্পন্ন হয়।

আর বৃহস্পতিবার দেশে ফিরে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম দম্পতির মেয়েরা ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে বাবা-মায়ের মরদেহ গ্রহণ করেন।

নিহত আব্দুস সাত্তারের চার সন্তানের সবাই প্রবাসে বসবাস করেন। তাদের মধ্যে দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে এবং এক মেয়ে ও একমাত্র ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।

উল্লেখ্য, গত বুধবার সকালে রায়নগরের মিতালী এলাকার একটি বাসায় ঘটে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ঘটনার চার ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ রহস্য উদঘাটনের দাবি করে। জিজ্ঞাসাবাদে গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের প্রেমিক বাবুল মিয়া একাই তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে স্বীকার করে।

পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন সকালে তাহমিনার সম্মতিতে বাবুল বাসায় প্রবেশ করে। পরে অনৈতিক প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে বিরোধ বাধে। একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে হত্যা করে। তাহমিনার চিৎকারে এগিয়ে আসা গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং পরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারকেও একইভাবে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায় এবং কাছের একটি ঝোপে ছুরিটি ফেলে দেয়। পরে সিসিটিভি ফুটেজের সহায়তায় স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে আটক করা হয় এবং ঝোপঝাড় থেকে ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ।

বুধবার সন্ধ্যায় বাবুল মিয়াকে আটকের পর সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেছিলেন, বাবুল মিয়া ওই বাসার রংমিস্ত্রির কাজ করত, মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করত। ওই বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসায় গিয়ে গৃহকর্মীকে নিয়ে একটি কক্ষে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরে একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে মেয়েটিকে আঘাত করে।

তিনি বলেন, শব্দ পেয়ে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। তাদের চিৎকার শুনে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে আসেন। তখন তাকেও ছুরি মেরে হত্যা করে বাবুল। পরে সে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত