২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৩:১০
মা লক্ষ্মীর কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে চার বছরের আম্বিয়াকে। আম্বিয়াকে তৈরি করা হবে কামাই রোজগারের মাধ্যম হিসেবে। পা ও গলায় দড়ি বাঁধা আম্বিয়া শিখছে মানুষের শেখানো বুলি। সাড়া না দিলে দেওয়া হচ্ছে কঠিন শাস্তি। তিন মাস চলবে এই ধারাবাহিক নির্যাতন।
আম্বিয়া চার বছর বয়সের একটি হাতি শাবকের নাম। আম্বিয়াকে দেওয়া হচ্ছে তিন মাসের প্রশিক্ষণ। আঞ্চলিক ভাষার এর নাম ”হাঁদানি”।
প্রাচীনকাল থেকেই পোষা হাতিকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করছে মানুষ। পাহাড় থেকে গাছ টেনে নামানো, সার্কাসে খেলা দেখানো, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খেলা ও শারীরিক কসরত দেখানোর জন্য হাতিশাবককে দিতে হয় প্রশিক্ষণ।
হাতির ”মাহুত” (রাখাল) যখন সালাম দিতে বলে হাতি সালাম দেয়, টাকা নিতে বললে শুঁড় তুলে ইশারা করে রাস্তা ঘাটে টাকা চায়, সার্কাসে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ভাব প্রকাশ করে। এমনি অজস্র কসরত দেখায় হাতি, যা মানুষকে আনন্দ দেয়, আগ্রহ বাড়ায়। কিন্তু হাতির এ সকল কর্মকাণ্ডের পেছনে কাজ করে এক বর্বর প্রশিক্ষণ, যা যে কোন মানুষকে আবেগ তাড়িত করবে।
মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় ৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া তিন মাসের এই প্রশিক্ষণ চলবে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। তিন মাস আম্বিয়াকে যেতে হবে প্রশিক্ষণ নামের নিষ্ঠুর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে।
প্রশিক্ষক দলের প্রধান আব্দুল মান্নান আসাম থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন দেশে কাজ করছেন। তিনি জানালেন, এটাই প্রশিক্ষণের নিয়ম।
মা লক্ষ্মীকে কেনো আলাদা করে বেধে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে কারণ হিসেবে বললেন, মানুষের মত হাতির সন্তানের প্রতি মমতা আছে, আবেগ অনুভূতি আছে। প্রশিক্ষণের সময় যে নির্যাতন করা হয়, মা লক্ষ্মী কাছে থাকলে তা সইতে না পেরে মানুষের উপর আক্রমণ করতে পারে। এতে প্রাণহানিসহ বড় ধরণের বিপদ হতে পারে, তাই মা হাতিকে আলাদা করে রাখা হয়েছে।
নিষ্ঠুরতার প্রথম ধাপে মায়ের থেকে আলাদা করা হয়। এর পরেই শুরু হয় বর্বরতার চরম মাত্রা।
চারদিকে উৎসাহী মানুষের মধ্যে মাঠে চলছে আম্বিয়ার প্রশিক্ষণ। মাঠের মধ্যে গাছের গুড়ির সাথে আম্বিয়াকে বেঁধে সামনে-পেছনে, পা ও গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে বড় বড় দড়ি।
প্রশিক্ষণের প্রাথমিক পর্যায়ে হাতি শাবককে মালিকের ডাকে সাড়া দেওয়ার উপায় শিখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একেকটা পরিচিত শব্দ করছেন আর তাতে সাড়া না দিলে শক্ত বাঁশের লাঠি দিয়ে পেটানো হচ্ছে আম্বিয়াকে। আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করা হচ্ছে, আম্বিয়া চেষ্টা করছে বাধন মুক্ত হতে, কিন্তু নিষ্ঠুর মানুষের বুদ্ধির কাছে হেরে গিয়ে শুঁড় তুলে কাতরানো ছাড়া আর কোন উপায় নেই আম্বিয়ার।
একপর্যায়ে কাঠের গুড়ি থেকে ছাড়িয়ে আম্বিয়াকে মাঠের চারপাশে ঘুরানো হয় বেশ কিছুক্ষণ। এটাই নাকি হাতির সাথে মানুষের আন্তরিক সম্পর্ক গঠনে কাজে আসে। এভাবে বেধে রেখেই আবার চলে আম্বিয়ার চিকিৎসা বিভিন্ন লতা পাতার মালিশ দেওয়া হয় । ভাল হয়ে গেলে আবার নির্যাতন চলে। উপস্থিত কৌতূহলী প্রতিটি মানুষের মনে দাগ কাটে আম্বিয়ার চিৎকার।
দিনের অর্ধেক সময় বেঁধে রেখে বাকি সময় মাঠ ঘুরিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বিভিন্ন বিষয় ও মেয়াদী প্রশিক্ষণের এটা প্রাথমিক কোর্স। এই সময়ে হাতি শাবককে কলা গাছ, মিষ্টান্ন, বিভিন্ন ভালো খাবারও দিতে হয়।
আম্বিয়াকে যখন নিষ্ঠুর নির্যাতনের মাধ্যমে রোজগারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে, আম্বিয়ার মা লক্ষ্মী তখন পাশের হাড়ারগজ সংরক্ষিত বনে মালিকের আয় রোজগারের কাজে ব্যস্ত।
শুধু আম্বিয়া নয়, প্রতি বছর শীত মৌসুমে এই এলাকায় চার-পাঁচটা হাতিশাবককে একই নিয়মে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে।
সহকারী প্রশিক্ষক আব্দুল মতিন জানালেন, দুষ্টু বাচ্চাকে স্কুলের ম্যাডামরা যে ভাবে শাস্তি দিয়ে লেখা পড়ায় ভাল করে তুলে, তারাও তেমনই করছেন।
প্রশিক্ষণের এক পর্যায়ে সময় জ্ঞান শেখানোর জন্য তাকে মুক্ত করে ঘুরতে দেওয়া হবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। ঠিক সময়ে যদি সে না ফিরে আসে তাহলে এই রকম আরও শাস্তি দেওয়া হবে।
হাতির মালিক শাহাব উদ্দিন জানালেন, বাংলাদেশে এটা ছাড়া ভিন্ন কোন পদ্ধতি নেই। আরও ভালো কোন পদ্ধতি থাকলে তারা সেটাই গ্রহণ করবেন। থাইল্যান্ড ভারত সহ বিভিন্ন যায়গায় ঘুরে তিনি এই নিয়মেই প্রশিক্ষণ দেখেছেন।
প্রাণী গবেষক তানিয়া খান জানান, কোন প্রাণির উপর এ ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ করা অপরাধ, হাতি প্রশিক্ষণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দে জানান, পোষা হাতিকে প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার কিন্তু প্রশিক্ষণকালে তাকে নির্যাতন করা যাবে না। এ ব্যাপারে প্রশিক্ষক ও হাতির মালিকদের সতর্ক করা হবে।
আপনার মন্তব্য