সিলেটটুডে ডেস্ক

১০ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:১৩

শিল্পকলায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে দুর্বৃত্তের কালি, পরিস্কারে এক রিকশাচালক

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লেপে দিয়েছিল কিছু দুর্বৃত্ত। পরে পুলিশ তাদের নিবৃত্ত করে। এই ঘটনায় পুলিশ নারীসহ ৪ জনকে আটক করেছে বলে জানা গেছে।

শনিবার (১০ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তাদের আটক করে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিকে, রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়ার পর এক যুবক পরম মমতায় সেই কালি মুছে দেওয়ার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে একাধিক সাংবাদিক সামাজিক মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে রিকশাচালক বলে পরিচয় দিয়েছেন।

সাংবাদিক জ. ই. মামুন ফেসবুকে কালি মুছে দেওয়ার ছবি শেয়ার করে লিখেন, সাবাশ বাংলাদেশ! সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে কথিত জুলাই যোদ্ধাদের মাখানো কালি ধুয়ে মুছে সাফ করে দেন একজন সাধারণ রিকশাচালক।

কারানির্যাতিত সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না ফেসবুকে লিখেন, কথিত জুলাই যোদ্ধারা রবিঠাকুরের ছবিতে চুনকালি দিতে গিয়ে আটক হয়। আর একজন রিকশাচালক সেই কালি মুছে দেন পরম যত্নে। টোকাইদের জ্ঞানের পরিধি বুঝেছেন তো?

রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি ও এই ঘটনায় কয়েকজনকে আটকের প্রসঙ্গে কারানির্যাতিত সাংবাদিক আনিস আলমগীর ফেসবুকে লিখেন, এক-দুইজন টোকাইকে আটক করে কি 'ঘৃণার সংস্কৃতি' দূর করা হচ্ছে! হাস্যকর! আগে জঙ্গি টোকাইদের মব সংস্কৃতি বন্ধ করেন। ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে যে কালচারাল দেউলিয়াপনা আর ঢালাও বিদ্বেষ চর্চার উৎসব শুরু হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়া কেবল তার একটা ছোট ট্রেলার মাত্র। শিল্পকলার দেয়ালে চুনকাম করে কিংবা পুলিশ দিয়ে দু-একজনকে হাজতে পুরে এই বিদ্বেষ ঢাকা যাবে? মোটেও না।

তিনি আরও বলেন, আসল সমস্যা তো দেয়ালের কালিতে না, সমস্যা সমাজের রগে রগে ঢুকে যাওয়া ঘৃণার ভাইরাসে! যখন অসাম্প্রদায়িকতা আর মুক্ত চিন্তার জায়গাগুলোকে প্রতিদিন এভাবে সংকুচিত করা হয়, তখন এ ধরনের ঘটনাই স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। হাতকড়া পরিয়ে অপরাধী ধরা যায়, কিন্তু মনের ভেতরের এই অসুস্থ সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ঠেকানো যায় না। বিচার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সুস্থ চিন্তার প্র্যাকটিস না ফিরলে, আজ রবীন্দ্রনগরে কাল হয়তো পুরো শিল্প-সংস্কৃতিই কালির নিচে ঢাকা পড়বে!

সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি ফেসবুকে লিখেন, ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। লালবদররা বিশ্বকবির গ্রাফিতিতে কালি মেখেছিল! আর পরম যত্নে সেই কালিমা মোচন করছেন এক রিকশাওয়ালা।

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সুদীপ্ত বিশ্বাস বিভু ফেসবুকে লিখেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি থেকে কালি মোছা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত কোনো ছাত্র এই কাজে এগিয়ে আসেনি, কোনো রাবিন্দ্রীকও যাননি, সরকারও করেনি। রবিঠাকুরের প্রতিকৃতি থেকে কালি মুছেছেন এক অজ্ঞাতকুলশীল দিনমজুর। জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন একজন সাধারণ সহজ মানুষ। রবিঠাকুরকে বাঁচিয়ে রাখবেন ইনারাই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষিত সমাজের অন্তরে সাম্প্রদায়িকতার যে কালি রয়ে গেছে তা মোছা না গেলে রবিঠাকুর এইভাবে বার বার আক্রান্ত হবেন, আর আক্রান্ত হবে আমাদের জাতিসত্তার ভবিষ্যৎ। 

প্রসঙ্গত, শিল্পকলা একাডেমির সামনের ওই দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়সহ উপমহাদেশের বিভিন্ন গুণীজনের প্রতিকৃতি আঁকা ছিল। আজ শনিবার দুপুরে সেখানে এক নারী ও তার সহযোগীরা রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালো কালি লেপে দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ঘটনার কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারী ব্রাশ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে কালি দিচ্ছেন। এসময় শাহবাগ থানার পুলিশ তাদের আটক করে পুলিশের ভ্যানে তোলে। আটকের সময় ওই নারী এবং তার সহযোগীরা ‘ভারতীয় আগ্রাসন’ বিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

গণমাধ্যমের সামনে ওই নারী প্রাথমিকভাবে দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন ‘কাঙ্গালদের আবার কিসের শিক্ষা’। রবীন্দ্রনাথকে ‘বাংলাদেশের বিরুদ্ধে’ আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদস্বরূপ তিনি ছবিতে কালি দিয়েছেন বলে জানান। তবে পরবর্তীতে সাংবাদিকদের জেরার মুখে ওই নারী নিজের অবস্থান পাল্টান। তিনি দাবি করেন, তিনি অসুস্থ (জ্বরে আক্রান্ত) এবং তাকে কেবল একটি ‘সাধারণ প্রতিবাদ কর্মসূচির’ কথা বলে এখানে আনা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেয়ার বিষয়টি তিনি আগে থেকে জানতেন না। জানলে তিনি আসতেন না। এছাড়া আটকের সময় এক পুরুষ পুলিশ সদস্য তাকে ধাক্কা দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এই ঘটনায় আয়াশ নামের এক যুবককেও আটক করে পুলিশ।

শাহবাগ থানার ডিউটি অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল খালেক বলেন, ঘটনাস্থল থেকে আয়াশসহ মোট তিন যুবক ও এক নারীকে আটক করা হয়েছে। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তাদের থানায় নেওয়া হয়। আটকদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে— সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়টি নিশ্চিত নয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত