০১ জুলাই, ২০১৭ ২৩:১৩
রোজা ও ঈদের দীর্ঘ ছুটি শেষে শনিবার দেশের সকল বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হয়েছে। তবে ব্যতিক্রম সিলেটের গোলাপগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বড়লেখার দেড় শতাধিক বিদ্যালয়। বন্যায় স্কুল ভবনের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় শনিবার এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান সম্ভব হয়নি। পানি নামার পূর্ব পর্যন্ত পাঠদান বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিস্টরা। দীর্ঘ ছুটির শেষে শিক্ষ কার্যক্রম শুরু করতে না পারায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতি মুখে পরবে বলে আশঙ্কা তাদের।
গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে পাহাড়ি ঢলে সিলেট ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে বন্যা। এতে বিস্তৃর্ণ জনপদ তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঢুকে পড়েছে পানি। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার ১২টি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয় এবং ৭৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। অপরদিকে, সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার অর্ধশতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় তলিয়ে গেছে পানিতে।
বড়লেখা : হাকালুকি হাওরে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বড়লেখার বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেকটির চারদিকে পানি। এতে করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্কুলে আসা-যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রোজার ছুটির পর শনিবারই (১ জুলাই) ছিল স্কুল খোলার প্রথম দিন। কিন্তু বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওর পারের স্কুলগুলোতে পানি উঠায় শিক্ষা কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। স্কুল চারপাশ পানিতে ডুবে আছে। এতে ছাত্র-শিক্ষক সবার পক্ষে স্কুলে আসা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেছে।
উপজেলার হাকালুকি উচ্চ বিদ্যালয়, ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয়, কানসাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, টেকা আলী উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাতলা উচ্চ বিদ্যালয়, মাইজগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়, ইটাউরি হাজী ইউনুছ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, পশ্চিম বর্নি উচ্চ বিদ্যালয়, বর্নি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, পাকসাইল উচ্চ বিদ্যালয়, হাজী শামছুল হক উচ্চ বিদ্যালয় ও সিদ্দেক আলী উচ্চ বিদ্যালয়-এই ১২টি স্কুল বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে হাকালুকি ও সিদ্দেক আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে খোলা হয়েছে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র।
পশ্চিম বর্নি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র সিংহ শনিবার বলেন, ‘স্কুলে পানি উঠেছে। পার্শ্ববর্তী এলাকার রাস্তাঘাটও পানির নিচে। নৌকা দিয়ে আসছি। আসবাবপত্রের নিচে ইট দিয়ে রাখছি। কিন্তু বোঝতে পারছি না। কতটুকু ভালো রাখা যাবে।’
এদিকে ৬ জুলাই থেকে বড়লেখা উপজেলা মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের অর্ধ-বার্ষিক ও প্রাক্ নির্বাচনী পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। বন্যার কারণে ৬ জুলাইয়ের বাংলা পরীক্ষা পিছিয়ে ২৩ জুলাই এবং ৮ জুলাইয়ের ইংরেজি পরীক্ষা ২৪ জুলাই পিছিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বড়লেখা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সমীর কান্তি দেব শনিবার বলেন, ‘স্কুল ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। ছাত্র-শিক্ষক কারো আসার উপায় নেই। দুটি পরীক্ষার তারিখ পেছানো হয়েছে।’
অপরদিকে বড়লেখা উপজেলার ৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে ৫৩টির ক্লাসরুমে পানি ঢুকে পড়েছে। ১৫টি চারদিকে পানি এবং সাতটিতে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। উপজেলার হাকালুকি সংলগ্ন বর্নি ইউনিয়নের ১৬টির মধ্যে ১৬টিতেই পানি ঢুকেছে। তালিমপুর ইউনিয়নের ১৫টির মধ্যে ১৪টিতে। সুজনাগর ইউনিয়নের ১৩টির মধ্যে ১৩টিই পানিবন্দী। এছাড়া দাসেরবাজার, নিজবাহাদুরপুর, উত্তর শাহবাজপুর, দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বন্যার পানি ঢুকেছে।
অন্যদিকে উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের কবিরা হাজী ও সায়পুর; তালিমপুর ইউনিয়নের হাকালুকি; দাসেরবাজার ইউনিয়নের দাসেরবাজার ও দক্ষিণ বাগীরপার; সুজানগর ইউনিয়নের আজিমগঞ্জ এবং দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের রাঙাউঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
বর্নি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কায়েদে আজম শনিবার বলেন, ‘এলাকার সব রাস্তা পানির নিচে। স্কুলেও পানি। ছোট বাচ্চাদের স্কুলে আসার উপায় নেই। আমরা পানিবন্দী অবস্থায় আছি।’
বড়লেখা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহীদুল্লাহ শনিবার বলেন, ‘এ পর্যন্ত ৫৩টির শ্রেণিকক্ষে পানি, ১৫টির চারদিকে পানি ও সাতটিতে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বন্যা আক্রান্ত বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।’
গোলাপগঞ্জ : গোলাপগঞ্জ উপজেলার অর্ধশত সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। রোজা ও ঈদের দীর্ঘ ছুটির শেষে শনিবার এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উপস্থিত হলেও শিক্ষার্থীরা বন্যার কারণে উপস্থিত হতে পারেনি। উপজেলার অধিকাংশ বিদ্যালয়ের শ্রেণি কক্ষ হাঁটু পানিতে নিমজ্জিত।
বাদেপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ে পানি মাঠে, শ্রেণি কক্ষে পানি থাকায় শিশুরা বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। এছাড়া বিদ্যালয়গুলোর বাথরুম ও টিউবওয়েল পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে ।
মীরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এসএমসির সদস্য মঈন উদ্দিন জানান বন্যার কারণে বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
এব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা চিন্তাহরণ দাস জানান বন্যার সময়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি চাইলে বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে রাখতে পারে। তবে সরকারি কোন নির্দেশনা নেই।
গোলাপগঞ্জ উপজেলা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয় গুলো হচ্ছে, বাদেপাশা ইউনিয়নের খাগাইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমকোনা-২ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, নোয়াই-২ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মোল্লারচক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছয়ঘরী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাগলা দক্ষিনপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুপাটেক-১ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুপাটেক-২ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাদেপাশা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডেপুটিবাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের কালীকৃষ্ণপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইসলামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, নুরজাহানপুর-১ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, নুরজাহানপুর-২ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাংজিওল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মেহেরপুর-১ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পনাইরচক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ পনাইরচক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কদুপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম খাটকাই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বুধবারীবাজার ইউনিয়নের কে.কে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজীপুর-২ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালিজুরি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাদেশ্বর ইউনিয়নের হাওরতলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফতেহপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মীরগঞ্জ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহ আব্দুল্লাহ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাউয়াটিকি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোয়াসপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আচিনা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মেহেরপুর-২ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, শেখপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিয়াগুল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলাশহর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের দক্ষিণ সুনামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইসলামপুর মোতাহার আলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমুড়া ইউনিয়নের শিকপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, উপর ঘাগুয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাঘা ইউনিয়নের পালানডুলি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজি জহির উদ্দিন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, রামগঞ্জ কালাকোনা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।
আপনার মন্তব্য