নিজস্ব প্রতিবদক

২৬ মে, ২০১৬ ০৯:৪৭

‘এবার মার্কা দেখে নয়, ভোট দিমু প্রার্থী দেখে’

তাঁরা চা শিল্পের নিখুঁত শিল্পী। স্বল্প মজুরিতে তাঁদের ঘামঝড়ানো শ্রমে যুগ যুগ ধরে বিকশিত হচ্ছে চায়ের বাজার,সম্বৃদ্ধ হচ্ছেন বাগান মালিকরা। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অবহেলায় আর নিদারুন কষ্টে থাকা এই জনগোষ্ঠীর খোঁজখবর তেমন একটা রাখেননা কেউ। বছরের পুরোভাগে চা শ্রমিকরা রাষ্ট্র আর রাজনীতির হর্তাকর্তাদের সু-নজরে না থাকলেও নির্বাচন এলে চিত্রটা একেবারেই পাল্টে যায়।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের এপর্যায়ে চা জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত শ্রীমংগলের ৯টি ইউনিয়নে ভোটযুদ্ধ আগামী ২৮ মে। তাই এ অঞ্চলের চা বাগানগুলোতে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বেড়েছে সমাজপতিদের আনাগোনা। শান্ত চা বাগানের জনপদ-প্রকৃতি মুখরিত নির্বাচনী প্রচারনা-আর প্রার্থীদের সরব পদচারনায়।

 ফাইল ছবি

একদিন পরেই ইউপি নির্বাচন। দেশের অন্যান্য এলাকার মতোই চায়ের রাজধানী শ্রীমংগলেও জমজমাট হয়ে উঠেছে নির্বাচনী প্রচারণা। ছোট্ট ঝুপড়ি ঘর থেকে শুরু করে বাজারের আড্ডা, সবখানেই চলছে ভোটের গল্প। শেষ মূহুর্তে প্রচারণায় থেমে নেই শিশু, বালক, বৃদ্ধ কেউই। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ছুটছেন প্রার্থীরা। দুপুর ২টা থেকে শুরু করে রাত ৮টা পর্যন্ত চলছে হরেক রকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাজানো মাইকিং।

এদিকে চা বাগান অধ্যুষিত হওয়ায় শ্রীমংগলে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের একটু বেশীই পরিশ্রম করতে দেখা যাচ্ছে। তবে প্রচারনার দৌড়ে পিছিয়ে নেই আওয়ামীলীগ প্রার্থীরাও।

চা বাগান এলাকার ভোটারদের নিয়ে জনশ্রুতি আছে, চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের ভোটারটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে থাকেন। এর আগে হয়ে যাওয়া নির্বাচনের পর্যবেক্ষন থেকেও এ তথ্যেরে বাস্তবতা খুজেঁ পাওয়া গেছে।

তবে বাগানের ভোটাররা এবার বলছেন অন্য কথা। দীর্ঘদিনের অ্প্রাপ্তি, শোষন আর নিগ্রহের স্বীকার চা শ্রমিকরাও এবার অনেকটাই নড়েচড়ে বসেছেন। সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, মার্কা দেখে নয় প্রার্থীর যোগ্যতা দেখে ভোট দেয়ার।

সাতগাঁও চা বাগানের শ্রমিক চম্পা তাঁতী বলেন, 'সারা বছর আমরার খবর কেউ রাখেনা, খালি ইলেকশন আইলেই আমরার কাছে সবাই ছুটিয়া আয়। আমরা আর মিঠা কথায় ভুলতাম না, এবার বুঝিয়াই সীল দিমু'।

তবে কালিঘাট বাগানের প্রবীন চা শ্রমিক বাবুল বুনার্জীর বিশ্লেষনটা একটু ভিন্ন। তিনি বলেন, 'স্থানীয় নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এই নির্বাচনে আমরা ভোট দিয়ে সরকার গঠন করতে পারবো না। যখন জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার নৌকার ভোট আসবে তখন আমরা নৌকায় ভোট দেওয়ার কথা ভাববো। আর এই স্থানীয় নির্বাচনে আমরা যোগ্য প্রার্থীদের দেখে ভোট দেব সে হোক আওয়ামীলীগ, বিএনপি বা স্বতন্ত্র।'

এদিকে উপজেলার রাজঘাট, কালিঘাট, সাতগাঁও এই তিনটি ইউনিয়নে বিএনপি এর কোন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করছে না।

উপজেলা নির্বাচন অফিস সুত্রে জানা যায়, আগামী ২৮ মে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৯ টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১১৬টি পদে প্রার্থীর সংখ্যা মোট ৪৮০ জন।

এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন ৩৩ জন, সাধারন সদস্য (মেম্বার) পদে ৩৩২ জন, সংরক্ষিত মহিলা সদস্য (মহিলা মেম্বার) পদে ১১৫ জন। ১টি সাধারণ সদস্য পদের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ৯টি ইউনিয়নে মোট ভোটার ১ লক্ষ ৯৩ হাজার ৫৬৭ জন। মোট ভোট কেন্দ্র ১০০টি।

এর মধ্যে ১নং মির্জাপুর ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ হাজার ৯৬১ জন। এই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থীরা হলেন- আবু সুফিয়ান চৌধুরী (আওয়ামীলীগ), মো. সুফি মিয়া (বিএনপি), বর্তমান চেয়ারম্যান মো. ফিরুজ মিয়া (আওয়ামীলীগ বিদ্রোহী), হাজী মো. মস্তান মিয়া (জাতীয় পার্টি), সঞ্জয় চক্রবর্তী (স্বতন্ত্র) ও মো. শফিকুল ইসলাম (স্বতন্ত্র)।

২নং ভূনবীর ইউনিয়নের মোট ভোটার ২৩ হাজার ২২৭ জন ভোটার জন। চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রসিদ (আওয়ামীলীগ), মো. চেরাগ আলী (স্বতন্ত্র), মো. ফারুক আহমদ (বিএনপি), সুফিয়া বেগম (স্বতন্ত্র) ও শাহ মেহাম্মদ আলী মিয়া (স্বতন্ত্র)।

৩নং শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নে মোট ভোটার রয়েছেন ৩৬ হাজার ৪৫ জন। বর্তমান চেয়ারম্যান ভানুলাল রায় (আওয়ামীলীগ), মো. ইমাদ আলী (বিএনপি), আফজাল হক (আওয়ামীলীগ বিদ্রোহী) ও দুধু মিয়া (স্বতন্ত্র)।

৪নং সিন্দুরখাঁন ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ২২ হাজার ৩০৫ জন। শীর্ষ পদে লড়ছেন বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হেলাল (আওয়ামীলীগ), ইয়াছিন আরাফাত রবিন (বিএনপি), বদরুল ইসলাম সোহেল (জাতীয় পার্টি), আবু কামাল খায়রুজ্জামান (বিএনপি বিদ্রোহী) ও অরুন দেব (স্বতন্ত্র)।

৫নং কালাপুর ইউনিয়নে মোট ভোটার ২৩ হাজার ৫৫৯ জন। চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মতলিব (আওয়ামীলীগ), মো. আব্দুল হাই (বিএনপি), মো. কামাল হোসেন (জাতীয় পার্টি) ও মুজিবুর রহমান (স্বতন্ত্র)।

৬নং আশিদ্রোন ইউনিয়নে মোট ভোটার ২৭ হাজার ৪৫৮ জন। বর্তমান চেয়ারম্যান রনেন্দ্র প্রসাদ বর্ধন জহর (আওয়ামীলীগ)'র সাথে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন মো. তাজ উদ্দিন (বিএনপি) ও মকসুদুর রহমান (স্বতন্ত্র)।

৭নং রাজঘাট ইউনিয়নে মোট ভোটার রয়েছেন ১৮ হাজার ২০৩ জন। বর্তমান চেয়ারম্যান বিজয় বুনার্জী (আওয়ামীলীগ) ও মাখন লাল কর্মকার (আওয়ামীলীগ বিদ্রোহী)

৮নং কালিঘাট ইউনিয়নে মোট ভোটার ১৫ হাজার ২৫১ জন। চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দিতায় রয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান প্রানেশ গোয়ালা (আওয়ামীলীগ) ও পরাগ বাড়ই (স্বতন্ত্র)।

৯নং সাতগাও ইউনিয়নে মোট ভোটার ৮ হাজার ৫৫৮ জন। চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন বর্তমান চেয়ারম্যান রঘুনাথ দেব রিংকু (আওয়ামীলীগ) ও মিলন শীল (আওয়ামীলীগ বিদ্রোহী)

এবার সবচেয়ে বেশি ভোটার ৩নং শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নে (মোট ভোটার ৩৬ হাজার ৪৫ জন) এবং সবচেয়ে কম ভোটার সাতগাঁও ইউনিয়নে (মোট ভোটার ৮ হাজার ৫৫৮ জন)।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত