নিরঞ্জন দে

২০ মার্চ, ২০২৬ ১৮:২২

উৎসবের বিবর্তন : ঈদ উৎসব যেমন দেখেছি ও দেখছি

এখন ভার্চুয়াল উৎসবের যুগ। এখন আর অনেকেই কোনো উৎসবে এক জায়গায় মিলতে যাননা। হাতে একটা সেলফোন থাকলেই হয়ে গেলো। গলাগলি, কোলাকোলি শুধু নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় হয়ে যায়। এখন ঈদ উৎসবে ফেসবুকে ঈদের কোলাকোলির একটি ছবি দিয়ে ঈদ মোবারক লিখে দিলেই বাকীটা যে যার মতো নিয়ে নেয়। বুক পায়না বুকের নাগাল, মনের ছোঁয়াতো দূর কী বাত! এখন ফেসবুকে রান্নাঘর, ডাইনিং রুম, বেড রুম সহ সবকিছু "জবা কুসুৃম রোকন দুলালের মা' নাটকের মতোই আনন্দদায়ক ও আকর্ষণীয় বটে। আশির দশকে সাদাকালো টেলিভিশনের সামনে এ নাটকটি দেখার জন্য প্রতিবছর ঈদের রাতে আমরা ভীড় করে বসতাম উদগ্রীব হয়ে। এখন প্রতিদিন ফেসবুকে এতো আনন্দের উপকরণের ভীড়, যা দেখে শেষ করা যায়না। তাই উৎসবের কেনাকাটা, প্রস্তুতি, সাজসজ্জা, ধর্মকর্ম, খাওয়াখাদ্য, নাচগান সবকিছুই ভার্চুয়ালি হয়ে যায়।

আগে হিন্দুদের ঘ্রাণে অর্ধ ভোজন হয়ে যেতো। কী বিড়ম্বনা! জিহ্বায় একরত্তি স্বাদটাও লাগলোনা অথচ দূরের ঘ্রাণে খাদ্যটা খাওয়া হয়েছে - এ দায়টা নিতে হলো! কতো হিন্দুর জাত যে এ কারনে ভেসে গেছে সেটার হিসেব মেলা ভার। তবে, এখন আমরা আধুনিক ভার্চুয়াল খাবারে অভ্যস্ত। জাতও যায়না, নজরও লাগেনা, পানিপড়াও লাগেনা। উপভোগের আনন্দটা হয়ে যায়। তাই ঈদের সেমাই কিংবা পৌষসংক্রান্তির পিঠাপুলি এত্তো খাওয়া হয় যে ঘুৃম পেয়ে যায়। পরিবর্তনই জগতের নিয়ম। সময়ের সাথে যুগের তালে আমাদের সকল উৎসবও পরিবর্তিত হচ্ছে। একেই বলে উৎসবের বিবর্তন। ঈদ উৎসবটাও আজ অনেকটা রঙ পাল্টেছে। পাল্টেছে পূজা, নববর্ষ সহ সকল উৎসব।

উৎসবের বিবর্তন সমাজ ও কালের রীতি। মানুষের সামষ্টিক অগ্রযাত্রায় সককিছুই পরিবর্তনশীল। শিক্ষা, সংস্কৃতি, চাহিদা, ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজনীতির নানা রসায়ন, ধর্মের নানা মোড় নেয়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, আরবান সমাজের উন্নাসিকতা ও স্ট্যাটাস, একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা, বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার, উন্নত দেশ সমূহে অভিবাসনের হিড়িক ইত্যাদি নানা কারনে মানবসমাজে উৎসব বিবর্তিত হয় এবং হচ্ছে। বিশেষ করে ধর্মীয় কারনে আমরা দিন দিন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা হারিয়ে ফেলে বিচিত্র ভাবে নানা রঙ পাল্টাচ্ছি। তাই মানুষের উৎসবও বিভাজিত হচ্ছে, সংকীর্ণ হচ্ছে, দূষণের আবরণে ছেয়ে গেছে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে উৎসব একটি মৌলিক সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। আদিম সমাজ থেকে উত্তর-আধুনিক বিশ্ব পর্যন্ত উৎসব মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতিফলন হিসেবে কাজ করে এসেছে। তাই পূর্বেই বলেছি, যুগে যুগে মানুষের উৎসব কোনো স্থির সত্তা হিসেবে টিকে থাকেনি ; বরং এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া এবং যা পরিবর্তিত ও পুনর্গঠিত হয়। নৃতত্ত্বে উৎসবকে সামাজিক সংহতির একটি মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। উৎসব মানুষের আবেগের ফসল, তার অস্তিত্বের প্রতীক এবং বিশ্বাসের প্রতিফলন।

উৎসবের বিবর্তন সমাজের পরিবর্তনের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিফলন, যেখানে ধর্মীয় আচারভিত্তিক প্রাচীন উৎসব ধীরে ধীরে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক রূপ ধারণ করেছে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দ্যুর্কাইম - এর মতে উৎসব সামাজিক সংহতি সৃষ্টি করে। আবার সমাজবিজ্ঞানী ও বিপ্লবী কার্ল মার্কস দেখিয়েছেন আধুনিক যুগে উৎসব অনেক ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের প্রভাবে বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আধুনিক সমাজচিন্তক ও সমাজবিজ্ঞানী এ্যান্থনি গিডেন্স তাঁর বিশ্বায়ন তত্ত্বে জানাচ্ছেন,- বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাবে উৎসব নতুন রূপ ও অর্থ পাচ্ছে। সুতরাং উৎসবের বিবর্তন মূলত ধর্মীয় থেকে সামাজিক, তারপর বৈশ্বিক ও বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক প্রকাশে রূপান্তরের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

উৎসবের বিবর্তনের সাথে সাথে তার একটি বৈশ্বিক পর্যটনও ঘটে। তাই এক জাতি ও এক দেশের উৎসব কিছুটা বিবর্তিত হয়ে অন্য দেশেও পালিত হয়। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এটা আরও বিস্তৃত এবং দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে। মূল কথা হচ্ছে, মানব সমাজ পরিবর্তনশীল। সভ্যতা, সংস্কৃতি, রুচিবোধ কোনোকিছুই এক ফ্রেমে আটকে থাকেনা। তাই মানুষের রচিত উৎসব বিবর্তিত হবেই। আশংকাটা হলো গতিটা তার কোন পথে?

এবার আসি আমার দেখা আমার জন্মশহরে ঈদ উৎসব বা ঈদুল ফিতর কেমন ছিল, আর এখন কেমন দেখছি সেই আলোচনায়।

সিলেটকে বলা হয় এনথ্রোপলজিক্যাল গার্ডেন, মানে নৃতাত্ত্বিক উদ্যান। এখানে নানা ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থান প্রাচীণকাল থেকেই চলে আসছে। তাই প্রচলিত অর্থের ধর্মটা অন্যের হলেও উৎসবটা যে সমাজের সকলের হতে পারে সেটা খুব ছোটবেলা থেকেই টের পেয়েছি। বড় হয়ে সেটার কারন ও গুরুত্বটি বুঝতে পেরেছি।

ছোট বেলার রমজান মাস আর ঈদ উৎসবের কথা খুব মনে পড়ে। বয়স তখন পাঁচ-ছয় বছর হবে। রাতে ভয়ঙ্কর শব্দে ঘুম ভাঙ্গত। চুঙো ফুকে বিচিত্রভাবে আমাদের পাড়ায় হেটে হেটে একদল স্বেচ্ছাকর্মী রাতের শেষ প্রহরের খাবার খাওয়ার জন্য বাসায় বাসায় সবাইকে ডেকে তুলতো। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ডাক দেওয়া হতো- “উঠো উঠো উঠিযাও, পতা (সেহরী) খাওয়ার সময় অই গেছে।” ঠিক সাথে সাথেই বেজে উঠতো সাইরেন। বাসার খুব কাছ থেকে বাজতো এটি। এর বিকট শব্দে প্রতি রাতে ভয় পেয়ে ঘুম ভেঙে উঠে বসতাম। কোনো রাতে মা-বাবা আবার কোনো রাতে বোনদের সাথে ঘুমাতাম। সুতরাং ভয় পেলেও সেই চুঙোফুকা চরিত্রটিকে কল্পনা করতাম। রাত্রির অন্ধকারে কি করে যে বিচিত্র ভঙ্গিমায় বাসার একেবারে জানালার পাশে এসে বলে যেত উঠো উঠো ...। পরদিন সকালে ঘুমথেকে উঠেই শক্ত কাগজ দিয়ে চুঙো তৈরি করে মুখে লাগিয়ে ‘উঠো উঠো উঠিযাও’ বলে আমার খেলা শুরু হতো। বাসার বড় উঠোনে হেটে হেটে সেটি বলতাম রাতে শুনা সেই কণ্ঠ অনুকরণ করে।

রমজান শুরু হলে দিনের প্রথমভাগে রাস্তাঘাটে লোকজন চলাফেরা করতে খুব একটা দেখা যেতো না। খুব ভাবগম্ভীর এবং নিষ্ঠার সাথে লোকজন রমজান মাস অতিবাহিত করত। আমি যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি তখন থেকেই বাসার বাজার সদাই করতে যেতাম রাস্তার পাশের দোকানে এবং অনতিদূরের বাজারে। রমজান মাসে প্রচন্ড গরমে দিনে রোজা রেখে অনেকে ঠান্ডা পানীয় জল দিয়ে ইফতার সারতে আগ্রহী হতেন। তখন ঘরে ঘরে রেফ্রিজারেটর ছিলনা। বড় ঠেলাগাড়িতে ধানের তুস দিয়ে প্রকান্ড বরফের টুকরো নিয়ে ফেরি করে বিক্রি করতো। লোহার খুন্তি দিয়ে কেটে কেটে বরফের টুকরো বিক্রি করতো। লোকজন ভিড়করে তা নিয়ে যেতো। গামলা, জগ নিয়ে আসতো হাতে করে। পলিথিনের ব্যাগ তখন ছিল না। রাস্তার পাশে বিকেলে ইফতারীর নানা পদের খাবার নিয়ে দোকানীরা বসতো। বিকেলে যথারীতি মসজিদে আযান হতো মাইক্রোফোন ছাড়া খালি গলায়। আর পাশের সরকারি অফিস থেকে বাজানো হতো সাইরেন। সবাই ইফতার করতে ছুটতো।

উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় খুব মনে পড়ে, বেশ ক’ বছর দেখেছি আমাদের বাসা থেকে আমার মায়ের বানানো পিঠে-সন্দেশ ইফতারী হিসেবে বাবা কোথায় যেন দিয়ে আসতেন। খুব সম্ভবত, বাবার কোন সহকর্মী বা বন্ধুর বাসায় তিনি সেটা নিয়ে যেতেন সৌজন্য বা সামাজিক দায় হিসেবে। আমার এসব জানার আগ্রহ ছিলনা- বরং এ উপলক্ষে দু’একটা পিঠা আর সন্দেশ আমার ভাগ্যে জুটতো- তাতেই বেজায় খুশি। আমার বাসার সামনে তখন নালার উপর পাড়ার রাস্তায় সরকারি খরচে কার্লভার্ট নির্মাণ হচ্ছিল। সে সময় রমজান মাস ছিল কি না, মনে পড়ছে না। তবে পাড়ার এক মুসলিম ভদ্রলোক (আমরা চাচা ডাকতাম) আমার মাকে ময়দা-ঘৃত-চিনি-বাদাম-কিচমিচ এগুলো দিয়ে ‘তুসা শিন্নি’ বানিয়ে দিতে অনুরোধ করলেন। যেহেতু আমাদের বাসার সামনে সেই কার্লভার্ট নিমার্ণ হচ্ছে তাই এই দাবী। মা যত্নের সাথে প্রথমবার সেটা করে সকল শ্রমিক এবং উপস্থিত পাড়ার সবাইকে খাওয়ালেন। সেই স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।

আমি সিলেট শহরের শাহজালাল মাজারের পার্শ্ববর্তী এলাকার আম্বরখানা সরকারি প্রাইমারী স্কুলের ছাত্র ছিলাম। তাই এই তুসা শিন্নি দরগাহ মহল্লার দোকানগুলো থেকে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে অনেকবার কিনে খেয়েছি, কিন্তু ঐদিনের মায়ের হাতে প্রথম বানানো এই দ্রব্যের স্বাদ অপূর্ব ছিল।

একমাস রোজার রাখার পর যখন ঈদ আসতো, তখন আমাদের পাড়ার ছোটরা সবাই ঈদের দিন সকালে রাস্তার পাশে দাঁড়াতাম বা বসতাম। কারণ শত শত মানুষ বাসার পাশের রাস্তা দিয়ে সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দানে নামাজ পড়তে যেতেন। অনেকটা মিছিলের মতো, মানুষ আর মানুষ। ছুটতো গাড়ী, রিক্সা, সাইকেল। পায়ে হেঁটেও যেতেন অনেকে। আমাদের আগ্রহ ছিল সেটা দেখার। তখন নানা রকম খেলনা আর রঙ-বেরঙের বড় বড় বেলুন নিয়ে দোকানিরাও যেতো।

ঈদের দিনের নানা রঙের সেমাই, পিঠে যা ছোট বেলায় খেয়েছিলাম তা আজ শুধু গল্প। সেই স্বাদ আর নেই। আন্তরিকতাও উধাও হয়ে গেছে। বাবার হাত ধরে কত বাসায় গিয়ে খেয়েছি-খুব মনে পড়ে সেসব স্মৃতি। তখন হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ভদ্রলোকদের মধ্যে একটা পারস্পরিক সম্মান বা শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল। সমাজের বাজে লোকেরও অভাব ছিল না। কিন্তু এখন তো কোনোটাই বুঝার উপায় নেই। আমাদের পাড়ার কারো ঘরে সে সময় টেলিভিশন ছিল না, সুতরাং সন্ধ্যার পর আর ঈদের দিন বলে কিছু মনে হতো না। কোন মেলা বা অনুষ্ঠানাদির প্রচলন ছিল না। ঈদ উৎসবের সাথে আনুষ্ঠানিক শিল্পকলার যোগটি হয়েছে অনেক পরে।
আজ ঈদ যতটা না ঘরে ঘরে আন্তরিক তার চেয়ে বেশি আনুষ্ঠানিক। ধর্মীয় রীতি-নীতি চলছে যথা নিয়মেই, কিন্তু সামাজিক আদর আপ্যায়ন, আদান-প্রদান, আন্তঃসম্প্রদায় আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ এসব এখন সেভাবে নেই। কারো কারো ক্ষেত্রে হয়তো আছে- সে আবার অন্য হিসেব। তিনি নেতা-টেতা হলে তো কথাই নেই। তবে ঈদ উৎসবে শিল্প-সংস্কৃতিক যোগ বর্তমানের একটি নবমাত্রা। এখন ঈদে মেলা হয়, সঙ্গীতানুষ্ঠান হয়, সুভ্যেনির বের হয়, টেলিভিশনের চ্যানেগুলো নানা বর্ণাঢ্য আয়োজন করে থাকে। ঈদপর্যটন বেড়েছে অনেক। সেটা দেশ থেকে দেশের বাইরেও গড়িয়েছে। আবার ফেসবুক, টুইটার এসব ভার্চুয়াল জগতে ঈদ বেশ রমরমা। ইদানিং আবার ঈদের দিন অনেকেই ঘুমিয়েই কাটান এবং এটা ফ্যাশন করে বলতেও শুনি। সবচেয়ে যেটা বেড়েছে তা হলো বাণিজ্য। একমাস খাদ্যপণ্যের বাণিজ্য এবং বস্ত্র-পরিধেয়, প্রসাধন সামগ্রী এমনকি সোনা-দানা পর্যন্ত। হোক না। মানুষের উৎসবতো। মানুষতো স্থবির নয়, স্তব্ধ বিটপীর মতো নয়। মানুষ চলে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে। তাই উৎসব রঙ বদলায়। আর তাই অনেকেই বলেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’ আবার অনেকে এর প্রতিবাদ করে বলেন, ‘ধর্ম যার, উৎসবও তার।’

