সিলেটটুডে ডেস্ক

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৬:৪৬

কেবল রক্ত পরীক্ষায়ই শনাক্ত হবে ক্যান্সার!

ইয়াসমিন হকের নেতৃত্বাধিন বাংলাদেশি গবেষকদের উদ্ভাবন

বেশির ভাগ রোগীর ক্যান্সার শনাক্ত হয় রোগের শেষ পর্যায়ে। সেটাও জটিল সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ডাক্তারদের খুব একটা কিছু করার থাকে না। বিশ্বে এখন পর্যন্ত এমন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি, যার মাধ্যমে আগে থেকেই ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়। তবে সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন বাংলাদেশের এক দল গবেষক। তাঁদের গবেষণায় শুধু রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই ক্যান্সারের ভবিষ্যদ্বাণী করার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এরই মধ্যে এ গবেষণার ফলের পেটেন্টের জন্য একযোগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে আবেদন করা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) আওতায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকের নেতৃত্বে এক দল গবেষক নন-লিনিয়ার অপটিকস গবেষণায় ক্যান্সার শনাক্তকরণের সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এ উদ্ভাবন সম্পর্কে জানাতে বুধবার সকালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে হেকেপ। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ উদ্ভাবনের বিষয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানাবেন।

গবেষকদলের প্রধান অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক গত রাতে বলেন, ‘এই গবেষণা মূলত ক্যান্সার নির্ণয়ের সহজ একটা পদ্ধতি। আমরা হেকেপের সহায়তায় এই ভিন্নধর্মী গবেষণা করেছি। হেকেপের দেশি-বিদেশি স্পেশালিস্টরা এ গবেষণা দেখার পরই তা ইউএসএ পেটেন্টের জন্য আবেদনের আগে কাউকে না জানানোর জন্য বলেন। কারণ এ ধরনের গবেষণা বিশ্বে প্রথম। নিশ্চয়ই এ গবেষণার গুরুত্ব আছে বলেই তাঁরা পেটেন্টের জন্য আবেদন করতে বলেছেন। তবে এ বিষয়ে আরো অনেক উচ্চতর গবেষণা প্রয়োজন।’    

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ পদ্ধতিতে একজন রোগীর দেহে কোনো ধরনের যন্ত্রপাতি প্রবেশ না করিয়ে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে নতুন একটি পদ্ধতিতে রক্ত পরীক্ষা করে সম্ভাব্য ক্যান্সারের ভবিষ্যদ্বাণী করার একটি সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। প্রাথমিক পরীক্ষার সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ‘Method and system based on non-linear optical characteristics of body fluids for diagnosis of neoplasia’ শীর্ষক একটি পেটেন্টের আবেদন একযোগে বাংলাদেশ ও ইউএসএ পেটেন্ট অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে গত ৯ জুলাই। এই নতুন পদ্ধতি আগে কখনোই কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। কাজেই আশা করা যায়, ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ের সম্পূর্ণ নতুন একটি পদ্ধতি হিসেবে এটি সম্ভাবনার নতুন একটি দ্বার উন্মোচন করেছে।

সূত্র জানায়, এ উদ্ভাবনের মাধ্যমে ক্যান্সার রোগাক্রান্ত রোগীদের রক্তে এমন কিছু একটা অনুসন্ধান করে বের করা সম্ভব হবে, যার নন-লিনিয়ার ধর্মটি ক্যান্সার রোগের সম্ভাব্যতার একটি ধারণা দেবে। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে শুধু ক্যান্সার রোগাক্রান্ত রোগীদের রক্ত নয়, অন্য যেকোনো স্যাম্পলের নন-লিনিয়ার ধর্ম খুবই সহজে সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে।

জানতে চাইলে ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ক্যান্সার ইপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, ‘এখন পার্টিকুলার ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। সেখানে বায়োপসির মতো পরীক্ষারও প্রয়োজন পড়ে। আর সাধারণত যখন কারো সন্দেহ হয় বা রোগের উপসর্গ দেখা দেয় তখনই মূলত রোগীরা আসে। এখন যদি নতুন কিছু আবিষ্কৃত হয়, তাহলে সেটা তো খুবই ভালো। আর এই আবিষ্কার বাংলাদেশের গবেষকরা করলে চিকিৎসাক্ষেত্রে আমরা আরো এক ধাপ এগিয়ে যাব।’

জানা যায়, ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ‘নন-লিনিয়ার অপটিকস ব্যবহার করে বায়োমার্কার নির্ণয়’ শীর্ষক প্রকল্পটি হেকেপের আওতায় সিপি-৪০৪৪ হিসেবে গৃহীত হয়। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নন-লিনিয়ার বায়ো-অপটিকস রিসার্চ ল্যাবরেটরি নামে একটি নতুন ল্যাবরেটরি গড়ে তোলা হয়। এ ল্যাবরেটরিতে ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের রক্তের সিরামে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠিয়ে নন-লিনিয়ার ধর্মের সূচক পরিমাপ করার কাজ শুরু হয়েছে। ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ে বায়োকেমিক্যাল প্রক্রিয়ায় যে বাড়তি রি-এজেন্ট ব্যবহার করতে হয়, শাবিপ্রবিতে উদ্ভাবিত নতুন পদ্ধতিতে তার কিছুরই প্রয়োজন হয় না।

২০১৫ সালের দিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) এই নন-লিনিয়ার অপটিকস রিসার্চ গ্রুপটি গবেষণার ব্যাবহারিক দিক নিয়ে কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রুপটি হেকেপের উইন্ডো ফোরের আওতায় ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি সমন্বিত গবেষণার জন্য একটি উদ্ভাবনীমূলক পরিকল্পনা জমা দেয়। পরিকল্পনাটি ছিল ক্যান্সার রোগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের নন-লিনিয়ার ধর্ম পরিমাপ করে ক্যান্সারের সম্ভাব্য উপস্থিতি ও অবস্থা চিহ্নিত করার একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন। অর্থাৎ প্রচলিত বায়োকেমিক্যাল ক্যান্সার নির্দেশক বায়োমার্কারের পরিবর্তে একটি অপটিক্যাল বায়োমার্কার উদ্ভাবন করা।
সূত্র: কালের কণ্ঠ

আপনার মন্তব্য

আলোচিত