০৬ আগস্ট, ২০১৭ ১৮:১৮
ফুল আর চোখের জলে বিদায় জানালো হলো সিলেটের প্রবীন রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠক বাদল করকে। রোববার বিকেলে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ বাদল করকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
এরআগে সকাল ১১ টার দিকে নগরীর হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ সিলেটের প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা বাদল কর (হিমাংশু ভূষণ কর)। মৃত্যকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭৪ বছর।
বাদল করের ছেলে উদীচী, সিলেটের কর্মী হিতাংশু ভূষণ কর জানান, রোববার সকালের দিকে বাদল কর বুকে ব্যথা অনুভব করেন। দ্রুত তাঁর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাকে হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১১টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দুই ছেলে ও এক মেয়র জনক বাদল কর বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি, সিলেট জেলা সংসদের সভাপতি ও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠি সিলেট জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া স্বাধীনতা পরবর্তী সিলেটের প্রায় সবকটি প্রগতিশীল আন্দোলনেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বাদল কর।
বাদল করের মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর শিবগঞ্জস্থ বাসায় ভিড় করেন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোদ্ধা-সহকর্মী ও আত্মীয়স্বজনরা। এসময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন অনেকে।
বিকেল ৪ টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নিয়ে আসা হয় বাদল করের মরদেহ। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন প্রয়াতের মরদেহে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন।
এসময় বাদল করের কর্মময় জীবনের উপর আলোকপাত করে বক্তব্য রাখেন প্রবীন রাজনীতিবিদ বেদানন্দ ভট্টাচার্য, মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি মিশফাক আহমদ, ছাত্র ইউনিয়ন সিলেটরর সাধারণ সম্পাদক দিপঙ্কর দাশগুপ্ত প্রমুখ।
কমিউনিস্ট পার্টি সিলেট জেলা কমিটির পক্ষ থেকে প্রথমে পুষ্পস্তবক অপর্ণের মাধ্যমে প্রয়াতের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের সূচনা হয় এবং উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল সংগীত পরিবেশন করেন।
পরবর্তিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ(মাকর্সবাদী), সাম্যবাদী দল, সম্মিলিত নাট্যপরিষদ, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, যুব ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর, সুজন, সিলেটের সাংবাদিক সমাজ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, আনন্দলোক, সোপান, সিলেট সাহিত্য পরিষদ, কথাকলি, নান্দিক নাট্যদল, নগরনাট সহ সিলেটের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। এরপর স্থানীয় চালিবন্দরস্থ শ্মশানঘাটে তাঁর অন্ত্যষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
বাদল কর এর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে এবং তাঁর শোকবিহ্বল পরিবার-পরিজনদের প্রতি সমাবেদনা জ্ঞাপন করে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম, সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি হাবিবুল ইসলাম খোকা ও সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সুমন, বিয়ানীবাজার উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান, উদীচী সিলেটের সভাপতি কবি এ কে শেরাম ও সাধারণ সম্পাদক ডা. অভিজিৎ দাস জয়, যুব ইউনিয়ন সিলেটের সভাপতি খায়রুল হাছান ও সাধারন সম্পাদক বিএইচ আবীর, খেলাঘর সিলেট এর সভাপতি তাজুল ইসলাম বাঙালি ও সাধারণ সম্পাদক তপন চৌধুরী, ছাত্র ইউনিয়ন সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি সুশান্ত সজীব ও সাধারণ সম্পাদক দীপংকর দাশ গুপ্ত, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি স্বপন দেবনাথ ও সাধারণ সম্পাদক সূচিত্র গোপ সহ বিভিন্ন সংগঠনের নের্তৃবৃন্দ।
শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের পর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের জন্য বাদল করের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় চালিবন্দরস্থ মহাশম্মানঘাটে।
উল্লেখ্য, ১৯৪৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বাদল কর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হাই স্কুলে অধ্যয়কালেই ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জাড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে কমিনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং আজীবন পার্টির কাজেই নিজেকে নিবেদিত রাখেন। এছাড়া সাংস্কৃতিক অংগনেও ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। তিনি ছিলেন উদীচী সিলেটের প্রথম আহ্বায়ক।
তিনি তাঁর কাজের দক্ষতায় কমিনিস্ট পার্টি সিলেট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। স্বল্পভাষি এ মানুষটি পার্টির যে-কোনো কাজে অগ্রসর সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে সকলের প্রিয় ও আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন। উদীচী ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে আজীবন গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।
আপনার মন্তব্য