COVID-19
CORONAVIRUS
OUTBREAK

Bangladesh

Worldwide

49

Confirmed Cases,
Bangladesh

05

Deaths in
Bangladesh

19

Total
Recovered

768,363

Worldwide
Cases

36,912

Deaths
Worldwide

160,157

Total
Recovered

Source : IEDCR

Source : worldometers.info

উজ্জ্বল মেহেদী

১৬ ফেব্রুয়ারি , ২০২০ ১৭:৫৭

ডা. মো. হারিছ উদ্দিন: একদিন, পাতা ঝরার দিন

স্কেচ: কুমার অনিক কুন্ডু

অবসরে আরও ব্যস্ত ডাক্তার তিনি। রোগী-ওষুধ-রোগ নিয়ে যাপিত ব্যস্ততা। তাঁর বাসার পাশেই রোগী দেখার চেম্বার। আমি চেম্বারে গেলাম। রোগীরা চেম্বারে এসে যদি তাঁকে না পায়, এ জন্য বাসায় তিনি গেলেন না। আমরা মুখোমুখি, রোগী-ডাক্তারের মতো। কথা বলছি, কথার মাঝখানে রোগী আসছে। রোগীদেরও ট্রিটমেন্ট দিচ্ছেন।

প্রায় দেড় দশককাল আগের কথা। এভাবেই প্রথম সাক্ষাৎ ছিল ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা ডা. মো. হারিছ উদ্দিনের সঙ্গে। কথা বলার বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে টানা সাত মাস সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট সাব-সেক্টরে চিকিৎসক ছিলেন। আমার রিপোর্ট করার বিষয় আমিই নির্ধারণ করেছিলাম। ‘একাত্তরের ডাক্তার’। কিন্তু একাত্তরের ডাক্তারের তথ্যতালাশে সামনে এলো আরেক উপাখ্যান। তখন ফেব্রুয়ারি মাস, পাতা ঝরার দিন। আমি সেই উপাখ্যান এক লহমায় লুফে নিলাম। ছোট্ট একটি রিপোর্ট করি প্রথম আলোয়। পাদপ্রদীপের আলো পড়ল কি না জানি না। তবে মনে মনে তৃপ্ত ছিলাম। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, একজন মানুষের ছাত্রজীবন শেষ করে কর্মজীবন শুরুর সময়ের প্রোজ্জ্বল এক কাহিনী গণমাধ্যমে প্রথম প্রকাশ পেল।

স্মৃতি বিস্মৃত হয়। আবার যত দিন যায় স্মৃতি প্রখরও হয়। এটি টের পেলাম আবারও। দশক দেড়েক আগের তাঁর বর্ণনা শুনে যে রিপোর্ট করেছিলাম, ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে সেই রিপোর্টের কপি পেলাম। স্মৃতি আরও প্রখর। খুঁজতে গিয়ে সেই নোটবুকটাও পেয়ে গেলাম। এবার আর কোনো কিছুই অস্পষ্ট নয়। ভাষাসংগ্রামীদের সম্মাননা জানানোর এই আয়োজকেরা যখন ডা. মো. হারিছ উদ্দিনকে নিয়ে কিছু লেখার তাগাদা দিলেন, আমি আর না করলাম না। সানন্দেই রাজি। লিখছি, মনে হচ্ছে প্রত্যক্ষ করা কোনো ঘটনার বর্ণনা করছি।

‘জুতায় গোবর না লাগলে আমিও শহীদ হতাম’। প্রথম আলোয় ২০০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ হওয়া সেই রিপোর্টের শিরোনাম। ‘...একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণ থেকে মিছিল বের হয়। আমি ছিলাম একেবারে সামনে। হঠাৎ জুতায় গোবর লেগে যায়। পেছনে গিয়ে তা পরিষ্কার করি। তখনই গুলির শব্দ। সামনের কাতারে থাকা রফিক ঘটনাস্থলেই মারা গেলেন। ...প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমার কানে সেই গুলির শব্দ বাজে। জুতায় গোবর না লাগলে আমিও নির্ঘাত শহীদ হতাম...।’

স্মৃতি হাতড়িয়ে এভাবেই বলেছিলেন ডা. মো. হারিছ উদ্দিন। রিপোর্টেও কথাগুলো এভাবে ছাপা হয়েছে। তাঁর কথা উদ্ধৃত উপজীব্য রিপোর্ট। ছোট ছোট কথা, মূল্যবান ছিল সব কথা। আরও মূল্য ছিল এ জন্য যে, মূলধারার কোনো গণমাধ্যমে ডা. মো. হারিছ উদ্দিনের জবানীতে সেই সব কথা প্রথম প্রকাশ হওয়া। তাঁকে যাঁরা কাছ থেকে চেনেন বা জানেন, এ কথার মর্ম তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন। কারণ তিনি প্রচারবিমূখ ছিলেন। নিজেকে নিয়ে নিজে প্রকাশ করতে চাইতেন না।

‘একাত্তরের ডাক্তার’ সন্ধান হৃৎকলমের টান থেকেই। সেটা পারিবারিক, একান্ত নিজেদের। সুনামগঞ্জ থেকে সিলেটে যখন কর্মস্থল, তখন সিলেট নগরীর বুকে থাকা হাসপাতালের নামকরণ আবার ফেরানো হয়। একাত্তরের এক ‘এপ্রিল ফুল’ হয়ে আছে সিলেটের ঘটনাটি। সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শামসুদ্দিন আহমদকে চিকিৎসারত অবস্থায় ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের সামনে দিয়ে রোজ যাওয়া-আসা, আর শহীদ মিনারের পাশে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ দেখলেই মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে চিকিৎসকদের কথা, একাত্তরের ডাক্তার প্রসঙ্গ।

ডা. মো. হারিছ উদ্দিনের সঙ্গে সেই সাক্ষাতের শুরুতে জানতে চেয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সময়ে টেকেরঘাটে তাঁর চিকিৎসা সেবার কথা। নিজের কথা বলছিলেন না তিনি। কথায় কথায় দীর্ঘশ্বাস ছিল একজন শহীদ সিরাজুল ইসলামকে নিয়ে। তাঁকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপ কাতরতা। কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস ছিলেন সিরাজুল। সম্মুখ যুদ্ধে আহত হয়ে টেকেরঘাটে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

‘সিরাজুলের কথা বড় মনে পড়ে আমার। ...সে অন্যের জন্য প্রায়ই ওষুধপত্র এনে দিত। কিন্তু সম্মুখ সমরে সে যখন গুরুতর আহত হলো, তাঁর জন্য ওষুধ পাওয়া গেল না। সিরাজুল শহীদ হলো...!’ বলেছিলেন ডা. মো. হারিছ উদ্দিন। অস্ফুট স্বরে দীর্ঘশ্বাস ভরা কথা। যেন পাতা ঝরার শব্দের মতো আমাকে বিদ্ধ করছিল। ঘুরেফিরে সিরাজুলের খবর নেওয়ার কথাও বলেছিলেন সেদিন। টেকেরঘাটে তাঁর সমাধির খোঁজ করার কথা, তাঁকে নিয়ে রিপোর্ট করার অনুরোধও ছিল।

আমি কথা রেখেছিলাম। তখন দূরযাত্রার টেকেরঘাট ঘুরে এসে একটি রিপোর্ট করেছিলাম। কিন্তু ‘একাত্তরের ডাক্তার’ বিষয় নির্ধারণ করা কাজ আর করা হয়নি। সেটাও কথা রাখার প্রয়াসে। নিজের কথায় নিজেকে প্রকাশে বারণ ছিল ডা. মো. হারিছ উদ্দিনের। তবে যে বারণ আমি শুনিনি, সেটি হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের সেই মিছিল, সেই অংশ গ্রহণ আর প্রথম ভাষা শহীদ মিনারে তাঁর ইট দেওয়ার কথা। ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদমিনার নির্মাণে ডা. মো. হারিছ উদ্দিনের সংগ্রহ করে দেওয়া তিনটি ইট ছিল। এমন জ্যান্ত ইতিহাস চাপা দিয়ে রাখা সাধ্য ছিল না আমার। তাইতো লিখেছিলাম সেই প্রভাতের কথা।

ভাষা আন্দোলনের সময় পুরান ঢাকার চকবাজারে জুবিলি মেডিকেল হলের একটি কক্ষে থাকতেন ডা. মো. হারিছ উদ্দিন। মিটফোর্ড হাসপাতালে রাষ্ট্রভাষা কমিটির নির্বাহী সদস্য ছিলেন তিনি। পুলিশি ধরপাকড় এড়াতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পর দুই রাত তাঁকে পালিয়ে থাকতে হয়েছে। আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুরান ঢাকাবাসীর একাত্মতা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে জানিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের সঙ্গে জনতার যোগসূত্র পুরান ঢাকাবাসীর একাত্মতা থেকে হয়েছিল বলে তাঁর মতামত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রথম দিকে পুরান ঢাকাবাসী আন্দোলনে একাত্ম ছিলেন না। তাঁরা যখন একাত্ম হলেন, তখন ছাত্রদের সঙ্গে জনতার সেতুবন্ধন তৈরি হলো। আন্দোলন চলল দুর্বার গতিতে।’

ডা. মো. হারিছ উদ্দিনের ছাত্রজীবন শেষের সময় ছিল ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ততা। ইতিহাসের সূর্য সাক্ষী। কর্মজীবন শুরু চিকিৎসক পেশার সরকারি চাকরি দিয়ে। শুরুর সময়ও ইতিহাসের আরেক অধ্যায় স্পর্শ করা, মুক্তিযুদ্ধে চিকিৎসা সেবার মধ্য দিয়ে। ভাষাসংগ্রামী হিসেবে প্রথম আলোর সেই রিপোর্টে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গও এসেছিল। ‘...সরকারি চাকরিতে থেকেও তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭১ সালের মে মাস থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট সাব-সেক্টরে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি (ডা. মো. হারিছ উদ্দিন) বলেন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে আমি প্রত্যক্ষভাবে অংশ গ্রহণ করলাম। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হচ্ছে, ইতিহাসের এই দুই অধ্যায়কে প্রত্যক্ষ করা।’

আমাদের ভাষা, আমাদের দেশ। আপন করে পাওয়ার দুটো অধ্যায় আছে। ১৯৫২ আর ১৯৭১। এক জীবনে সেই দুই অধ্যায় স্পর্শ করা হয়েছে ডা. মো. হারিছ উদ্দিনের। তা-ও আবার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় তারুণ্যে। কী অসাধারণ প্রাপ্তির জীবন তাঁর।

ভাষাসৈনিক সম্মাননা ২০২০ স্মারকগ্রন্থ ‘শব্দগান রক্তমিতা’য় প্রকাশিত।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত