০১ মে, ২০২৫ ২৩:২৮
ভারতীয় সংগীত অনেক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে, যার ফলে এখনও ভারতীয় গান, সংগীত, চলচ্চিত্র ইত্যাদি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। বিভিন্ন সময়ে অনেক মহান ব্যক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেছেন, যাঁরা গান, সংগীত ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন।
এই ভারতীয সংস্কৃতি বলতে শুধু বর্তমান রাজনৈতিক ভারতেরে সংস্কৃতিকে বোঝায় না। তেমনি এক মহান ব্যক্তিত্ব, কিংবদন্তি গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, যিনি হেমন্ত কুমার নামেও পরিচিত (১৬ জুন ১৯২০ – ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯)। তিনি সংগীত পরিচালক এবং গায়ক ছিলেন এবং বাংলা, হিন্দি ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় গান গেয়েছেন। ২০২০ সালে ত্ঁর জন্মশতবর্ষ ছিল। এই প্রবন্ধটি তাঁর জন্মবার্ষিকী ও জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর চিরন্তন আত্মার উদ্দেশ্যে নিবেদিত। বিলম্ব হল, শিল্পীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। শুধু ভারতে নয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও তিনি আজও স্মরণীয়। তাঁর কণ্ঠ, সুর এবং সংগীত পরিচালনার গুণে তিনি বাংলা ও হিন্দি উভয় চলচ্চিত্র ও সংগীত জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। বাংলা গানে তিনি যেমন আধুনিক ও রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন, তেমনি হিন্দি চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর সুরারোপিত গান কালজয়ী হয়ে রয়েছে।
শৈশব ও সংগীতের প্রতি আকর্ষণ
তিনি উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে তাঁর মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে তাঁর মাতামহ একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক ছিলেন। পিতৃকূলের দিক থেকে তাঁর পরিবার পশ্চিমবঙ্গের জয়নগরের বাসিন্দা ছিলেন, যা এখনও ‘জয়নগরের মোয়া’ নামে পরিচিত বিশেষ এক প্রকার মিষ্টির জন্য বিখ্যাত। তাঁদের পরিবার বিশ শতকের গোড়ার দিকে জয়নগর থেকে কলকাতায় চলে আসে। তিনি সেখানেই বড় হন এবং প্রথমে নাসিরউদ্দিন স্কুল ও পরে কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করেন।
সেখানে তাঁর বন্ধুত্ব হয় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাথে, যিনি পরবর্তীকালে একজন খ্যাতিমান কবি হন। সেই সময়েই তাঁর পরিচয় হয় বিশিষ্ট লেখক সন্তোষ কুমার ঘোষের সাথে। দ্বাদশ শ্রেণি পাস করার পর তিনি কলকাতার যাদবপুরে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ভর্তি হন, কিন্তু সংগীতের প্রতি তাঁর বেশি আগ্রহ থাকায় পিতার আপত্তি সত্ত্বেও তিনি পড়াশোনা ছেড়ে সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
সংগীত জীবন
১৯৩৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি প্রথমবারের মতো অল ইন্ডিয়া রেডিও-তে গান পরিবেশন করেন। হেমন্তের প্রথম গান, “আমার গানে এলে নবরূপী চিরন্তনী”। গানটি লিখেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ১৯৩৭ সালে কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি থেকে তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশিত হয়। শৈলেশ দত্তগুপ্ত ছিলেন তাঁর সংগীত গুরু, যাঁর তত্ত্বাবধানে তিনি সংগীত সাধনা শুরু করেন।
১৯৭৯ সালে প্রকাশিত আনন্দধারা নামে তাঁর আত্মজীবনীতে হেমন্ত লিখেছেন যে, কলকাতার ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশন স্কুলে দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন, সহপাঠীদের সাথে অবসর সময়ে ক্লাসরুমে গান গাওয়ার জন্য সহকারী প্রধান শিক্ষক তাঁকে বহিষ্কার করেছিলেন। পরে, তাঁর প্রভাবশালী বাবা হস্তক্ষেপ করলে তাকে বহিষ্কারের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। ১৯৫৯ সালে তিনি তাঁর নিজস্ব ব্যানার ‘হেমন্ত-বেলা প্রোডাকশনস’ (তাঁর স্ত্রী ও গায়িকা বেলা মুখার্জীর নামে) প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রথম চলচ্চিত্র হিসাবে মৃণাল সেন পরিচালিত বাংলা ছবি ‘নীল আকাশের নিচে’ প্রযোজনা করেন। তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতিও গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা গেয়ে গেছেন।
১৯৪০-এর দশকে গাওয়া কিছু বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত হলো: ‘আমার আর হবে না দেরি’ (১৯৪৪), ‘কেন পন্থে এই চঞ্চলতা’ (১৯৪৪), ‘আষাঢ় কথা হতে আজি’ (১৯৪৫), ‘এসো শ্যামল সুন্দর’ (১৯৪৫), ‘প্রাঙ্গণে মোর শিরীষ শাখায়’ (১৯৪৬), ‘ধ্বনিলো রে, ধ্বনিলো রে’ (১৯৪৬), ‘তোমায় গান শোনাবো’ (১৯৪৭), ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ (১৯৪৮), ‘আজ শরতের তপনে প্রভাত স্বপনে’ (১৯৪৯) ইত্যাদি। ১৯৬০-এর দশকে তিনি ‘বাল্মীকি প্রতিভা’, ‘শ্যামা’, ‘সপ্তমোচন’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘চণ্ডালিকা’ ইত্যাদি রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যে জনপ্রিয় কণ্ঠ হিসেবে আবির্ভূত হন। তবে, তাঁর হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনার সাফল্য সীমিত ছিল।
বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে অবদান
তিনি ১৯৪১ সালে বাংলা চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৪৪ সাল থেকে হিন্দি চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। একই সময়ে তিনি আধুনিক গান গাইতে থাকেন এবং রবীন্দ্র সংগীতকেও জনপ্রিয় করে তোলেন। ১৯৪০-এর দশকে তিনি সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং ১৯৫০-এর দশকে এসে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান।
উত্তম কুমারের কণ্ঠস্বর হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর গান এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে। ‘শাপমোচন’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘সপ্তপদী’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর মতো সিনেমায় তাঁর সুর সোনার হরফে লেখা থাকবে। হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর বিশাল অবদান ছিল। ১৯৫২ সালে ‘জাল’ চলচ্চিত্রে ‘ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনি’ গানটি তাঁর জনপ্রিয়তা নিশ্চিত করে। তবে ১৯৫৪ সালের ‘নাগিন’ ছবির সংগীত তাঁকে জাতীয় খ্যাতি এনে দেয়। ‘মন ডোলে, তন ডোলে’ গানটি ভারতীয় সংগীত ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
রবীন্দ্রসংগীতে তাঁর অসামান্য অবদান
রবীন্দ্রসংগীতকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তুলতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর গাওয়া ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’, ‘ও নদীরে’, ‘আমি যে কেন বসে আছি’ প্রভৃতি গান আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য ‘শ্যামা’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’-তে তাঁর গাওয়া গান শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে গেছে। “ও আমার দেশের মাটি", “আগুনের পরশ মনি”, “সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে”, “আমার পরাণ যাহা চায়", এবং “তুমি কি কেবলি ছবি” এর মতো রবীন্দ্রসঙ্গীতের কিছু গান অতুলনীয়।
অন্য গান ও অন্য ভাষায় গান
বাংলা গান ছাড়াও, হেমন্ত কুমার মারাঠি, গুজরাটি, অসমীয়া, ওড়িয়া, কোঙ্কনি, তামিল এবং ভোজপুরির মতো আরও বেশ কয়েকটি ভাষায় গান গেয়েছিলেন। তাঁর ডিস্কোগ্রাফি দীর্ঘ। তাঁর “ধন ধান্য পুষ্প ভরা” গানটি, একটি দ্বিজেন্দ্র গীতি এবং রজনীকান্তের দুটি গান, “আমিতো তোমারে চাহিনি জীবন” এবং “আমি অকৃতি অধম বোলেও তো কিছু” উল্লেখযোগ্য।
তাঁর সেরা আধুনিক বাংলা গানগুলোর মধ্যে একটি হল “রানার”। অন্যান্য সুপারহিট আধুনিক বাংলা গানের মধ্যে রয়েছে “ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না”, “আমার জীবনের এত আলো”, “এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে”, “এই বালুকা বেলায় আমি লিখেছিনু”, “আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি”, “ও নদীরে”, এবং “অবাক পৃথিবী”, যা লিখেছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। বাংলা সিনেমার জন্য তাঁর গানগুলোও সমানভাবে জনপ্রিয়। “মুছে যাওয়া দিনগুলি”, “সুরের আকাশে তুমি যে গো সুক্তরা”, “আজ দুজনার দুটি পথ”, এবং “সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসুক” গানগুলো উল্লেখযোগ্য। সুচিত্রা সেনের সাথে মোটরবাইকে চড়ে উত্তমকুমারের লিপ দেওয়া তাঁর “এই পথ যদি না শেষ হয়” গানটি ছিল অনন্য।
যদিও তিনি অনেক অনুষ্ঠানে নজরুলের গান গেয়েছিলেন, তাঁর রেকর্ড করা গানের সংখ্যা খুবই কম। এর মধ্যে “চোখ গেলো পাখি রে” এবং “পথ চলিতে যদি চকিতে কভু দেখা হয়” উল্লেখযোগ্য।
সম্মাননা ও পুরস্কার
তাঁর সংগীত প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। সংগীত জগতে অসাধারণ অবদানের জন্য তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল, যা তিনি বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন, যেমনটি তিনি আগে পদ্মশ্রীও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে, কলকাতার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে তাঁর সংগীতজীবনের ৫০ বছর পূর্তিতে এক বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়া হয়, যেখানে মহান সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর তাঁকে স্মারক প্রদান করেন। পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ গ্রহণ করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান, যা তাঁর আত্মমর্যাদাবোধের পরিচায়ক।
তিনি বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়েছেন এবং বহু পুরস্কার জিতেছেন, যেমন – ফিল্মফেয়ার সেরা সংগীত পরিচালক পুরস্কার (১৯৫৬), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সেরা পুরুষ কণ্ঠশিল্পী (১৯৭১), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সেরা পুরুষ কণ্ঠশিল্পী (১৯৭১, ১৯৮৬) ইত্যাদি। এছাড়া, বিএফজেএ (Bengal Film Journalists’ Association) পুরস্কারে তিনি বহুবার সেরা সংগীত পরিচালক (১৯৬২, ১৯৬৩, ১৯৬৪, ১৯৬৭, ১৯৬৮, ১৯৭৫, ১৯৮৬, ১৯৮৭, ১৯৮৮) এবং সেরা পুরুষ কণ্ঠশিল্পী (১৯৭২, ১৯৭৫, ১৯৭৬) হন। ১৯৮৬ সালে তিনি সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারও পান (১৯৮৬)। আরও পান বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডি.লিট (১৯৮৫) এবং মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার (বাংলাদেশ, ১৯৮৯) ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা মৈত্রী পুরস্কার (২০১২, মরণোত্তর)।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৪৫ সালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বেলা মুখোপাধ্যাযয়ের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ২৫ জুন, ২০০৯ সালে মারা যান। তাঁদের দুই সন্তান : ছেলে জয়ন্ত ও মেয়ে রানু। জয়ন্ত ব্যবসা করেন, পুত্রবধূ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় খ্যাতিমান অভিনেত্রী বাংলা ও হিন্দি পরিমণ্ডলে।
শেষ জীবন ও চিরস্মরণীয় উত্তরাধিকার
তিনি একজন মহৎ হৃদয়ের মানুষও ছিলেন। স্থানীয় অনুষ্ঠানে গেলে তিনি নিজের টিমের জন্য চা-নাশতার খরচ নিজে দিতেন। তিনি সংগীত জগতের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত জড়িত ছিলেন এবং ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে তাঁর শেষ সংগীত অনুষ্ঠান করেন, যেখানে তিনি মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার গ্রহণ করেন। ফিরে আসার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ সালে কলকাতায় ৬৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কণ্ঠ ও সুর আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের হৃদয়ে বেঁচে আছে। তিনি শুধুমাত্র একজন কণ্ঠশিল্পী নন, তিনি ছিলেন এক অনন্য সংগীত স্রষ্টা, যাঁর গানের আবেগ, সুরের গভীরতা এবং কণ্ঠের ঐশ্বর্য সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকালীন হয়ে থাকবে।
এই মহান ব্যক্তিত্ব ও কিংবদন্তি গায়কের ১০৫তম জন্মবর্ষে (২০২৫) জন্ম শতবার্ষিকীর (১৯২০-২০২০) শ্রদ্ধা জানাই।
মিহিরকান্তি চৌধুরী: লেখক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার সিলেট।
আপনার মন্তব্য