২৩ মে, ২০১৭ ০০:৫৬
সাড়ে তিন বছরের শিশু আলাল মিয়া। তার দুই পা ও হাতের আঙ্গুল গুলো জট লাগানো। আলালের আচরণও অন্য সব সাধারণ শিশুদের মত না। প্রথম দেখায় যে কেউ বলতে পারবে শিশুটি স্বাভাবিক নয়। অথচ তার এলাকার জনপ্রতিনিধিরা মানতে রাজি নন যে শিশুটি প্রতিবন্ধী। আলালের মা রহিমা খাতুন ও বাবা শহিদ মিয়া অনেকবার জনপ্রতিনিধিদের দ্বারস্থ হয়েও তাদের বিশ্বাস করাতে পারেননি তার ছেলে প্রতিবন্ধী।
হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার বুল্লা ইউনিয়নের ভরপূন্নি গ্রামে আলালের মত আরো দুইজন প্রতিবন্ধী আছেন। তাদের অভিযোগ, প্রতিবন্ধী হয়েও সরকারের দেয়া প্রতিবন্ধী ভাতা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। যদিও জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে দাবি করা হয় যে তাদের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিবন্ধী তথ্য সংগ্রহের কাজ করেছেন। কোনো প্রতিবন্ধী তালিকা থেকে বাদ পরার কথা না।
জানা যায়, জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিবন্ধীদের তথ্য সংগ্রহ করার কথা থাকলেও প্রকৃত অর্থে কেউ তথ্য সংগ্রহ করতে যান নি। বরং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই মনগড়া তালিকা প্রস্তুত করে দিচ্ছেন।
প্রতিবন্ধী তথ্য সংগ্রহ বা তালিকা যে সরকার থেকে করা হয় এ বিষয়ে কিছু জানেন না অভিযোগকারীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভরপূর্নি গ্রামে প্রতিবন্ধী তথ্য সংগ্রহ করতে বাড়ি বাড়ি কেউ যায়নি।
এ বিষয়ে আলালের মা রহিমা খাতুন বলেন, "বাড়িত আইয়া প্রতিবন্ধীর লিস্ট যদি করতো, তাইলে তো আমার বাচ্চাটা বাদ পড়তো না। যদি সারা গেরামের হকল ঐ প্রতিবন্ধী হইতো, তাইলে বুঝতাম যে ভুলে হয়তো আমার বাচ্চার নাম বাদ পড়ছে। আমরার গেরামো আছেই মাত্র কয়েকজন প্রতিবন্ধী । এর মধ্যে এক গেরামের ৩ জন বাদ পরে কেমনে?"
তিনি আরো বলেন, "চেয়ারম্যান-মেম্বার ২ জনরেই কইছি আমার পোলারে একটা প্রতিবন্ধী কার্ড দেওয়ার জন্যে। তারা দেইন না । কইন আমার আলাল বুলে প্রতিবন্ধী না। ৫ জনের সংসার । আলালের বাপে মাটি কাটার কাজ কইরা যে টেকা পাইন, ইতা দিয়া সংসারই চলে না। পোলার চিকিৎসা কেমনে করাইমু? আমরা গরিবরে তারা চোখে লাগে না।"
ভরপূন্নি গ্রামের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সেচ্ছাচারিতার শিকার হয়ে একই গ্রামের ৩ জন প্রতিবন্ধী ভাতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত সকল সুযোগ-সুবিধাও গ্রহণ করতে পারছেন না তারা।
ভরপুর্ণি গ্রামের ৪০ বছর বয়সী শেফালী আক্তার। জন্ম থেকেই তার দাতেঁর ২ পাটি জোড়া লাগানো। কথা বলতে খুব কষ্ট হয় তার। ভাত খাওয়ার জন্য পাশের একটি দাঁত ভেঙে ছিদ্র করেছেন। শেফালি আক্তার বলেন, "মেম্বার গত বছর কইছিল প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা কইরা দিব। কিন্তু এ বছর মেম্বার কয়, ইটা কোনো সমস্যা না, আমি ভালা!"
একই গ্রামের আকলিমা খাতুন ও মাহমুদ আলীর সন্তান আকিবুর রহমান। বয়স ১০ মাস। জন্মের পর থেকেই তার বাম পা ডান পা থেকে লম্বা এবং বাঁকা। আকিবুরের মা আকলিমা খাতুন জানান, জন্মের পর থেকে তার ছেলের চিকিৎসা করাচ্ছেন। কিছুদিন আগে ১টি এনজিওর মাধ্যমে সাত-আট হাজার টাকা খরচ করে সিলেট ওসমানি মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা করিয়েছেন। অপারেশন করিয়েও কাজ হয় নি।
আকলিমা খাতুন আরো বলেন, "৪/৫মাস আগে চেয়ারম্যান মেম্বারের কাছে গেছি। তারা কইন এখনো নাম আইছে না।"
জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিবন্ধীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। উপজেলা সমাজসেবা অফিসারের তাদরকিতে ইউনিয়ন সমাজকর্মীরা এ কাজ করেন। সে তথ্য সংগ্রহের প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের মে মাস থেকে প্রতিবন্ধীদের কার্ড বিতরণ শুরু হয়। জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ জেলায় প্রতিবন্ধী আছেন ১১ হাজার ৩শত ৫৪ জন। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে সরকার প্রতিটি ইউনিয়নে প্রতিবন্ধী ভাতা ৬০% বৃদ্ধি করে।
এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক হামদুল করিম বলেন, "প্রতিবন্ধী ভাতা গ্রহণ করতে হলে অব্যশই প্রতিবন্ধী স্মার্ট কার্ড গ্রহন করতে হয়। ইতিমধ্যে উপজেলা সমাজসেবা অফিসারের তাদরকিতে ইউনিয়ন সমাজকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্ধারিত ফরম ফিলাপ করে প্রতিবন্ধীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ তালিকা থেকে কোনো প্রতিবন্ধী বাদ পড়ার কথা না। তারপরও যদি কেউ বাদ পড়ে থাকে, তবে তাকে উপজেলা সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করে জরিপ ফরম পূরণ করে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে গিয়ে দায়িত্বরত কনসালটেন্ট এর মাধ্যমে সনাক্ত করাতে হবে। প্রতিবন্ধী কার্ডধারী হলে নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর তালিকায় সংযুক্ত করা হয়।
জনপ্রতিনিধিরা প্রতিবন্ধী সনাক্ত করতে পারেন কিনা এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "প্রতিবন্ধী সনাক্ত জনপ্রতিনিধিরা করতে পারেন না। তাদের দায়িত্ব হলো কেউ যদি প্রতিবন্ধী হন বা সাধারণভাবে তাদেরকে প্রতিবন্ধী মনে হয়, তাহলে উপজেলা সমাজসেবা অফিসে নিয়ে আসা এবং নিয়মানুযায়ী প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ সদরের প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা ফারজানা বিনতে মাহমুদ বলেন, একজন লোক প্রতিবন্ধী কি না সেটা জনপ্রতিনিধিদের সনাক্ত করার কোনো অধিকার নাই। প্রতিবন্ধী সনাক্তকরণের কাজ শুধুমাত্র ফিজিওথেরাপী কনসালট্যান্ট করতে পারেন। আমাদের প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে প্রতি মাসের ১ম, ২য় ও ৪র্থ মঙ্গলবার ফিজিওথেরাপী কনসালট্যান্ট দিয়ে মেডিকেল চেকাপ করা হয়।
ওর্য়াড মেম্বার মহিবুর রহমান বলেন, তারা সবাই আমার আপনজন। কেউ যদি প্রতিবন্ধী হয়, তাহলে তারা প্রতিবন্ধী ভাতা পাবে। এ বিষয়ে আমার কোনো আপত্তি নাই। ইউনিয়ন অফিসে যখন ডাক্তারি পরীক্ষা হয়, তখন তারা যায়নি। তাই হয়তো তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
বুল্লা ইউপি চেয়ারম্যান শেখ মুক্তার হোসেন বেনু বলেন, সমাজসেবা অফিস থেকে আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিবন্ধী তালিকা করা হয়েছে। বেশ কিছুদিন আগে সমাজসেবা অফিসের উদ্যোগে এলাকার অনেক মানুষ ইউনিয়ন পরিষদে এসে ফরম পূরণ করে ফিজিওথেরাপী কনসালট্যান্ট দিয়ে প্রতিবন্ধী সনাক্তকরণ করা হয়েছে। যারা অভিযোগ করেছেন, তার কেউ আমার কাছেও আসেননি। কে প্রতিবন্ধী আর কে প্রতিবন্ধী না, সেটা আমরা নির্ধারন করবো না। সেটা নির্ধারন করবেন এ বিষয়ে কর্তব্যরত ডাক্তার।
আপনার মন্তব্য