২৭ জুন, ২০১৭ ২১:৫৩
প্রতিবছর ঈদ এলেই পর্যটকদের চেনা গন্তব্য মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখার এই পর্যটন স্পটে এবার ভিন্ন চিত্র। রাস্তা ও টিলায় ধসের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় আপাতত পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পড়েন বিপাকে। নিষেধাজ্ঞার খবর না জানায় অনেক পর্যটক ঘুরতে এসে ফিরে গেছেন।
সারা বছরে দু’টি ঈদকে উপলক্ষ্যে ব্যবসায়ীরাও দোকানে মালামাল তুলেন। ভালো বিকিকিনি হবে, এমন আশায় এবারও বুক বেঁধেছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু রাস্তা ও টিলায় ধসের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত পর্যটনকেন্দ্র অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করায় তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে ইজারাদারদেরও।
সাম্প্রতিক ভারি বর্ষণে মাধবকুণ্ডের টিলা ও রাস্তা দেবে যাওয়ায় ‘জননিরাপত্তা ও পর্যটকদের প্রাণহানী এড়াতে প্রশাসন গত বৃস্পতিবার (২২ জুন) থেকে মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে পর্যটক প্রবেশে অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে গত কয়েকদিন থেকে অনেক দূর-দুরান্ত থেকে মাধবকুন্ড জলপ্রপাতে বেড়াতে আসা পর্যটকরা ফিরে গেছেন প্রধান ফটক থেকেই। মাধকুণ্ড এলাকা পর্যটক শূন্য থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
এদিকে, ঈদের দিন সোমবার (২৬ জুন) বিকেলে দ্রুত মাধবকুণ্ড পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেয়ার দাবীতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। ঈদের দিন সোমবার সহস্রাধিক পর্যটক মাধবকুণ্ডে এসেছিলেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে জলকন্যা মাধবকুণ্ড না দেখে প্রধান ফটক থেকেই তাদের ফিরতে হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ জুন) স্থানীয় কাঁঠালতলী বাজার থেকেই পর্যটকরা ফিরে গেছেন। পর্যটন পুলিশের পক্ষ থেকে আগত পর্যটকদের জলপ্রপাত এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ও তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি অবহিত করতে দেখা গেছে। জলপ্রপাতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জেনে হতাশা নিয়ে ফিরতে পর্যটকদের ফিরে যেতে দেখা গেছে।
মঙ্গলবার সিলেট থেকে মাধবকুণ্ড বেড়াতে আসেন কলেজ শিক্ষার্থী হোসাইন আহমদ, কামাল আহমদ, ফাহিম আহমদ ও আমিনুল ইসলাম। বন্ধুরা মিলে জলপ্রপাত দর্শনে এসেছিল তারা। নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেতরে তাদের আর যাওয়া হয়নি। কথা হয় তাদের সঙ্গে। তারা বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে আশা করে বন্ধুরা মিলে মাধবকুণ্ডে বেড়াতে এসেছিলাম। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন জলপ্রপাতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই ফিরে যাচ্ছি।’ তাদের মতো এদিন প্রায় দুই সহস্রাধিক পর্যটক ফিরে গেছেন।
এছাড়া পর্যটক না থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও অলস সময় পার করছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রামীণ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘গত ঈদে প্রতিদিন কম হলেও ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বিকিকিনি হতো। কিন্তু এবার অবস্থা খুব খারাপ।’ তিনি ক্যাশ খুলে দেখালেন সারাদিনে মাত্র ১’শ টাকা বিক্রি করেছেন।
গ্রামীণ রেস্টুরেন্টের পাশের দোকান মীম ঝিনুক এন্ড কসমেটিক্সের দোকানে প্রবেশ করে ক্রেতাশূন্য দেখা গেল। কর্মচারীরা আড্ডা-গল্পে ব্যস্ত। এ দোকানে কর্মচারীর কাজ করেন জাহেদ আহমদ ও এবাদ আহমদ। তারা বলেন, ‘দোকান মালিক এ বছর প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার মালামাল তুলেছেন। সারাদিনে প্রায় ১ হাজার টাকা বিক্রি হয়েছে। তারা আরও বলেন, ‘দোকানে আমরা মোট ১৬ জন কর্মচারী কাজ করি। কিন্তু মাধবকুণ্ডে পর্যটক না আসায় তারা মাত্র ছয়জন দোকানে কাজ করছেন। বিকিকিনি না থাকায় বাকিরা আসেনি।’
এছাড়া স্থানীয় ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন, এমরান হোসেন, শামীম আহমদ, আলী হোসেন, স্বপন আহমদ, আবুল হোসেন, হেলাল উদ্দিন, বেলাল আহমদ জানান, মাধবকুণ্ড সব মিলেয়ে মোট ৬০টি দোকান রয়েছে। সারাবছরে ঈদের ছুটিতে বিকিকিনি একটু ভালো হয়। এবছর তারা বিকিকিনি ভালো হওয়ার আশায় দোকানগুলোতে লাখ লাখ টাকার মালামাল তুলেছিলেন। কিন্তু মাধবকুণ্ডে পর্যটক না আসায় তারা মন্দা সময় কাটাচ্ছেন। তারা মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের রাস্তা দ্রুত মেরামত করে গেট খুলে দেয়ার জোর দাবী জানান।
এ ব্যাপারে মাধবকুণ্ড পর্যটন পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গির আলম বলেন, ‘জননিরাপত্তা ও পর্যটকদের প্রাণহানী এড়াতে বন বিভাগ জলপ্রপাত এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশের প্রধান ফটক ছাড়াও কাঁঠালতলী বাজারের সামনে পর্যটকদের সতর্ক করে বন বিভাগের পক্ষ থেকে ব্যানার টাঙানো হয়েছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে পর্যটকদের আমরা জলপ্রাপত এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ও তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি অবহিত করছি।’
বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে শ্রমিক না থাকায় সংস্কার কাজ বন্ধ রয়েছে। কাজ শেষে অভ্যন্তরীণ রাস্তা পর্যটকের চলাচলের উপযোগী করেই ইকোপার্কের গেট খুলে দেওয়া হবে।’
ইজারাদার জুনেদে আহমদ ও রিফাত আহমদ বলেন, ‘বনবিভাগ ইকোপার্ক থেকে বছরে ৩০-৩৫ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করছে। ঈদের আগে ও পরে ১০-১৫ দিন হাজার হাজার পর্যটক আনন্দ উপভোগে এখানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটে আসেন। ১৫ দিন আগের বর্ষণে রাস্তায় সামান্য ফাটল আর অল্প দেবে যাওয়া মেরামতে বনভিবাগ চরম উদাসীন। দেশের দূরদুরান্তের পর্যটকের দুর্ভোগের কথা তারা মোটেও চিন্তা করেনি। কোন পূর্ব প্রস্তুতি নেয়নি। বর্ষাকালে অতীতেও মাধবকুণ্ডের রস্তা-ঘাট বিধস্ত হয়েছে। কিন্তু ইকোপার্ক বন্ধ করার ঘটনা ঘটেনি।'
তারা অবিলম্বে পর্যটকের জন্য মাধবকুণ্ডের তালা খুলে দেয়ার পাশাপাশি তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য ইজারার মেয়াদ বৃদ্ধিরও দাবী জানান।’
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক ভারি বর্ষণে মাধবকুণ্ড ইকোপার্কের সড়কের পর্যটন রেস্তোরাঁ এলাকার কাছে প্রায় ৪০ ফুট জায়গা প্রায় দুই ফুটের মতো নিচের দিকে দেবে যায়। তা ক্রমশই দাবছে। এছাড়া রেস্তোরাঁর কাছে উপরে ওঠার সিঁড়ির বাম পাশের নিচের প্রায় ৪০ ফুট এবং জলপ্রপাতের কাছে নামার সিঁড়ির ডান পাশের নিচের প্রায় ৩০ ফুটের মতো জায়গার মাটি সরে গেছে। এতে ইকোপার্কের সড়ক ও সিঁড়ি দুটিই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এলাকাটি পর্যটকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন গত বৃহস্পতিবার (২২ জুন) থেকে মাধবকুণ্ডে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা মাধবকুণ্ড।
আপনার মন্তব্য