COVID-19
CORONAVIRUS
OUTBREAK

Bangladesh

Worldwide

164

Confirmed Cases

17

Deaths

33

Recovered

1,364,737

Cases

76,482

Deaths

293,879

Recovered

Source : IEDCR

Source : worldometers.info

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৮ ফেব্রুয়ারি , ২০২০ ০১:৪৩

সিলেটে বনের জমির এক তৃতীয়াংশই বেদখলে

দখলদারদের কাছ থেকে বনের জমি উদ্ধারের পর তদারকির অভাবে তা আবার দখল হয়ে যায়। তাই জমি উদ্ধারের পর তা খালি না রেখে মুর্তা বাগান করার উদ্যোগ নেন বনবিভাগে। এই উদ্যোগে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার নিয়াগুল হাওর এলাকার সংরক্ষিত বন ভূমির লক্ষ্মীনগর বিটের ৭৫ হেক্টর ভূমি উদ্ধার করে মুর্তা বাগান করা হয়েছিলো। তবে গত ১ ডিসেম্বর মুর্তা গাছ কেটে এই জমি আবার দখল করে নেয় স্থানীয় কিছু লোক। সেদিন দখল ঠেকাতে গিয়ে দখলদারদের হামলায় বনকর্মীরাও আহত হন।

সিলেটে এমন ঘটনা চলছে অহরহই। এখানে বনের জমি দখল চলছে দেদারছে। লক্ষ্মীনগরে দখল ঠেকাতে বনকর্মীরা বাধা দিলেও বেশিরভাগক্ষেত্রেই প্রতিরোধ ছাড়াই জমি দখল করে নেয় প্রভাবশালীরা।

দেশের অন্যতম বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল। লাউয়াছড়ায়ও দখল ঠেকানো যায়নি। বনের জমি দখল করে পান চাষ, কৃষিকাজের পাশাপাশি বসতবাড়িও গড়ে তোলা হচ্ছে। এমনকি লাউয়াছড়া বনের লাউয়াছড়া বিটের জমি দখল করে গড়ে ওঠেছে বাগমারা নামে পুরো একটি গ্রাম।

বনবিভাগের হিসেবেই, সিলেটে বনের জমির এক তৃতীয়াংশই বেদখলে রয়েছে। তবে স্থানীয়দের হিসেবে, বেদখল হওয়া জমির পরিমাণ আরও বেশি।

প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় ভৌগলিক অবস্থানের এক-চতুর্থাংশ বন থাকা আবশ্যক বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করলেও বনবিভাগের হিসেবে, সিলেটে বনের পরিমাণ মোট ভূমির ৯ থেকে ১০ শতাংশের উপরে নয়।

বনবিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বনের ভূমি জবরদখল হয়ে যাওয়া এখানকার অন্যতম প্রধান সমস্যা। সংশ্লিষ্টদের হিসেবে, দখলীয় ভূমির প্রায় ৩০ হাজার একরের উপর আদালতে মামলা রয়েছে। কোনো মামলা দীর্ঘ ২০-২২ বছর ধরে চলছে।

কাগজে কলমে সিলেটে বন বিভাগের মোট জমির পরিমাণ ১লক্ষ ৫৪ হাজার ৭১৪ একর। এরমধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার একরই বেদখল হয়ে আছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। বনের জমি সবচেয়ে বেশি বেদখল হয়েছে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায়। এ উপজেলার ২০ হাজার ১৭৪ একর জমি বেদখলে রয়েছে।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে সংরক্ষিত বনাঞ্চল (২০ ধারা) রয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৯৪৩.৫ একর। আর প্রস্তাবিত বনভূমি (৪ধারা) রয়েছে ৪২ হাজার ৭৭০.৭৬ একর। প্রস্তাবিত বনভূমি থাকে জেলা প্রশাসকের খতিয়ানে। বন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনেক সময়ে বনবিভাগের সাথে আলোচনা না করেই প্রস্তাবিত বনের জমি ইজারা দিয়ে দিন।

একাধিক বন কর্মকর্তা জানান, ’৬০ এর দশকে প্রস্তাবিত বনভূমি হিসেবে জমি চিহ্নিত করার সরকার। নিয়ম অনুযায়ী, জেলা সার্ভেয়ার হিসেবে জেলা প্রশাসক যাচাই-বাছাই ও শুনানি শেষে এসব জমিকে পর্যায়ক্রমে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার কথা। কিন্তু আজ পর্যন্ত ৪ ধারার কোনো জমিই সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষিত হয়নি। উল্টো এসব জমির ইজারা দেওয়া হচ্ছে।

তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নাসিরউল্লাহ খান বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রস্তাবিত বনের কোনো জমি ইজারা দেওয়া হয়নি। কিংবা আগেও এরকম জমি ইজারা দেওয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যদি এরকম হয়ে থাকে তাহলে বনবিভাগ আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিতে পারে। আমরা ব্যবস্থা নেবো।

তবে, সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত বনভূমির চাইতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমিই সবচেয়ে বেশি বেদখল হয়েছে।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বেদখল হওয়া ভূমি উদ্ধারে বিভিন্ন সময় বন বিভাগ অভিযান চালালেও তদারকির অভাবে তা কিছুদিন পর আবার বেদখল হয়ে পড়ে। তবে বেদখল হওয়া কিছু ভ’মি নিয়ে মামলা চলছে ও কিছু ভূমি মানবিক কারণে উদ্ধার করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বন কর্মকর্তারা।

সিলেট বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিভাগের বাহুবল, নবীগঞ্জ, চুনারুঘাট, মাধবপুর, হবিগঞ্জ সদর, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার সদর, কুলাউড়া, জুরী, বড়লেখা, ছাতক, দোয়ারাবাজার, ধর্মপাশা তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ সদর, সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট উপজেলায় থাকা বনবিভাগের বেশিরভাগ ভূমিই অবৈধ দখলদারদের দখলে রয়েছে। দখলীয় ভূমির গাছপালা নিধন, শ্রেণি পরিবর্তনসহ কোথাও মাটি কেটে কিংবা ভরাট করে ভূমির অবস্থার পরিবর্তনও করে ফেলেছে দখলদাররা।

বনের জমি বেদখল হওয়া প্রসঙ্গে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এসএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, লোকবল সঙ্কটের কারণে বনের জমি সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়া সম্ভব হয় না। এই সুযোগে অনেকে দখল করে ফেলে। এরপর আমরা উদ্ধারে গেলে তারা আদালতে চলে যায়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করা যায় না। তারপরও আমরা প্রায়ই উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে জমি উদ্ধার করি। সাম্প্রতিক সময়ে বনের বেশকিছু জমি উদ্ধার করে আমরা মুর্তা চাষ করেছি।

মানবিক কারণেও অনেকক্ষেত্রে বনের জমি উদ্ধার করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, মৌলভীবাজারের অনেক এলাকায় খাসিয়াসহ কয়েকটি গোষ্ঠীর দখলে বনের বিশালসংখ্যক জমি রয়েছে। এসব জমিতে তারা বাড়িঘর নির্মাণ করে আছেন। কিন্তু মানবিক ও পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে তাদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হয় না।

তবে বন কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লাউয়াছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা ও খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং বলেন, আমরা এখনকার আদি বাসিন্দা। ফরেস্ট ভিলেজার হিসেবে আমরা যুগ যুগ ধরেই বনের জমিতে আছি। বন ও বন্যপ্রাণির কোনো ক্ষতি না করে বরং তা রক্ষায় কাজ করছি আমরা। অথচ এই বনের ভেতরেই অনেক বাঙালি বাড়িঘর নির্মাণ করেছেন। চাষবাস করছেন। বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই বনের জমি দখল করেছেন তারা।

সাজু বলেন, অন্য দখলদারদের ব্যাপারে বনবিভাগ উদাসীন থাকলেও তারা আমাদের ব্যাপারে বেশ তৎপর। বনবিভাগের আপত্তির কারণে এখানকার কোনো খাসিয়াপুঞ্জিতে এখনও বিদ্যুৎ আসেনি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত