২৮ মে, ২০১৭ ১২:১৬
২১ মে গভীর রাত। প্রচন্ড ঝড় তুফান হচ্ছে। ফজরের আজানের কিচ্ছুক্ষণ আগে প্রসব ব্যথা ওঠে রিনা আক্তারের। স্বামী হাবিবুর রহমান সুজন সারাদিন মাঠে কাজ করে ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছেন। তাই রিনা তাঁর শ্বাশুড়ি মনোয়ারা বেগমকে গিয়ে বললেন ব্যথার কথা । বাড়ি থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্র। সারারাতের ঝড়-তুফানে গ্রামের রাস্তায় অনেক গাছ ভেঙ্গে পড়েছে। এর মধ্যেই অনেক কষ্টে রিনা আক্তার ও তাঁর স্বামী সুজন একটি সিএনজিযোগে ভোর ৬টার দিকে করাব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রে উওস্থিত হন। সকাল ১০.৩০ মিনিটে রিনার কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান।
আজ ২৮ মে আন্তর্জাতিক নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। একজন মেয়ে মানেই ভবিষ্যত মা। মা হওয়ার স্বপ্ন লালিত থাকে প্রত্যেক মেয়ের মনে। নারীর পূর্ণতা আসে মাতৃত্বে। এই মাতৃত্ব নিরাপদ রেখে সুষ্ঠুভাবে শিশুর জন্মদান ও মাতৃত্ব সম্পর্কিত সমস্যাগুলি চিহ্নিত করা ও এগুলির সুষ্ঠু সমাধানের পথ খোঁজা এই দিবসটির অন্যতম লক্ষ্য। এছাড়াও মাতৃস্বাস্থ্য, নিরাপদ প্রসব, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি সম্পর্কে মা, পরিবার ও সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে ‘নিরাপদ প্রসব চাই, স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চল যাই’।
হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল করাব ইউনিয়ন। উপরে উলেখিত রিনা আক্তার এই করাব গ্রামের বাসিন্ধা। ৮ এবং ৬ বছরের ২ ছেলেসহ স্বামীর পরিবার নিয়ে তার সংসার। রিনা আক্তারের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার আগের সন্তান দু'জনের জন্ম তার বাবার বাড়িতে ধাত্রী দিয়ে করিয়েছেন। বাড়িতে বাচ্চা প্রসব করানোর জন্য কিছু সমস্যার ও সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাই এ বাচ্চার জন্ম নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি রিনার শ্বাশুড়ি মনোয়ারা বেগম।
রিনা আক্তার বলেন, আমার শ্বাশুড়ির ইচ্ছাতে আমাকে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। তাই কোনো ধরণের সমস্যা ছাড়াই আমার মেয়ের জন্ম হয়েছে এবং আমিও সুস্থ্য আছি।
রিনার শ্বাশুড়ি মনোয়ারা বেগম জানান, বাড়িতে বাচ্চা প্রসব করানোর সময় প্রসবকালীন জটিলতার কারণে তার ২ ছেলে ও ৩ মেয়ে জন্মের সময়ই মারা গেছে। সেই তাগিদে তিনি তার ছেলের বউদের প্রসব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে করান।
মনোয়ারা বেগম বলেন, আমাদের সময় কোনো হাসপাতাল ছিল না। তাই বয়স্ক মুরুব্বি নারীদের দিয়ে প্রসব করানো হত। অদক্ষতার কারণে জন্মের সময় আমার ৫টি সন্তান মারা যায়। ১০ মাস ১০ দিন একটি সন্তান গর্ভে ধারণ করে তার মৃত মুখ দেখা যে কতোটা কষ্টের, সেটা শুধু একজন মা-ই বুঝতে পারবে। আমি যে কষ্ট ভোগ করেছি, সেটা যেনো আমার ছেলের বউরা না পায়, সেজন্য তাদের প্রসব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে করিয়েছি।
ভাটি অঞ্চল খ্যাত লাখাই উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল করাব ইউনিয়ন। বিভ্রান্তি, অজ্ঞানতা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থায় মোড়া এই অঞ্চলগুলোতে স্বাস্থ্য কেন্দ্র পর্যন্ত প্রসুতিদের নিয়ে যাওয়া খুব কঠিন কাজ। যদিও এই গ্রামে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রে ২ বছর যাবত নিয়মিত স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়।
করাব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্র সূতের জানা যায়, ইউনিয়নের ৯টি গ্রামের নারী, পুরুষ, শিশু এখান থেকে সেবা গ্রহণ করেন। ২০১৫ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৭ সালের ২১জুন পর্যন্ত সম্পূর্ন বিনা খরচে ৩৮৫টি নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন করা হয় এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। এছাড়াও বাচ্চা জন্মের ২৪ ঘন্টার মধ্যে মা ও শিশুর সেবা প্রদান করা হয়। বিশেষ করে মায়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধে কাজ করা হয়। শিশুর জন্মের ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে সুস্থতা পরীক্ষা করা হয়। ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে মা ও শিশুর ফলোআপ করা হয়। শিশু জন্মের ৪২ দিনের মধ্যে মা-শিশুর পরীক্ষাসহ পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে মায়েদের পরার্মশ দেয়া হয়। এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ১ মাসে সর্বোচ্চ ২৯টি ও ১দিনে সর্বোচ্চ ৪টি ডেলিভারি হয়েছে।
এই স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের প্রধান সমস্যা হল, ডেলিভারি এবং নারী রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে পরিবার কল্যান পরিদর্শিকার অনুপস্থিতি। প্রতন্ত অঞ্চল হওয়ায় কোনো পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা এখানে চাকরি করতে চান না। তাই দীর্ঘদিন যাবত এই পদটি শূন্য রয়েছে। বেসরকারী সংস্থার মা-মনি প্রজেক্টের প্যারামেডিক রত্না আক্তারকে দিয়েই ডেলিভারির কাজ করানো হয়। হাসপাতালে কোনো ডেলিভারি টেবিল নেই। এছাড়াও গভীর নলকূপ না থাকায় আছে বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং বিদুৎ না থাকলে মোমবাতি জ্বালিয়ে ডেলিভারি করাতে হয় কতৃপক্ষকে।
প্রসুতি মায়েদের স্বাস্থ্য কেন্দ্র পর্যন্ত নিয়ে আসা প্রসঙ্গে করাব ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক সনজিত সিনহা বাপ্পি বলেন, শুরুর দিকে স্বাস্থ্য কেন্দ্র পর্যন্ত এই এলাকার জনগন বিশেষ করে প্রসুতি মায়েদের নিয়ে আসা ছিল খুব কষ্টকর। ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং কুসংস্কারাচ্ছন্নতা কাটিয়ে মায়েদের স্বাস্থ্য কেন্দ্রমুখী করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। তারপরও করাব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রের ১৫ সদস্য বিশিষ্ট টিমের অক্লান্ত পরিশ্রমে আমরা সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য ইউনিয়নে বসবাসরত প্রতিটি মানুষের কাছে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া। গ্রামের অসহায় দরিদ্র জনগন যেন তাদের প্রাপ্য মৌলিক অধিকারটুকু পায়, সেই লক্ষেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমানে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃতুর হার হ্রাস পেয়েছে এবং পরিকল্পিত পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে।
করাব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ডা. মো. ফরাস উদ্দিন বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির মাধ্যমে মা ও শিশু মৃত্যু রোধ করা ও শিশুদের সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার ভেদ করে গর্ভবতীদের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এনে সেবা দেয়া অনেক কঠিন কাজ ছিল। তবে এখন খুব ভালো অবস্থানে আছি আমরা। প্রায় ৭০ ভাগ লোক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসেন সেবা নিতে। বিশেষ করে গর্ভকালীন ও গর্ভপরবর্তী সেবা নেন তারা। বাড়ি বাড়ি উঠান বৈঠক, ভিডিও প্রর্দশনী, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনাসহ মাঠ পর্যায়ে ৯১ জন ভলান্টিয়ারের সার্বক্ষনিক সহযোগিতায় গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য কেন্দ্রমুখী করতে সক্ষম হয়েছি।
আপনার মন্তব্য