ছোটবেলা থেকে যৌগিক সমাজে বড় হয়েছি। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান-আদিবাসী-অবাঙালি সবাই মিলেমিশে চলেছি। সবার সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্মাচার নানাভাবে গ্রহণবর্জনের পথ ধরে এগিয়েছে। অন্যের অনেক কিছু আমার বা আমাদের হয়ে গেছে, আবার আমার বা আমাদের অনেক কিছু অন্যের মাঝেও বিস্তৃত হয়েছে। এটাইতো মানব সভ্যতার রীতি। একফুলে উত্তম বাগান হয়না, খামার হয়। সূর্যমুখীর খামার, গোলাপের খামার, রজনীগন্ধার খামার। চাষীরা ফুল চাষ করেন বাণিজ্যিক কারণে, সেখানে প্রাণের ভালোবাসা গৌণ। কেউ কেউ সেটাকেও বাগান বলতে পারেন, তবে বাগান বলতে চোখের সামনে যা ভেসে উঠে সেটা তা নয়। বাগানে থাকে হরেক রকম ফুল, পাতাবাহার, যেখানে ভ্রমর-প্রজাপ্রতি উড়ে বেড়ায়। নানা রঙের মেলায় এক অনুপম চোখ জুড়ানো শোভা রচিত হয়- সেই না যথার্থ ফুল বাগান। ঠিক সে রকম একধর্ম বা এক জাতির দেশে বৈচিত্র থাকেনা। আমাদের দেশকে তাই বলা হয় ‘এনথ্রোপলজিক্যাল গার্ডেন’- নৃতাত্ত্বিক উদ্যান বিশেষত সিলেট অঞ্চল একটি বিচিত্র নৃতাত্ত্বিক উদ্যান। তাই চা শ্রমিকের উৎসব, মনীপুরীদের উৎসব, গারো-খাসিদের উৎসব, হাওরের উৎসব, পাহাড়ের উৎসব, সমতলের উৎসব, প্রাচীণ লোকজ উৎসব, পূজা-পার্বন-রমজান-ঈদ সবইতো আমাদের। এটা ওদের, ওটা এদের এভাবে আলাদা করার কোন কারণ দেখি না।

ধর্ম পৃথক হতে পারে, কিন্তু আনন্দ, আবেগ, কৃষ্টি একই। বরং এসব কিছুকে নিজের ভাবাটাই গৌরবের, মহত্বের বিষয়। ঈদের দিন বন্ধুদের বাসায় গিয়েছি, বেড়িয়েছি, আনন্দ করেছি, পিঠা-সেমাই খাওয়া-দাওয়া করেছি, অনুষ্ঠানাদিতে যোগ দিয়েছি তাতে আমার ধর্মের ক্ষতি হয়নি। যেখানে বিশ্বাস গভীর, ভালোবাসা প্রশ্নাতীত, জ্ঞান বিস্তৃত সেখানে ঠুনকো ভয় কাজ করে না। তবে হ্যাঁ, যিনি মনে করেন, ‘অন্যের উৎসবে আমি যাবো না’- সেটা তার অধিকার। তাকে জোর করার কোন সুযোগ নেই। কারো বিশ্বাসে কেউ আঘাত করার প্রয়োজন নেই।

ছোটবেলায় শুনতাম, অনেকেই বলতেন ‘খুশির ঈদ’ সত্যিকার অর্থেই এই উৎসবটি যেমন ধর্মের তেমনি হওয়া উচিত আনন্দের, যে আনন্দ নির্মল। ঈদ বলতেই যেনো ‘খুশির উৎসব’ বুঝায়- যেখানে থাকবে অপার আনন্দ। ‘ঈদ’ শব্দটি আরবি শব্দমূল ‘আউদ’- যার অর্থ ফিরে ফিরে আসে এমন উৎসব। আরেকটি অর্থ খুশি বা আনন্দ। প্রতি বছর চন্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ঈদ নির্দিষ্ট সময়ে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। ‘ঈদুল ফিতর’ বলতে বুঝায় রোজার ঈদ বা রোজা পরবর্তী ঈদ। ‘ফিতর’ শব্দটির দুটি অর্থ- ‘ভেঙে দেওয়া’ এবং ‘বিজয়।’ এই আনন্দ উৎসবের পূর্বে রয়েছে একমাসের সংযম সাধনা। আত্মনিয়ন্ত্রণের সাধনা। কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা। সুতরাং ঈদুল ফিতর অর্থ এসব রিপুর বিরুদ্ধে বিজয়, সদগুণের বিজয়, মানবীয় গুণের বিজয়। আবার ‘ভেঙে দেওয়া’ অর্থে বুঝায় রোজা বাস উপবাস ভেঙে দেওয়া। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় যে সমাজ এগিয়ে চলেছে। সমাজে নানা পরিবর্তন লক্ষণীয়। রশিতে টান পরেছে নানা দিকে নানা ভাবে। দেখাযাক কোনদিকে ধাবিত হয়।

বর্তমান পৃথিবী একটি বিশ্বগ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ। সুতরাং সুখ-দুঃখ,আনন্দ-বেদনা, চিন্তা-চেতনা, জরা-ব্যাধি, আলো-অন্ধকার সবই তরঙ্গায়িত হয় পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। অখণ্ড মানব সমাজকে উপেক্ষা করা কোন সুবিবেচনার কাজ নয়, শুভবুদ্ধিও নয় বটে।

সার্বজনীন উৎসবে মানুষে মানুষে সম্মিলন হয়। ধর্মীয় উৎসবকেও সার্বজনীন রূপ দেয়া যায়। ধর্মকে যথাযথ জায়গায় রেখে সেটা করা উচিত এবং সম্ভব। আমরা কিন্তু মহাপ্রকৃতির অংশমাত্র। সুতরাং প্রকৃতিবিরুদ্ধ কোন কিছুই টিকে থাকে না।
প্রেম-ভালোবাসা-সম্প্রীতি-সদ্ভাব নিয়েই প্রকৃতিতে টিকে থাকতে হয়। বৈচিত্রই প্রকৃতির নিয়ম। এই বৈচিত্রেই খুঁজতে হয় একতা। ইংরেজীতে যাকে বলে ‘ইউনিটি ইন ডাইভারসিটি’ । তাই সকল উৎসব, সকল আনন্দ, সকল প্রার্থণা, সকল মহতী উদ্যোগের ভিত্তি হোক ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবকল্যাণ। তাই সম্প্রীতির এই ঈদ উৎসবে সবার অন্তর আলোকিত হোক। অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ দূর না হলে, সৃষ্টিকর্তার করুণা সেখানে পৌঁছায় না। এই জীবনে যেটুকু সময় পার করলাম, তাতে মনে হলো, কখন যে কার ঘাটে তরণী ভিড়াতে হয়, তা বলা মুশকিল। তিনি নানারূপে, নানাভাবে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ আমাদের পরশ দিয়ে যান- শুধু অনুভূতি নেই বলেই হাপিয়ে মরি। অন্তরাকাশে মেঘ জমা হয় বলেই তাঁকে চিরদিন দেখিনা- সে আঁড়াল করে রাখে। তবুও বলি-

আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই জাগে, জাগে আমার গান...

নিরঞ্জন দে: লেখক, প্রামাণ্যকার ও সংগঠক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত