COVID-19
CORONAVIRUS
OUTBREAK

Bangladesh

Worldwide

330

Confirmed Cases

21

Deaths

33

Recovered

1,543,563

Cases

90,954

Deaths

342,415

Recovered

Source : IEDCR

Source : worldometers.info

শাকিলা ববি

২১ ফেব্রুয়ারি , ২০২০ ০০:০১

সিলেটে স্মৃতির মিনারগুলোতে বৈচিত্র্য আর নান্দনিকতার ছোঁয়া

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন চোখ খুলে দিয়েছিলো বাঙালি জাতির। সেই ফুটে ওঠা চোখে পরবর্তীতে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে বাঙালি।

সিলেট মদনমোহন কলেজে শহীদ মিনারের নির্মাণশৈলীতে তাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাঙালির চোখ খুলে দেওয়ার বিষয়টি। এই শহীদ মিনারের নাম- ‘দৃষ্টিপাত’। ছোট বড় ১২টি জানালা দিয়ে তৈরি এই শহীদ মিনারের স্থাপত্যশৈলী বেশ আগেই নজর কাঁড়ে সিলেটবাসীর।

১৯৬৭ সালে মদনমোহন কলেজে সিলেট জেলার প্রথম শহীদ মিনার স্থাপিত হয়। সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার তৈরি করার আগে এই শহীদ মিনারে সবাই শ্রদ্ধা জানাতেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধীরা শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। ১৯৭২ সালে কলেজ ছাত্র সংসদ ভাঙা শহীদ মিনারটি পুনর্নির্মাণ করে। ২০১২ সালে স্থপতি রাজন দাশের নকশায় সিলেট সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে প্রায় ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন স্থাপত্যশৈলীতে এই শহীদ মিনারকে আরও নান্দনিক করা হয়।


মদনমোহন কলেজের শহীদ মিনার ‘দৃষ্টিপাত’ নিয়ে স্থপতি রাজন দাশ বলেন, বিজ্ঞজনরা বলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বাঙালি জাতির চোখ ফুটেছিল। এই আন্দোলনের কারণে পরবর্তীতে দেশ স্বাধীনের আন্দোলনে সফল হয়েছিল বাঙালি জাতি। তাই এই শহীদ মিনারের নকশা করার সময় আমাদের কনসেপ্ট ছিল ভাষার সাথে চোখের উপমা প্রকাশ করা। আর জানালাকে আমরা দেয়ালের চোখ বলি। তাই জানালা দিয়ে বাঙালি জাতির প্রথম চোখ ফোটানো দৃশ্যমান করা হয় শহীদ মিনারের স্থাপত্যশৈলীতে। এই জন্যই এই শহীদ মিনারের নাম দেওয়া হয় ‘দৃষ্টিপাত’।   

কেবল এই একটি নয়, সিলেটে শহীদ মিনারগুলোর নির্মাণে দেখা গেছে বিষয় ও ভাবনার বৈচিত্র এবং অপরূপ নির্মাণশেলী। ভাবনার ঐই ভিন্নতা অনন্যরূপ দিয়েছে স্মৃতির মিনারগুলোকে।

সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার
১৯৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রবীণ নাট্য ব্যক্তিত্ব হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে প্রান্তিক মিলনায়তনে রাজনীতিবিদ, ছাত্র, যুব ও শ্রমিক নেতা, সাংবাদিক, আইনজীবী, সংস্কৃতি ও নাট্যকর্মীসহ সকল স্তরের মানুষের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিলেট শহরের চৌহাট্টাস্থ শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে শিল্পী শামসুল ইসলামের নকশা অনুসারে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়।

পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৌহিদি জনতার মিছিল থেকে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হামলা চালায় জামায়াত-শিবির। তাদের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শহীদ মিনার।এরপর সিলেটের সংস্কৃতি কর্মীদের শহীদ মিনার নতুন করে নির্মাণের দাবির প্রেক্ষিতে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের নির্দেশে, শহীদ মিনার পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করে সিলেট সিটি করপোরেশন।


২০১৪ সালে ১০ ডিসেম্বর প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে পুনর্নির্মিত এই শহীদ মিনারের নান্দনিক রূপ দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক শুভজিৎ চৌধুরী। জাতীয় শহীদ মিনারের আদলে তৈরি করা এই শহীদ মিনার এখন সিলেটের সকল আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। সেই থেকেই দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন আসেন দৃষ্টিনন্দন এই শহীদ মিনার দেখার জন্য।    

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনার
বর্ণমালার বন্ধনায় সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি অনুষদের মধ্যখানের টিলার ওপর নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। সূর্য উঠা থেকে অস্ত যাওয়া এর মধ্যেই হয় সূর্যের আলোর সাথে বর্ণমালার লুকোচুরি খেলা। সিকৃবির এই শহীদ মিনারে নাম ‘সূর্যালোকে বর্ণমালা’। এর নকশা করেছেন স্থপতি রাজন দাশ। জ্বলে ওঠা সূর্যের কিরণে ছোট, বড় বর্ণমালা উপভোগ করেন সিকৃবির শিক্ষার্থী শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষজন। শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারিতে নয়, সারা বছরই সিলেটের  মানুষজন ‘সূর্যালোকে বর্ণমালা’ দেখতে সিকৃবি ক্যাম্পাসে যান।  


‘সূর্যালোকে বর্ণমালা’ নিয়ে স্থপতি রাজন দাশ বলেন, বাংলা ভাষার জন্যই ভাষা আন্দোলনের সৃষ্টি। ভাষার সাথে বর্ণমালার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তাই  সূর্যের আলোর নিচে বর্ণমালার বাগান তৈরি করতে চেয়েছি। সেই জন্যই বাংলা বর্ণমালাকে পুঁজি করে এই শহীদ মিনারের কনসেপ্ট তৈরি করেছি।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনার
৫৮ ফুট উঁচু টিলায় ৬ হাজার ৮শ’ ৮৬ বর্গফুট জায়গা সারি সারি গাছের মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার। টিলার উপরে জাতীয় শহীদ মিনারের আদলে করা এই শহীদ মিনারের অন্যতম আকর্ষণ হলো ৯৯টি ধাপের সুদীর্ঘ সিঁড়ি। তবে মনোরম পরিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলে এই শহীদ মিনারকে করেছে আরও আকর্ষণীয়।

২০০১ সালেন ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করেছিলেন। এরপর ওই বছর সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে এই শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। শহীদ মিনারটির নকশা ও নির্মাণ করেন স্থপতি মহিউদ্দিন খান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি  নিয়মিত দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে এই শহীদ মিনারে।

লিডিং ইউনিভার্সিটি শহীদ মিনার
ভাষা সবসময়ই মাতৃ স্বরূপ। তাই ৫২টি দেশের ভাষায় ‘মা’ শব্দের বল্ক দিয়ে নকশা করা হয়েছে সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির শহীদ মিনার। শহীদ মিনারের মধ্যভাগে বড় করে বাংলায় লেখা হয়েছে ‘মা’। এরপর বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর ভাষায় লেখা হয়েছে ‘মা’। ৫২ দেশের ভাষায় ‘মা’ সম্বলিত ৩৮ ফুট উচ্চতা, ৬০ ফুট চওড়া এই শহীদ মিনার যেকারো নজর কাঁড়বে।   

সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাসে নির্মিত শহীদ মিনারের মূল অংশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলেই করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫ শতক জায়গায় নির্মাণ করেছেন এই  শহীদ মিনার। ২০ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয়েছে। এই শহীদ মিনারেরও নকশা করেন স্থপতি রাজন দাস।