০২ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৮:০৭
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির মধ্যে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে দেখতে দেখতে চলে গেলো একটি বছর। গেলো বছরটিতে গোলাপগঞ্জে ঘটে গেছে নানা ঘটনা, দুর্ঘটনা। ১২ মাসে আনুপাতিক হারে প্রতিমাসেই হত্যা, লাশ উদ্ধার, আত্মহত্যা, ধর্ষণ ও অস্বাভাবিক মৃত্যু ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০১৭ সালের বছর জুড়ে ঘটেছে ১৩টি হত্যাকাণ্ড, ৫টি আত্মহত্যা ও ২টি রহস্যজনক মৃত্যু ও ২টি বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এই বছরে মা বাবার হাতে প্রতিবন্ধী শিশু খুন, ছেলের হাতে মা খুন, ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, দেবরের হাতে ভাবি খুন, মাদ্রাসা ছাত্র হত্যা, সিএনজি অটোরিক্সা চালক হত্যা, তরুণ ব্যবসায়ী দিপু হত্যার ঘটনা বেশ আলোচিত ছিল। যৌতুক, পারিবারিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা কারণে এসব ঘটনার সূত্রপাত হয়।
পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ মাসের প্রথমে উপজেলা কিছুটা শান্ত থাকলে মাসে শেষে দেবর ভাবির পরকীয়ার বলী হন গৃহবধূ জনি রানী দাস। ২৮ জানুয়ারি উপজেলার আলমপুর গ্রামের রঙ্গেস দের স্ত্রী জনি রানী দাসকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয় জনির স্বামী রঙ্গেস দে ও তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী শিল্পী রানী দেব। এ ঘটনায় ৩০ জানুয়ারি নিহত গৃহবধুর পিতা সজল কান্তি দাস গোলাপগঞ্জ থানায় রঙ্গেস দে ও শিল্পী রানী দেবকে আসামি করে একটি মামলা (মামলা নং-১৯) দায়ের করেন। দেবর রঙ্গেস ও ভাবি শিল্পী রানীর পরকীয়া সম্পর্ক ধরে ফেলায় জনি রানী নামের এই গৃহবধূকে হত্যা করেছে বলে আদালতে কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করে।
ফেব্রুয়ারি মাসে ২টি বিষ ক্রিয়া আক্রান্ত করে হত্যা ও ১টি আত্মহত্যা এবং ১টি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা সহ একটি বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছিল। এ মাসে উপজেলা জুড়ে ডাকাত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ডাকাতরা খাবারে বিষাক্ত পদার্থ মিশিয়ে অচেতন করে সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়।
১৪ ফেব্রুয়ারি উপজেলার পৌর শহরের মৌলভীর পুল নামক এলাকায় একটি ভাড়াটে বাসায় রাতের খাবারে দেওয়া অজ্ঞাত ডাকাত চক্রের বিষাক্ত পদার্থে গোলাপগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী জুনেদ আহমদের মা নাজমা বেগম (৬৫) মৃত্যুবরণ করেন।
একইভাবে ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে উপজেলার পৌর এলাকার কদমতলীস্থ বাসায় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুশফিকুর রহমান লুকুছ (৬০) ডাকাত চক্রের দেওয়া খাবারের সাথে মিশানো বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় গোলাপগঞ্জ মডেল থানায় একটি মামলাও দায়ের করা হয়। এ দুটি ঘটনায় পুলিশ প্রথমে রহস্য উদঘাটন না করতে পারলেও পরে এই চক্রের তিন সদস্য সদস্যকে আটকের মাধ্যমে এর আসল তথ্য বের হয়ে আসে।
এ ডাকাত চক্রের ৩ জন সদস্যকে গোলাপগঞ্জ চৌমুহনী থেকে বিষ জাতীয় পদার্থ ও অস্ত্রসহ তাদের আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন গোলাপগঞ্জ উপজেলার ধারাবহর গ্রামের মৃত হিরা মিয়ার ছেলে জসিম উদ্দিন (৪০), আমকোনা গ্রামের মৃত আছদ্দর আলীর ছেলে আজিম উদ্দিন (৩০), নোয়াই দক্ষিণভাগ গ্রামের মৃত মতছির আলীর ছেলে সরফ উদ্দিন (৪০)। পরে তারা এই দুটি ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
২ ফেব্রুয়ারি রাতে গোলাপগঞ্জের লক্ষণাবন্দে মাজহারুল ইসলাম দিলু মিয়া (৩৫) নামে এক ব্যবসায়ীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সে উপজেলার লক্ষণাবন্দ ইউপির নোয়াই দক্ষিণভাগ মাজপাড়া গ্রামের মুহিবুর রহমান চান মিয়ার পুত্র। পরদিন সকালে পরিবারের লোকজন পুলিশকে দিলু আত্মহত্যা করেছে বলে খবর দিলে পুলিশ নিহতের ঘর থেকে নিচে নামানো অবস্থায় লাশ উদ্ধার করে। নিহতের গলায় আত্মহত্যার চিহ্ন থাকলেও মৃত্যুটি ছিল রহস্যজনক। নিহতের স্ত্রীর ছামিরা বেগম (২২) দাবি করেন, তার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে। এ ঘটনায় গোলাপগঞ্জ থানায় মামলা করতে চাইলে পুলিশ তাঁর অভিযোগ না নিলে সে আদালতে একটি মামলা দায়ের করে।
৭ ফেব্রুয়ারি প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পপি বেগম (১৭) নামে এক তরুণী আত্মহত্যা করে। আপন খালাতো ভাই লিটনকে বিয়ে না করতে পারায় অভিমানে এই তরুণী আত্মহনন করে। সে গোলাপগঞ্জ পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের ফুলবাড়ী পূর্বপাড়া গ্রামের হবিব আলীর মেয়ে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়।
১০ ফেব্রুয়ারি গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীতে সিএনজি অটোরিক্সা চালক ও টিকরবাড়ি গ্রামবাসী তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্ত্রসহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পরলে পুলিশ সহ প্রায় ১৫ জন আহত হন। পুলিশ ছত্রভঙ্গ করতে ১০ রাউন্ড রাবার বুলেট ও ১০ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ২৫টি সিএনজিও ভাঙচুর করা হয়।
এ বছরের মার্চ মাসে আলোচনায় ছিল ভারসাম্যহীন যুবক খুনের ঘটনা। ১১ মার্চ শনিবার ভাদেশ্বরের পূর্বভাগ নায়াগ্রাম এলাকার হারিছ আলীর পুত্র ভারসাম্যহীন তারেক আহমদ রহস্যজনক ভাবে খুন হন। মৃত্যুর পর তার আপন ভাই সাদেক আহমদ ও ছালেহ আহমদ সহ পরিবারের লোকজন তড়িঘড়ি করে লাশ দাফনের চেষ্টা করে। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ ঐ সময়ই নিহত তারেক আহমদের দুই সহোদর সাদেক আহমদ (৩৫) ও ছালেহ আহমদ (৩০) কে আটকের পর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তারা সরাসরি হত্যার দায় স্বীকার না করলেও পুলিশের ধারণা হয়তো সম্পত্তি আত্মসাতের লক্ষে তারেককে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গোলাপগঞ্জ মডেল থানার এসআই আতিকুর রহমান বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ৪/১৭। এতে নিহতের ভাই সাদেক আহমদ (৩৫) ও ছালেহ আহমদ (৩০) কে আসামি করা হয়।
এ বছরে সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছিল এপ্রিল মাসে। আপন সন্তানের হাতেই খুন হতে হয়েছিল মাকে। এ ঘটনা উপজেলা জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে।
১২ এপ্রিল এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের দক্ষিণ বারকোট এলাকায়। ওই দিন ভোরে মাদকাসক্ত পুত্র রুবেল আহমদ (২৫) তার আপন মা হাওয়ারুন্নেছা (৭৫) কে ধারালো বটি দিয়ে উপর্যুপরি কয়েকটি কুপ দিয়ে হত্যা করে। ঘটনার পর ঘাতক পুত্র পালিয়ে গেলেও পরে স্থানীয় জনতার সহযোগিতায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এ বছরের মে মাসে কোন আলোচিত ঘটনা না ঘটলেও জুন মাসেই সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল উপজেলা শরিফগঞ্জে। যে হত্যাকাণ্ড দেখে পুরো উপজেলাবাসী শিহরিত হয়ে উঠে। মানুষ হয়ে মানুষকে এভাবে খুন করতে পারে তা সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। ছুরতহাল রিপোর্টে দেখা যায়, ধারালো দা অথবা কুঠারের আঘাতে মাথা দ্বিখণ্ডিত, একটি পা হাটুর নিচ থেকে আলাদা হয়ে গেছে, দু হাতে ১০/১২টি মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কোমরে ধারালো অস্ত্র দ্বারা বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। লাশের অবস্থা দেখে ভয়ে লোকজন কাছে যেতে পারছে না। কোন মানুষ মানুষকে এভাবে কেটে টুকরো টুকরো করতে পারে তা অবিশ্বাস্য।
২৩ জুন শুক্রবার দুপুরে গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরিফগঞ্জ ইউনিয়নের কদুপুর গ্রামের রাস্তার পাশে ইমাম হোসনকে পূর্বশত্রুতার জেরে নৃশংসভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইমাম হোসেন কদুপুর গ্রামের মৃত আপ্তাব আলীর ছেলে।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই আলী হোসেন বাদী হয়ে গোলাপগঞ্জ মডেল থানায় মো. নূরুল হোসেনকে প্রধান আসামি করে ২৬ জনের নামে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর- ১০(৬) ১৭ইং। পরবর্তীতে আলোচিত এ হত্যা মামলাটি সিআইডি পুলিশের কাছে ন্যস্ত করা হয়। পুলিশ ঘটনার পর পরই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একই এলাকার আব্দুল ওয়াহিদের পুত্র রাজু আহমদ (৩২), আছকর আলীর পুত্র শাহ আলম (২০), আব্দুল খালিকের পুত্র মারজান আহমদ (২০) কে আটক করে। পরে প্রধান আসামি মো. নূরুল হোসেনকে (৪২) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত নূরুল হোসেন গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরিফগঞ্জ ইউনিয়নের কদুপুর গ্রামের আতর আলীর ছেলে।
এ বছরের জুলাই মাসে উপজেলায় তেমন কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটলেও আবারো পুরো উপজেলা অশান্ত হয়ে উঠে আগস্ট মাসে। এ মাসে আলোচিত ছিল শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা।
৫ আগস্ট উপজেলার বুধবারীবাজার ইউনিয়নের বনগাঁও গ্রামের মৃত মতিউর রহমানের ছেলে গৃহকর্তা কামরুল ইসলাম (২০) শিশু গৃহকর্মী খাদিজা বেগম (১০) কে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে আত্মহত্যার ঘটনা সাজিয়ে গোপনে দাফনের চেষ্টা করে। পরে পুলিশ খবর পেয়ে গৃহকর্তাকে আটক করে। নিহত খাদিজা বেগমের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার ভাটি তাহিরপুর গ্রামে। সে দিনমজুর আলী নূরের মেয়ে। অভাবের তাড়নায় প্রায় চার বছর আগে সুনামগঞ্জ থেকে এসে বনগাঁও গ্রামে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিনমজুরের কাজ করে দিনাতিপাত করে আসছিলেন আলী নূর।
১৪ আগস্ট ফুলবাড়ি গ্রামের বাসায় ভাড়াটে থাকা জরিনা বেগমের মেয়ে এক কিশোরী (১৪) কে দুর্বৃত্তরা নিজ ঘর থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে ২৪ দিন পর এই কিশোরীকে হেতিমগঞ্জ থেকে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ। এই কিশোরী জানায়, তাকে ৪/৫ জন যুবক অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে ঢাকার একটি হোটেলে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় কিশোরীর মা জরিনা বেগম বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-১৫/৩১-০৭-১৭) দায়ের করেন।
বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ২টি খুন ও ১টি আত্মহত্যা ও ১টি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ মাসে মাদ্রাসা ছাত্র নুরুল হত্যা, দেবরের হাতে ভাবি খুন বেশ আলোচিত ছিল।
১ সেপ্টেম্বর রাতে খুন হন গোলাপগঞ্জ ফুলবাড়ি আজিরিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী, লক্ষ্মীপাশা কোনাচর গ্রামের সুন্দর আলীর পুত্র নূরুল আলম (১৭)। পবিত্র ঈদ উল আযহার দিন খুনিরা তাকে খুন করে ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। সকালে স্থানীয় জনতা খবর দিলে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। এ ঘটনায় ১৬ বছরের তরুণীসহ ৬ জনকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় কোনাচর দিঘিরপার গ্রামের কাশেম আহমদ (৩০) নামের যুবককে। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে থানায় রিমান্ডে আনা হলে তার স্বীকারোক্তির প্রেক্ষিতে ১০ সেপ্টেম্বর (রোববার) দিবাগত রাতে তরুণীসহ ৬ জনকে আটক করে থানা পুলিশ। তারা হলেন ফুলবাড়ি ইউপির উত্তরপাড়া গ্রামের আব্দুল মন্নানের মেয়ে লিমা বেগম (১৬), ফুলবাড়ি পূর্বপাড়া গ্রামের আব্দুল কুদ্দুছের ছেলে শিপলু আহমদ (২৫), বাবুল আহমদ (২৪), ফুলবাড়ি ইউপির মিরাপাড়া গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে লুৎফুর রহমান (৩২), একই ইউপির টিকরপাড়া গ্রামের মোর্শেদ আহমদ (২৬) ও বাঘা ইউপির বাঘা দক্ষিণ গ্রামের মাতাব আহমদের ছেলে অপু আহমদ (২২)।
২ সেপ্টেম্বর শনিবার রহস্যজনকভাবে খুন হন উপজেলার লক্ষ্মীপাশা ইউপির নিমাদল গ্রামের আব্দুল কুদ্দুসের স্ত্রী এবং সাহেব বাজার উপজেলার চাঁনপুর গ্রামের মঈনুদ্দিনের মেয়ে পারভীন বেগম (২০)। ঘাতক স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করে লাশ খাটে শুইয়ে রেখে গলায় একটি কাপড় পেঁচিয়ে রাখে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে সে জানায় তার স্ত্রী ফ্যানের সাথে কাপড় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। বাঁচানোর জন্য তার লাশ নামিয়েছে সে। তার কথাবার্তায় পুলিশের সন্দেহ হলে পুলিশ তাকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হলে বিজ্ঞ আদালত তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর রোববার সকালে নিজ বাড়িতে রহস্যজনক ভাবে আত্মহত্যা করেন উপজেলার বুধবারীবাজার ইউপির বাণীগ্রাম গ্রামের জাহেদ আহমদের স্ত্রী ও জকিগঞ্জ পৌরসভার মাইজকান্দি গ্রামের মৃত পাকি মিয়ার মেয়ে রাবিয়া বেগম (৩২)। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মৃত্যুর রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। এ ঘটনায় পুলিশও কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।
২৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেলে ফুলবাড়ি ইউনিয়নের দড়া উত্তর পাড়া গ্রামের আসলম আলীর ছেলে শেখ মিয়ার স্ত্রী সাফিয়া বেগম (৩৫) খুন হন আপন দেবরের হাতে। পারিবারিক কলহের জের ধরে দেবর আনুর মিয়ার সাথে সাফিয়া বেগমের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আনুর লেহার রড দিয়ে সাফিয়াকে আঘাত করলে স্থানীয়রা আশংকাজনক অবস্থায় এই গৃহবধূকে হাসপাতালে নিলে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মামলার এজাহারভুক্ত ২নং আসামি মিনা বেগম (৩৫) ও ৩নং আসামি দিলারা বেগমকে (৩০) ৩ অক্টোবর সকালে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের সহায়তায় বড়লেখা থেকে তাদের আটক করা হয়।
এ বছরের অক্টোবর মাসে মা বাবার হাতে খুন হয় প্রতিবন্ধী শিশু আরিয়ান। এ হত্যাকাণ্ডটি উপজেলায় তোলপাড় সৃষ্টি করে। ১ অক্টোবর, উপজেলার শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের ইসলামপুরে আপন পিতা-মাতা নিজ প্রতিবন্ধী সন্তান আরিয়ানকে (২) খুন করে স্থানীয় বুরুদল নদীতে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় আরিয়ানের মামা হোসেন মিয়া বাদী হয়ে আরিয়ানের মা ও বাবাকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা (মামলা নং- ০১/১৭) দায়ের করেন। এ ঘটনায় আরিয়ানের ঘাতক মা রাজিয়া বেগমকে (৩০) পুলিশ ঘটনার দিন আটক করলেও পালিয়ে যায় ঘাতক পিতা বাছিত আহমদ (৩৫)। পরে ৩ অক্টোবর মঙ্গলবার রাতে শরিফগঞ্জের কালিকৃঞ্চপুর গ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
৬ অক্টোবর উপজেলার ফুলাবাড়ী বড় মোকাম সংলগ্ন গোরস্থানে দক্ষিণপাড়ার এক শিশুর লাশ দাফনের জন্য খবর খনন করাকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ি দক্ষিণপাড়া ও পূর্বপাড়ার লোকদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে থানার ওসি, পৌর মেয়রসহ অর্ধশতাধিক লোক আহত হন।
নভেম্বর মাসে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, সিএনজি অটোরিক্সা চালক হত্যাকাণ্ড, গৃহবধূ ও বৃদ্ধের আত্মহনন আলোচিত ছিল। ৫ নভেম্বর উপজেলার সদর ইউনিয়নের গোয়াসপুরে (কাঙালীবাড়ী) রাতে পারিবারিক কলহের জেরে আপন ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন হন। নিহত ব্যক্তি গোয়াসপুর গ্রামের মকবুল আলীর বড় ছেলে শিবুল আহমদ (২৭)। তিনি এক সন্তানের জনক ও সিএনজি চালক ছিলেন। এ সময় শিবুলের স্ত্রী আলিফা বেগম (২৩) গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় শিবুলের ছোট ভাই ঘাতক রিপন আহমদ (১৮) কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
একই দিনে (৫ নভেম্বর) দিবাগত রাতে উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নের দক্ষিণভাগের দক্ষিণ গাঁও গ্রামের গৃহবধূর কুহিনুর বেগম (৩৫) আত্মহত্যা করেন । মৃত গৃহবধূ ওই গ্রামের রহিম আলীর স্ত্রী। সে এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ঝিয়ে’র কাজ করতেন বলে জানা গেছে। এলাকাবাসীর ধারণা পারিবারিক অশান্তি আর অভাব অনটনের কারণে এ ঘটনাটি ঘটতে পারে।
এর পরদিন ৬ নভেম্বর দুপুরে বাঘা ইউনিয়নের খালপাড় এলাকায় মঈন উদ্দিন (৪৫) নামের এক বৃদ্ধ গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি ঐ এলাকার মনির উল্লাহর পুত্র বলে জানা গেছে। অজানা কারণে দুপুর ১২টায় নিজ ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
২১ নভেম্বর সিএনজি চালিত অটোরিক্সা চালক রোকন আহমদ গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলে তিন আর বাড়ি ফিরে আসেনি। এ ঘটনায় অটোরিক্সার মালিক লুকুছ মিয়া গোলাপগঞ্জ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১১২২) করেন। ২৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় উপজেলার ফুলবাড়ি ইউনিয়নের বৈটিকর ও এওলাটিকর এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে দুর্বৃত্তরা রোকন আহমদকে গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যা করে ফেলে যায়। তারা তার সাথে থাকা সিএনজি অটোরিক্সাটি ছিনতাই করে নিয়ে যায়। এ ঘটনার রহস্য এখনো উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ।
এ বছরে সর্বশেষ ২৪ ডিসেম্বর রাতে উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের দক্ষিণ রায়গড় গ্রামের সৌদি প্রবাসী ওবুদ মিয়ার একমাত্র পুত্র ও ঢাকাদক্ষিণ বাজারের ব্যবসায়ী তোফায়েল আহমদ দিপু (১৮) নামের এক তরুণ খুন হয়। গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করে মরদেহ বাড়ির পুকুর পাড়ে ফেলে রেখে যায়। পরদিন সকালে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহতের মা সালমা বেগম বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
সব মিলিয়ে ২০১৭ সালে গোলাপগঞ্জবাসীর জন্য তেমন সুসংবাদ না থাকলেও তাদের প্রত্যাশা ২০১৮ সাল সবার জন্য বয়ে আনবে অনাবিল, সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা।
আপনার মন্তব্য