১৪ মে, ২০২০ ১৩:১৩
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওরে বাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে।
মাঠজুড়ে ছোট ছোট গাছে সবুজ পাতার সমারোহে প্রখর রোদের মধ্যেই বাদাঘাট-উত্তর বড়দল সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে উপজেলার শিমুল তলা-গইরারাজ গ্রামের কৃষক মো. আব্দুল মতিনের জমিতে বাদাম তুলতে নেমে পড়েছে মানুষজন। কাছে গিয়ে দেখা যায়, উৎসবমুখর পরিবেশে শিশু, নারী ও পুরুষসহ প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ বাদাম তুলছেন। কেউ বাদামের গাছ তুলছেন, কেউ আবার গাছ থেকে বাদাম ছাড়িয়ে রাখছেন।
এ সময় সময় কথা হয় শিমুলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণিতে পড়ুয়া হাবিবা বেগমের (১২) সাথে। সে জানায়, স্কুল এখন বন্ধ। জমির মালিক তার আত্মীয়। তাই চলে এসেছে বাদাম তুলতে। আর প্রতি বছর গ্রামের লোকজন এভাবেই দল বেঁধে নারী-পুরুষরা কৃষকদের বাদাম তুলে দেন।
বিজ্ঞাপন
তবে বিনা পারিশ্রমিকে না। সবাই মিলে যে পরিমাণ বাদাম তুলবে তা জমিয়ে তাকে ১০টি ভাগ করে নয় ভাগ কৃষকের আর এক ভাগ যারা তুলবে তাদের। এতে করে যারা বাদাম তুলছে সারাদিন ৪-৫শ টাকার বাদাম পেয়ে যায়। আবার কোনও কোনও দিন আরও বেশী। এতে করে লাভবান হয় তারা। অনেকেই আবার শখের বসে এসেছেন। আবার অনেকে নিজেরা খাওয়ায় জন্য বাদাম তুলছেন।
হাবিবার পাশেই ছাতা টানিয়ে দুটি শিশু নিয়ে বাদাম তুলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন রতনা বেগম (২৫)। তিনি জানান, বাদাম তুলায় এসেছেন বাড়তি আয়ের জন্য। কারণ বসে বসে জমি থেকে বাদামের গাছ তুলে বাদাম আলাদা করে দিলেই হয়। এই কাজটি করে সংসারে বাড়তি আয় যোগ করা যায়। রমজান মাসে সময়ও ভালো কাটে।
প্রখর রোদে বাচ্চাদের সাথে নিয়ে এসেছেন কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কি করব বাচ্চারা বাড়িতে থাকতে চায় না। তাই সাথে চলে এসেছে।
শুধু রতনা বেগমেই না বাদাম তুলতে এসেছেন হাবিবা, রুজিনা বেগম (২০), তাছলিমা বেগম (৩৬) সহ অনেকেই।
পাশেই জমির মালিক উত্তর বড়দল ইউনিয়ন শিমুলতলা গইরারাজ গ্রামের কৃষক মো. আব্দুল মতিন। নিজ জমিতে বাদাম তুলছেন আর দেখাশোনাও করছেন।
তিনি জানান, এবার ৫ কিয়ার জমিতে বাদাম চাষ করেছেন। খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। প্রতি কিয়ারে ৬-৭ মন বা তার চেয়ে বেশি হতে পারে। আর প্রতি মন বাদামের বাজার মূল্য ২৫শ থেকে তিন হাজার টাকা। সম্প্রতি করোনার সংক্রমণ রোধে দেশজুড়ে লকডাউনের কারণে বাদাম কেনার জন্য বাইরে থেকে কোনো পাইকার না আসায় তার মতো অনেক কৃষক অনেকটা বাধ্য হয়েই বাড়িতে আলাদা গোলা তৈরি করে বাদাম সংরক্ষণ করবেন। লাভ কেমন হবে তা এখনই বলতে পারছি না। বাজারদর উঠানামা করে।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, চলতি বছর উপজেলার বাদাঘাট, দক্ষিণ বড়দল, শ্রীপুর উত্তর, বড়দল উত্তর, বালিজুড়ি, তাহিরপুর সদর ইউনিয়নসহ ছয়টি ইউনিয়নে ১২৫০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ করা হয়েছে। আর বেশি চাষ হয়েছে বাদাঘাট আর উত্তর বড়দল ইউনিয়ন। আর বাদাঘাট ও বালিজুড়ী ইউনিয়নে বাদামের দুটি প্রদর্শন প্লট আছে কৃষি অফিসের। বাদামের ফলনও গত বছরের তুলনায় এবার ভালো।
কৃষকরা জানান,বাদামের বাম্পার ফলন হলেও করোনা সংক্রমণ রোধে দেশজুড়ে লকডাউন চলায় পরিবহন বন্ধ থাকায় হাসি নেই কৃষকের মুখে। এ কারণে বাদাম বিক্রি করতে পারছেন না কৃষক। ফলে বাদাম সংরক্ষণের জন্য আলাদাভাবে ব্যবস্থা করতে গিয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আর আগে জমি থেকে বাদাম উত্তোলন করার পরপরই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে জমি থেকেই কিনে নিয়ে যেত। এবার তা আর হচ্ছে না।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসান-উদ-দৌলা জানান, এ বছর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টিতেই বাদামের ফলন ভালো হয়েছে। এখন উৎসবমুখর পরিবেশে কৃষকরা বাদাম তুলা আর শুকানো নিয়ে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। করোনার প্রভাবে কৃষকরা বাদাম বিক্রি করতে পারছেন না। তবে করোনার সমস্যা উন্নতির সাথে সাথে কৃষকরাও তাদের কষ্টে ফলানো বাদামের দাম পাবে।
আপনার মন্তব্য