৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ২০:২৫
শেষ হতে চলা বছরে অন্যতম আলোচিত ছিলো রাগীব আলীর কারাদণ্ড। সিলেটের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি রাগীব আলী। নিজ অনুসারীদের কাছে তিনি 'দানবীর' হিসেবে পরিচিত। জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলায় ২০১৭ সালে রাগীব আলীকে কারাদণ্ড প্রদান করে আদালত।
কেবল রাগীব আলী নয়, তাঁর ছেলে, মেয়ে, মেয়ের জামাইকেও দণ্ড প্রদান করেন আদালত। ২৬ সেপ্টেম্বর জামিনের মাধ্যমে কারাগার থেকে মুক্তি পান রাগীব আলী ও তাঁর ছেলে আব্দুল হাই। প্রায় ১১ মাস কারভােগের সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তাঁরা।
হাজার কোটি টাকার দেবোত্তোর সম্পত্তি তারাপুর চা-বাগান আত্মসাতের জন্য জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি আদেশ তৈরির অভিযোগে ২০০৫ সালের ২ নভেম্বর সিলেট কোতোয়ালি থানায় মামলাটি করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)। এ মামলায় গত ২ ফেব্রুয়ারি সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম রায় দেন। রায়ে চারটি ধারায় তাদের ১৪ বছরের কারাদণ্ডাদেশ ও প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। সব সাজা একসঙ্গে চলবে বলে রায়ে উল্লেখ করায় কার্যত তাদের ছয় বছর কারাদণ্ড হয়েছে।
এই দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে ১৬ ফেব্রুয়ারি দণ্ডপ্রাপ্তরা মহানগর দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন। যা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
এরপর প্রতারণার মাধ্যমে তারাপুর চা বাগানের সম্পদ ধংসের আরকেটি মামলায় ৬ এপ্রিল রাগীব আলী ও তাঁর ছেলেকে ৭ বছরের কারাদন্ড দেন একই আদালত।
এর আগে ২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বর ভারতের করিমগঞ্জ ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে রাগীব আলী ও গত ১২ নভেম্বর ভারত থেকে জকিগঞ্জ এসে গ্রেপ্তার হন আবদুল হাই। বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাগীব আলী ও তার ছেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন।
ধনকুবের রাগীব আলীর বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে ‘মানবিক মুখোশ পরে অবৈধভাবে সম্পদ আত্মসাত’ বলে উল্লেখ করেছিলেন আদালত।
রাগীব আলীর উত্থান : সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার কামাল বাজার এলাকার তালেবপুর গ্রামের বাসিন্দা রাগীব আলী (৭৮) তরুণ বয়সেই যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সেখানেই অবস্থান করেন তিনি। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালেই প্রচুর সম্পদের অধিকারী হন রাগীব আলী।
ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের নিয়ে প্রকাশিত বার্ষিক সাময়িকী ‘হু’জ হু’র তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৬ সালে ১৮ বছর বয়সে লন্ডনে যান রাগীব আলী। সেখানে শেয়ার বাজার, বীমা, আবাসন ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা করে তিনি বিত্তশালী হন।
রাগীব আলীর ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, আশির দশকের গোঁড়ার দিকে দেশে ফিরে আসেন তিনি। শিল্পে বিনিয়োগে উদ্যোগী হন। এসময় সিলেটের মালনীছড়াসহ একাধিক চা বাগান ইজারা নেন রাগীব আলী। চা ছাড়াও শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংক, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে রাগীব আলীর।
তবে সিলেটে রাগীব আলী প্রথম আলোচনায় আসেন ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে। সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রাবাস ‘ক্রয় করে’ তোপের মুখে পড়েন রাগীব আলী। সিলেট নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র বন্দরবাজারে এক হিন্দু জমিদারের দান করা জমিতে এই ছাত্রাবাস নির্মাণ করেছিলো সরকারী পাইলট স্কুল।
’৮২-৮৩ সালের দিকে রাগীব আলী ‘জালিয়াতির মাধ্যমে’ এই ছাত্রাবাস কিনে নিয়েছেন এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সিলেটজুড়ে শুরু হয় ছাত্রাবাস রক্ষা আন্দোলন। ১৯৮৬ সালের দিকে রাগীব আলী এই ছাত্রাবাসের ভূমিতে গড়ে তোলেন ‘মধুবন’ নামে তাঁর নিজস্ব মালিকানার বিপণী বিতান।
নব্বই দশকের শুরু থেকেই রাগীব আলীর তারাপুর চা বাগান দখলের বিষয়টিও ছিলো সিলেটজুড়ে আলোচিত। এই দখলের কাহিনী লোকমুখে আলোচিত আসলেও তাঁর প্রতিপত্তি ও প্রমাণের অভাবে এনিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলতেন না অনেকে। তবে ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের এক রায়ে প্রমাণিত হয় রাগীব আলীর প্রতারণার বিষয়টি। এরপর দন্ডের মুখে পড়তে হয় নিজের মালিকানাধীন গণমাধ্যম ও নিজ অনুসারীদের মাধ্যমে ‘দানবীর’ আখ্যা পাওয়া এই ব্যবসায়ীকে।
আপনার মন্তব্য