১৮ জুলাই, ২০২৬ ২১:৫৮
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের ওয়েন সাউন্ড শহরের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ দ্য কারি হাউস-এর মালিক ও সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার শরীফ রহমান হত্যা মামলায় অভিযুক্ত যুক্তরাজ্যের নাগরিক রবার্ট ইভান্স জুনিয়র (২৫)-কে সাড়ে ৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
শুক্রবার (১০ জুলাই) অন্টারিও কোর্টের বিচারক সি. চর্নি রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যৌথ সুপারিশ গ্রহণ করে এ রায় ঘোষণা করেন। আদালত স্কটল্যান্ড ও কানাডায় বিচারপূর্ব আটক অবস্থায় থাকা ৭১০ দিন (১.৫ গুণ হিসেবে ১,০৬৫ দিন) সাজা হিসেবে গণনা করেন। ফলে মোট ১,২৭৭ দিনের দণ্ড থেকে ওই সময় বাদ দেওয়ায় অভিযুক্তের আরও ২১২ দিন, অর্থাৎ প্রায় সাত মাস কারাভোগ বাকি রয়েছে।
এছাড়া আদালত রবার্ট ইভান্স জুনিয়রের বিরুদ্ধে আজীবন আগ্নেয়াস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র রাখার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
শরীফ রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের ঘাটেরচটি গ্রামে। তিনি জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সিলেট সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) থেকে ২০০১ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সেখানে ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো থেকে ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সে মাস্টার্স এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজ থেকে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে কৃতিত্বের পাশাপাশি তিনি প্রবাসে একজন সফল উদ্যোক্তা, সমাজসেবক এবং কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
যেভাবে প্রাণ হারান শরীফ রহমান
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট রাতে ওয়েন সাউন্ড শহরে নিজের রেস্তোরাঁ ‘দ্য কারি হাউস’-এ তিন ব্যক্তির কাছ থেকে ১৪৫.৪৩ কানাডিয়ান ডলার খাবারের বিল আদায়ের চেষ্টা করেন শরীফ রহমান। একপর্যায়ে রেস্তোরাঁর বাইরে কথা কাটাকাটির সময় রবার্ট ইভান্স জুনিয়র তাকে একটি ঘুষি মারেন।
ঘুষির আঘাতে শরীফ রহমান মাটিতে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং খুলির হাড় ভেঙে যায়। পরে তাকে দ্রুত লন্ডন, অন্টারিওর একটি ট্রমা সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২০২৩ সালের ২৪ আগস্ট তিনি মারা যান। পরে পুলিশ ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত শুরু করে।
রায়ে যা বলা হয়
মামলার রায়ে আদালত বলেন, অভিযুক্তের উদ্দেশ্য শরীফ রহমানকে হত্যা করা ছিল না কিংবা এমন গুরুতর শারীরিক আঘাত করা ছিল না, যা তার মৃত্যুর কারণ হবে। তাই মামলাটি “ওয়ান-পাঞ্চ ম্যানস্লটার (এক ঘুষিতে হত্যা)” হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিচারক রায়ে উল্লেখ করেন, বিল পরিশোধ না করে পালিয়ে যাওয়ার সময় হামলা চালানো, ঘটনার পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া এবং অভিযুক্তের পূর্বের অপরাধের রেকর্ড শাস্তি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে আদালতে অভিযুক্ত অনুশোচনা প্রকাশ করায় সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তদন্ত
ঘটনার পর তদন্তে ওয়েন সাউন্ড পুলিশ, পুলিশ স্কটল্যান্ড, রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (জঈগচ), ইন্টারপোল, অন্টারিও প্রভিন্সিয়াল পুলিশ (ঙচচ) এবং যুক্তরাজ্যের প্রত্যর্পণ কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে কাজ করে। তদন্তে প্রায় ৮৫টি সরাসরি তথ্য, ৭০টি গোপন তথ্য এবং হাজার হাজার ঘণ্টার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়।
বাবা ও চাচার সাজা
রবার্ট ইভান্স জুনিয়রের বাবা রবার্ট বাসবি ইভান্স এবং চাচা ব্যারি ইভান্স নরহত্যার পর অভিযুক্তকে সহায়তা করার অপরাধে দোষ স্বীকার করেন। আদালত তাদের ২১ মাসের কারাদণ্ড দিলেও, গ্রেপ্তারের পর থেকে ওই সময়ের বেশি কারাভোগ করায় ‘টাইম সার্ভড’ হিসেবে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
তিনজনই যুক্তরাজ্যের নাগরিক। তাদের মধ্যে দুইজন ভুয়া পরিচয়ে কানাডায় প্রবেশ করেছিলেন। আদালতের নির্দেশের পর তাদের বিরুদ্ধে অভিবাসন সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠানোর পথ তৈরি করবে।প্রয়োজনে এটিকে আরও দৈনিক পত্রিকার উপযোগী ভাষায় বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের এসইও-ফ্রেন্ডলি সংস্করণেও সাজিয়ে দিতে পারি।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় নিহত শরীফ রহমানের বড় ভাই ও ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান বলেন, “আদালতের এই রায়ে আমরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি কোনো রায়েই পূরণ হওয়ার নয়। শরীফ শুধু আমাদের পরিবারের সদস্য ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মেধাবী, সফল উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক। তার স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের কাছ থেকে তাকে চিরদিনের জন্য কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা শুরু থেকেই ন্যায়বিচার চেয়েছি এবং আদালতের রায়কে সম্মান জানাই। তবে আমরা বিশ্বাস করি, শরীফ রহমানের মতো একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানির যথাযথ বিচার নিশ্চিত হওয়াই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আপনার মন্তব্য