বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং

সিলেটটুডে ডেস্ক

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:২৪

মৃত্যুর ২৩ বছরেও অম্লান সালমান

জনপ্রিয় চলচ্চিত্রশিল্পী সালমান শাহের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৯৬ সালের এইদিনে তিনি পাড়ি জমান অনন্তলোকে। সালমান শাহ বিদায় নিয়েছেন ২৩ বছর হলো। তার প্রসঙ্গ এলে এখনও বলা হয়- ‘বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সালমান শাহের শূন্যস্থানটি আজও কেউ পূরণ করতে পারেনি।’

আজও বর্তমান হয়ে আছেন অগণিত ভক্তের হৃদয়ে। এ জনপ্রিয়তা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। মৃত্যুর ২৩ বছর পরও তাই চলচ্চিত্র ভক্তদের কাছেই জীবন্তই আছেন সালমান শাহ।

তার মূল নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। চলচ্চিত্রে এসে নাম নেন ‘সালমান শাহ’। ১৯৭০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী। তিনি পরিবারের বড় ছেলে।

সালমান শাহ ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম সামিরা। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। কিন্তু সিনেমাপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি এখনও এভারগ্রিন ওয়ান্ডারবয় সালমান শাহ।

তার মৃত্যুতে সমগ্র চলচ্চিত্রশিল্পে শোক নেমে আসে। শোক সইতে না পেরে অনেক ভক্ত আত্মাহুতির পথও বেছে নিয়েছিলেন। অনেক উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে গেছে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্প। এর সঙ্গে অনেকে সালমানের মৃত্যুকে মিলিয়ে দেখেন। তাই আজও নতুন কোনও শিল্পীর কথা উঠলেই স্বাভাবিকভাবেই উদাহরণ হিসেবে চলে আসে সালমান শাহ।

তার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ছবি করা নায়িকা শাবনূর আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সালমান বেঁচে থাকলে আমরা দুজনে উত্তম-সুচিত্রার মতো হতে পারতাম।’

আজও নতুন কোনও পরিচালক সালমান শাহ অভিনীত ছবির রিমেক করার উদ্যোগ নিলে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে, অভিনয় করবেন কে? উত্তর পাওয়ার পরের প্রশ্ন, তিনি কি পারবেন সালমানের মতো করতে?

মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র জীবনে সালমান শাহ খুব বেশি ছবিতে অভিনয় না করলেও যতটা করেছেন, মন দিয়ে করেছেন। দর্শকদের জন্য করেছেন। তাই তো দর্শকরা আজও তাকে ভুলতে পারেননি। আজও সালমান যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত সেখানে তার ভক্তরা নীরবে চোখের জল ফেলেন। আজও টেলিভিশনের পর্দায় তার অভিনীত ছবি প্রদর্শন হলে হুমড়ি খেয়ে পড়েন দর্শকরা। আজও নতুন ছেলেরা সিনেমায় আসার স্বপ্ন দেখে সালমানের জন্য। এখানেই সালমান অনন্য, অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও চিরস্মরণীয়।

সালমান শাহ হত্যা মামলার ঘটনাক্রম
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মৃত্যুর পর তার বাবা একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। ওই মামলা প্রথমে রমনা থানা পুলিশ, পরে ডিবি পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবির তদন্ত করেন।

তদন্তকালে সালমান শাহর লাশ প্রথম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে, সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। পরে সালমান শাহর পরিবার ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আপত্তি দিলে সালমানের লাশ কবর থেকে তুলে ফের ময়নাতদন্ত করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিবেদনে, লাশ অত্যধিক পচে যাওয়ার কারণে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়।

ময়নাতদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ডিবি পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবির আত্মহত্যাজনিত কারণে সালমান শাহর মৃত্যু হয়েছে মর্মে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদী পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে নারাজি দেন। নারাজিতে তিনি সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা হক, আবুল হোসেন খান, বাসার কাজের মেয়ে ডলি, মনোয়ারা বেগম, নিরাপত্তা কর্মী আবদুল খালেক, সামিরার আত্মীয় রুবি, এফডিসির সহকারী নৃত্য পরিচালক নজরুল শেখ ও ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত মর্মে উল্লেখ করেন।

নারাজির পর আদালত ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার মজিবুর রহমানের কাছে তদন্তভার হস্তান্তর করা হয়। এ তদন্ত কর্মকর্তাও অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ার এক পর্যায়ে ১৯৯৭ সালের ১৯ জুলাই সালমানের বাবার ডিওএইচএসের (জোয়ার সাহারা) বাসায় রেজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ নামের যুবকের আগমন ঘটে। মিথ্যা পরিচয়ে ওই যুবকের বাসায় প্রবেশের অভিযোগে তাকে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে একটি মামলা করা হয়।

ওই মামলায় রেজভীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে সালমান শাহ হত্যার কথা স্বীকার করে তার সহযোগী হিসেবে ডন, ডেভিড, ফারুক, আজিজ মোহাম্মাদ, সাত্তার, সাজু, সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা, সামিরার মা লতিফা হক লুসি ও রুবির নাম প্রকাশ করে। ১৯৯৭ সালের ২২ জুলাই আদালতে তার স্বীকারোক্তি রেকর্ড করা হয়। পরে ওই মামলায় জামিনে গিয়ে পলাতক থাকা অবস্থায় রিজভীর সাজা প্রদান করা হয়।

পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই সালমানকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করা হয়।

আদালত ১৯৯৭ সালের ২৭ জুলাই অপমৃত্যুর মামলা এবং ক্যান্টনমেন্ট থানার মামলা একসঙ্গে তদন্তের জন্য সিআইডির ওপর তদন্তভার হস্তান্তর করেন। সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার খালেকুজ্জামান প্রায় সাড়ে ৩ মাস তদন্তের পর ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে সালমানের মৃত্যুকে আত্মহত্যাই সমর্থন করা হয়। এ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ফের নারাজি দাখিল করা হয়।

সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করা হলে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত। এরপর দীর্ঘ এক যুগ মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তাধীন ছিল।

২০১৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। এ প্রতিবেদনেও সালমানের মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।

২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর বাদীপক্ষ নারাজি আবেদন করেন। নারাজি আবেদনে আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন সালমান শাহর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা বলা হয়। আদালত নারাজি আবেদনটি মঞ্জুর করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব) মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়।

র‌্যাবকে তদন্ত দেয়ার আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি রিভিশন মামলা করেন। ওই বছরের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৬-এর বিচারক কেএম ইমরুল কায়েশ রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে র‌্যাব মামলাটি আর তদন্ত করতে পারবে না বলে আদেশ দেন।

২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট লস্কার সোহেল রানা মামলাটি আবার তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন। বর্তমানে পিবিআই মামলাটি তদন্ত করছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত