১১ জুলাই, ২০১৭ ২৩:১২
অনেকের ঘরের বেড়া ভেঙে পানির স্রোতে মিশে গেছে। কারো বেড়া ভেঙে পড়েছে। ঢেউয়ে ঘরের ভিটার মাটি ভাসিয়ে নিয়েছে। মাটিশূন্য ভিটের মধ্যে বাঁশের খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে আছে ঘর। টিকে থাকতে না পেরে বাড়িঘর ছেড়ে এসব পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলো আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রও ঠাঁই মিললও না তাদের। পরীক্ষার জন্য অসহায় দুর্গত এ ৪০টি পরিবারকে বের করে দেওয়া হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে।
গত শনিবার (৮ জুলাই) এ ঘটনাটি ঘটেছে তালিমপুর ইউনিয়নের হাকালুকি উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে। পানি না কমা সত্ত্বেও পরিবারগুলোকে তাড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি এখলাছুর রহমানের বিরুদ্ধে।
গত ৬ জুুলাই থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক ও প্রাক্-নির্বাচনী পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও বন্যার পানি উঠা স্কুলগুলোর পরীক্ষার তারিখ পেছানো হয়েছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব বাসিন্দাদের এলাকা এখনও প্লাবিত রয়েছে। স্কুল থেকে বের করে দেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে হাকালুকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, ৫টি পরিবার নিয়েছে স্থানীয় কানোনগো বাজারের একটি নির্মাণাধীন ভবনে। এছাড়া অন্য পরিবারগুলোর কেউবা গেছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি। কেউ বাড়িতে গিয়ে ঘরের মধ্যে মাচা বেঁধে বসবাস করছেন।
সোমবার (১০ জুলাই) রাতে কথা হয় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত হওয়া মুর্শিবাদকুরা গ্রামের রেশমী বেগমের সঙ্গে। তিনি এখন পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন কানোনগো বাজার এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনে। তিনি বলেন, ‘বিপদে পড়িয়া আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিছলাম। ই-খানোও ঠাঁই মিললও না। স্কুলের সভাপতি আমরারে পরীক্ষার কথা কইয়া ই-খান থাকি বার করি দিছইন। আমরা তানরে বউত রিকোয়েস্ট (অনুরোধ) করছি আরো কয়দিন থাকার লাগি। কিন্তু তাইন আমরারে খুব গালাগালি করছইন। পরে আর কিতা করমু গালাগালি হুনিয়া বারই গেছি।’
রেশমী বেগমের মত এখানো আরো ৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের বাড়ির ঘর থাকার অনুপযোগী।
বড়ময়দান গ্রামের সাইদুর রহমান বলেন, ‘ঘর এখনও ভাঙা। ঘরে পানি। আফালে বেড়া ভাঙিয়া আওরয়ে (হাওরে) নিছেগি। এর লাগি আশ্রয়কেন্দ্রে গেছলাম। স্কুলের সভাপতি বারনির লাগি (বের হওয়ার জন্য) যে গালাগালি করছইন। এখন যদি তানোর কথায় না বারই (বের হই) তাইলে অপমানিত অইতাম পারি। এর লাগি পরে মানসম্মানের লইয়া বারই গেছি।’
মুমিন আলী, সুহাদা বেগম, ফরিদা বেগম, সুফিয়া বেগম নামের আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দা বলেন, ‘ই-স্কুলের সভাপতি পরীক্ষার কথা কইয়া বারইয়া যাওয়ার কথা কইছন। কোলে রহুরুতা (সন্তান) লইয়া আমরা ঘর ছাড়ছি। যে অবস্থা দেখছি। না বারইলে সভাপতি মারিয়া বার করি দিবা। বিকেলে ৪টা থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় রইছি। পরে তারা বাজারো কিথা মাতামাতি (আলোচনা) করিয়া আইয়া ঘর খুলিয়া দিছইন।’
এ ব্যাপারে হাকালুকি উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি এখলাছুর রহমান বলেন, ‘আমি তাড়িয়ে দেইনি। এরারে আমি বউত সাহায্য করছি। তারার পাশে দাঁড়িয়েছি। উপর থাকিয়া নির্দেশ আইছে। এর লাগি পরীক্ষার কথা কইয়া তারারে অনুরোধ করিছি বারনির লাগি (বের হওয়ার জন্য)। ই-খানো পরিবার আছিল মাত্র ২১টি। সরকারিভাবে দেখানো হয়েছে ৫০ থাকি ৫৫টা। ২১ পরিবারের উপরে যে ত্রাণ আইলও ইতার হিসাব কেউ পাইছেনি। এগুলাও দেখবেন।’
মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সমীর কান্তি দেব বলেন, ‘পরীক্ষার জন্য আশ্রিত পরিবারগুলোকে জোর করে বের করার কথা নয়। আমি শুনেছি তারা নিজে থেকে চলে গেছে। জোর করে বের করে দেওয়া ঠিক হয়নি। পরিবারগুলো স্বাভাবিক আশ্রয়ে না ফেরা পর্যন্ত তাদের আশ্রয় দেওয়া দরকার ছিল। প্রয়োজনে পরীক্ষা কিছুদিন পরে নেওয়া যেত।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘জোর করে কাউকে বের করে দেওয়া হয়নি। অনেকের বাড়ি ঘর থেকে পানি নেমেছে। তারপরও তারা ত্রাণ পাবার আশায় আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়তে নারাজ। বন্যার কারণে পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে। বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রগুলো বিভিন্ন স্কুলে খোলা হয়েছে। আশ্রিতরা না ফিরলে পরীক্ষা নেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আমাদেরকে শিক্ষার্থীদের বিষয়টিও ভাবতে হবে।’
বড়লেখা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম সুন্দর বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্র থেকে দুর্গত পরিবারগুলোকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে আমায় কেউ জানায়নি। পরিবারগুলোর ঘরের পানি না কমা অবস্থায় বের করে দেওয়াটা অমানবিক হয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখছি।’
আপনার মন্তব্য