COVID-19
CORONAVIRUS
OUTBREAK

Bangladesh

Worldwide

330

Confirmed Cases

21

Deaths

33

Recovered

1,535,766

Cases

89,873

Deaths

340,058

Recovered

Source : IEDCR

Source : worldometers.info

রীমা দাস

০৮ মার্চ, ২০২০ ১৯:০৩

শতভিষা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

'কোন কালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারি ,
শক্তি দিয়াছে প্রেরণা দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী'

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার এই ক'টি লাইনের যে তাৎপর্য তা বাস্তব জীবনে অনেকের মধ্যে দেখা যায়। বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে, দেশ গঠনের ভূমিকায়, সুখে দুঃখে যার নাম উচ্চারিত হয়, তিনি বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তাঁর আদরের নাম রেণু। যখনই আমরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলি তখনই বঙ্গমাতার নাম প্রচ্ছন্নভাবে চলে আসে। খোকা থেকে মুজিব, মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং সবশেষে বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে যে নারীর অবদান অনস্বীকার্য তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের শতভিষা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের পিতা শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক এবং মাতা হোসেন আরা বেগম। তাঁর বড় বোন বেগম জিন্নাতুন্নেছা। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি তাঁর পিতাকে হারান, তখন তাঁর বড় বোনের বয়স পাঁচ বছর। পিতার মৃত্যুর মাত্র দুবছরের মাথায় তাঁদের মাও মারা যান। দুই অনাথ শিশুর দায়িত্ব নেন বঙ্গমাতার দাদা শেখ মো. আবুল কাসেম। দাদার ইচ্ছায় মাত্র তিন বছর বয়সের ফজিলাতুন্নেছার সাথে দশ বছরের শেখ মুজিবুর রহমানের বিয়ে হয়।

শাশুড়ি সায়রা খাতুন এবং শ্বশুর শেখ লুৎফর রহমানের কাছে তিনি বাড়ির বউ হয়ে থাকেননি, থেকেছেন নিজের সন্তান হয়ে। মায়ের আদর ভালোবাসা, বাবার শাসন, স্নেহ সবই তিনি তাঁর শ্বশুর শাশুড়ির কাছ থেকে পেয়েছেন। ছোট শিশু রেণুকে কোলে নিয়ে তাঁর শাশুড়ি বলেছিলেন- আমিই তোমার বাবা। এরপর থেকে রেণু তাঁর শাশুড়িকে বাবা বলে ডাকতেন। রেণুর গায়ের রং ছিল অতিরিক্ত ফর্সা আর চোখের মনি ছিল রক্তিম। অপরদিকে মুজিব ছিলেন ছিপছিপে হালকা পাতলা। যে ছোট বয়সে রেনুর বিয়ে হয়, তখন তাঁর বিয়ে কি তা বুঝতে পারার মত অবস্থা ছিল না। তাই বর, বরের ভাই, বোনের সাথে ছিলো তাঁর খুনসুটি এবং খেলাধুলা।

মুজিব এর ভাই বোনেরা রেনুকে বলতেন মুজিব তাঁর 'দুলাহ'। ছোট শিশু হয়তো ভেবে নিয়েছিলেন দুলাহ মুজিবের নাম। তাই রেনু তার স্বামীকে দুলাহ বলে ডাকতেন। যখনই বঙ্গবন্ধু রেনুকে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে মারতেন বা খেলাচ্ছলে দুষ্টুমি করতেন, তখনই রেনু- দুলাহ মেরেছে, দুলাহ মেরেছে বলে কান্না জুড়ে দিতেন। রেনু ছিলেন তাঁর শাশুড়ির আহ্লাদী পুতুল। তিনি দৌড়ে আসতেন আর বকা দিতেন নিজের সন্তানদের। এভাবেই ধীরে ধীরে এই পরিবারের একজন হয়ে হয়ে তিনি বড় হতে লাগলেন।

শিশু অবস্থায় বিয়ে হলেও বঙ্গমাতার সংসার শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর এন্ট্রান্স পাশের পর ১৯৪২ সালে। সে বছরই শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। ফজিলাতুন্নেছা স্থানীয় একটি মিশনারি স্কুলে ভর্তি হলেও তাঁর স্কুল জীবনের পড়ালেখা বেশি দূর এগোয়নি। তিনি ঘরে বসেই পড়ালেখা শিখেছেন। তাঁরা যখন সংসার শুরু করেন, তখন বঙ্গবন্ধুর বয়স ১৯ বছর আর ফজিলাতুন্নেছার বয়স ১০ বছর। আমাদের প্রধানমন্ত্রী মাননীয় শেখ হাসিনা তার মা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন- 'মনেপ্রাণে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ নারী। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এই রমণী অসীম ধৈর্য ও সাহস নিয়ে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারতেন। জীবনে তাঁর কোনো চাহিদা ছিল না। তাঁর স্মরণশক্তি ছিল খুবই প্রখর। তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। ৬ দফা আন্দোলনের সময় তিনি নিজের অলংকার বিক্রি করে সংগঠনের জন্য আর্থিক চাহিদা মিটিয়েছেন। স্বামী শেখ মুজিব প্রায় ১২ বছর জেলে কাটিয়েছেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনে। বন্দিকালে তিনি সংসারের ভার বহন করেছেন, ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন, শতশত কর্মীদের খবরাখবর রেখেছেন এবং দুস্থ কর্মীদের সহায়তা করেছেন। একজন মায়ের সকল দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ প্রকাশ পেত তাঁর মাঝে।'

তাঁদের সংসার জীবন যখন থেকে শুরু হয়েছে তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু বেশিরভাগ সময় বাইরে বাইরে থাকতেন। স্বামী বাইরে থাকাকালীন সময়ে ফজিলাতুন্নেছা অবসর সময়ে বিভিন্ন রকমের বই পড়তেন, গান শুনতেন। আর যখন বঙ্গবন্ধু বাড়ি আসতেন, তখন তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন বইয়ের বিষয়বস্তু ও কাহিনী নিয়ে আলোচনা করতেন। সেই আলোচনাগুলো কখনো কখনো রাজনৈতিক আলোচনায় রূপান্তরিত হতো। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী পরবর্তীতে দেশের অবস্থা, রাজনৈতিক কর্মপন্থা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন বঙ্গবন্ধুর সাথে।

আমাদের বঙ্গমাতা ছিলেন জ্ঞানী, বুদ্ধিদীপ্ত, দায়িত্ববান এবং ধৈর্যশীল মানবিক মানুষ। জাতির পিতার 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' এবং 'কারাগারের রোজনামচা' লেখার মূল প্রেরণা ও উৎসাহ ছিল তাঁর জীবনসঙ্গী ফজিলাতুন্নেছার। শেখ মুজিবের ১২ বছর কারাবাস-কালে ছেলেমেয়েদের পিতৃস্নেহ দিয়েছেন বেগম মুজিব। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে প্রধান অবলম্বন ছিলেন তাঁর স্ত্রী। স্ত্রীকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। সর্বগুণে গুণান্বিতা ফজিলাতুন্নেছার সাহায্য ও সহযোগিতা না পেলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে রাজনীতি করা সম্ভব হত না। বেগম মুজিব তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে কাটিয়েছেন। ১৯৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান শেখ মুজিবুর রহমানকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে লাহোরে বৈঠকে যোগদান করতে অনুমতি দিয়েছিল, তখন বেগম মুজিব তাঁর স্বামীকে এভাবে বৈঠকে যোগদান না করার পরামর্শ দেন। এবং বলেন- 'যদি বৈঠকে যোগ দিতেই হয়, তবে মুক্ত মানুষ হিসেবে বৈঠকে যোগ দেবেন।' কতটুকু আত্মবিশ্বাস ও বিচক্ষণতা থাকলে এ ধরনের পরামর্শ দেয়া যায় তা অনুভবের বিষয়। শেখ মুজিব ফজিলাতুন্নেছার কথা রেখেছিলেন। তিনি প্যারোলে মুক্তি নেননি। বঙ্গমাতা বুঝতে পেরেছিলেন এই গণআন্দোলনকে রুখে দেয়ার সাধ্য আয়ুব সরকারের নেই। মাওলানা ভাসানী, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সহ অনেকে তখন রাজপথ গরম করে রেখেছিলেন। এদের আন্দোলনে দ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলো চারিদিকে। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেয় এবং বঙ্গবন্ধুসহ সকল বন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয় আয়ুব সরকার। বঙ্গবন্ধুর এই নিঃশর্ত মুক্তির পেছনের কারিগর আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান এবং এই মামলায় অভিযুক্তদের গণসংবর্ধনা দেয়া হয়। এবং এই জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

Old testament এ বর্ণিত- A virtuous women is a Crown to her husband. এবং Behind every greatman there is a women. এই বাক্যগুলো এখানে বাস্তবরূপে এসেছে। ৬ দফা আন্দোলনের সময়ের দৃঢ়তা, লাহোর গোলটেবিল বৈঠকে প্যারোলে অংশগ্রহণ না করার পরামর্শ, ভুট্টোর সাথে ছয় দফা নিয়ে সমঝোতা না করার পরামর্শ আর যে দূরদর্শিতা দেখিয়েছিলেন তা ইতিহাসে বিরল। দেশ, দেশের জনগণের ব্যাপারে অনমনীয় ছিলেন বঙ্গমাতা। সময়ের চাহিদা ঠিকমতো বুঝতে পেরে পরামর্শ প্রদান বা দিকনির্দেশনা সবাই দিতে পারে না। কিন্তু রেনু পেরেছিলেন। কারণ, তাঁর হৃদয়, মন, মন-মানসিকতা আর অন্তরের সবটুকু নির্যাস দিয়ে ভালোবেসেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে। বঙ্গবন্ধু শৈশবে ছিপছিপে হালকা-পাতলা ছিলেন। তাঁর জন্য শৈশব থেকেই বরাদ্দ ছিল ছানা, ননী, দুধ, ঘি। উনার খাবারের জন্য বিশেষ নজর রাখতে হত। সংসার শুরুর পর থেকেই রেনু স্বামীর খাবারের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। একই মায়ের কোলে দুজন বড় হবার কারণে তাদের আহারে অনেক মিল ছিল। তবে রেনুর নিজের রুচি অরুচির প্রতি অতিরিক্ত কোনো আকর্ষণ না থাকলেও স্বামীর রুচির প্রতি ছিল তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

শেখ রেহানা তাঁর বাবার প্রতি মায়ের ভালোবাসা ও যত্নের কথা বর্ণনা করেন এভাবে- 'যখন গ্যাস ছিল না গরমের ভেতর দিয়ে কাঠের চুলায় ফুঁ দিয়ে ঘর্মাক্ত কলেবর হতে মাকে দেখেছি, তবুও বাবার রান্না তিনি বরাবরই নিজ হাতে করতেন।' তিনি নিজ হাতে শুধু রান্নাই করতেন না, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় খাদ্যবস্তু তাঁর সামনে তুলে ধরা তাঁর সাধনার একটি অংশ ছিল। এমনকি যখন বঙ্গবন্ধু জেলে থাকতেন তখন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে স্বামীর প্রিয় পদগুলো রান্না করে পাঠাতেন। বঙ্গবন্ধু কোনদিন কোন সভা বা অনুষ্ঠানে অবিন্যস্ত জামা পরে গেছেন তা কেউ বলতে পারবে না। সবসময় পাটভাঙা পাঞ্জাবি আর পায়জামাতে এক অনন্য পুরুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু অনন্য পুরুষ হয়েছিলেন তাঁর নিভৃত সাম্রাজ্যের একমাত্র সম্রাজ্ঞীর কারণে। ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শেখ ফজিলাতুন্নেছা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ঘর আলো করে জন্ম নেন তাদের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনা। তখন বঙ্গবন্ধু কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে বিএ পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। মেয়ে জন্মের একমাস পর বাড়ি এসে কন্যাকে কোলে তুলে নেন। শেখ হাসিনার জন্মের ঠিক পরের বছর ১৯৪৮ সালের সালে দেশ বিভাগ হয়। ১৯৬৯ সালের ৫ আগস্ট শেখ কামাল, ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল শেখ জামালের জন্ম। ওই সময়গুলো ছিলো উত্তাল। সেই সময়গুলোতে শেখ মুজিব কখনো রাজপথে, কখনো আন্দোলনে-অনশনে ব্যস্ত। উত্তাল সেই সময়ে ফজিলাতুন্নেছা তাঁর হাল শক্ত হাতে ধরে রেখেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ যখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এসে ঘোষণা দেন- 'উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।' তখন শেখ মুজিব রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একত্রিত করে তিনি আন্দোলনের প্রস্তুতি নেন। তিনি দেশের জন্য আন্দোলন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে পেরেছিলেন একমাত্র বঙ্গমাতার জন্য। কারণ, শেখ মুজিবকে কখনো সংসারের জন্য ভাবার সুযোগ দেননি তাঁর সহধর্মিণী। এইসব আন্দোলনের ফাঁকে ফাঁকে যখনই তিনি বাড়ি আসতেন, তখনই সর্বপ্রথম দেশের কথা, দেশের জনগণের কথা বলতেন বঙ্গমাতার সাথে। দেশের অবস্থা ও রাজনৈতিক কর্মপন্থা নিয়ে দুজন পরামর্শ করতেন।

বঙ্গবন্ধুর অসংখ্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁর স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে। আকৈশোর গৃহিণী বেগম মুজিব সংসারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব খুব ভালোভাবে পালন করতেন। তিনি সারা জীবন অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে স্বামীকে বাঙ্গালীর মুক্তির আন্দোলনের উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়ে গেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৬ সালে তিনি মন্ত্রী নিযুক্ত হলে তিন নম্বর মিন্টু রোডে সরকারি ভবনে বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে দলের নির্দেশে তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন এবং ১৫ নম্বর আব্দুল গণি রোডের বাসভবনে ওঠেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সেই সময়ের কষ্ট আর দুর্ভোগের কথা আমরা সবাই জানি। বঙ্গমাতা সেই কষ্ট জয় করেছেন হাসিমুখে। ১৯৫৬ সালে শেখ হাসিনাকে টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দির স্কুলে ভর্তি করে দেন তিনি। ১৯৫৮ সালে বঙ্গবন্ধু সামরিক আইনে গ্রেফতার হলে তাঁর পরিবার সেগুনবাগিচায় উঠেন। বঙ্গমাতার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো আবাসন সমস্যা। অবশ্য ১৯৬০ সালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে নির্মাণ শুরু হয় তাঁদের নিজের বাড়ীর। এবং ১৯৬১ সালের ১অক্টোবর নতুন বাসায় বসবাস শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব ছিলো না, যদি না বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার মত মানবিক নারীর সহযোগিতা না থাকতো। যতবার বঙ্গবন্ধু জেলে গেছেন, ততবারই তাঁর যোগ্য স্ত্রী কাপড়চোপড় গুছিয়ে দিতেন আর লেখালেখি করার জন্য সাথে দিতেন খাতা-কলম। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা 'কারাগারের রোজনামচা' গ্রন্থের শুরুতে লিখেন- 'আমার আব্বা যতবার জেলে যেতেন, মা খাতা কলম দিতেন লেখার জন্য। বারবার তাগাদা দিতেন। আমার আব্বা যখন জেল থেকে মুক্তি পেতেন, মা সোজা জেল গেটে যেতেন আব্বাকে আনতে আর আব্বার লেখাগুলি আসে তা নিশ্চিত করতেন।' বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা প্রেরণা না দিলে আমরা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতেই পারতাম না।

১৯৬৪ সালের আগস্ট মাসে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়ি নির্মাণের জন্য বঙ্গমাতা গৃহনির্মাণ সংস্থা থেকে ৩২ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। আমরা বেগম মুজিবকে এক দূরদর্শী নারীরূপে দেখি তাঁর সংসার যাত্রায়।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামে উত্তাল হয়ে উঠল সারাদেশ। ভুট্টোর প্রবল বিরোধিতার মুখে ঢাকায় নির্ধারিত ৩ মার্চের গণ পরিষদ অধিবেশনে ১ মার্চ ঘোষণার মাধ্যমে স্থগিত করে দেয়ায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে বাংলার আপামর জনতা। ২ মার্চ হরতাল পালিত হয়। ৩ মার্চ পল্টনের জনসভায় লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন বঙ্গবন্ধু। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভার ঘোষণা দিলেন তিনি। ৭ মার্চ ভাষণে যাওয়ার আগেও বঙ্গবন্ধু বঙ্গমাতার পরামর্শ শুনেছিলেন। ঘর থেকে বের হবার আগে তাঁর স্বামিকে ডেকে নিয়েছিলেন, তাঁর সাথে কারা যাচ্ছেন তা জেনে প্রথমে বলেছিলেন জনসভায় যাওয়ার পথ পরিবর্তন করতে। পরামর্শ দিয়েছিলেন অন্য কারো পরামর্শ না নিয়ে নিজের বুদ্ধি আর বিবেক যা বলে তা বলার জন্য। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ লিখিত ছিল না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বঙ্গবন্ধুকে ফজিলাতুন্নেছা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, 'তোমার পিছনে ইয়াহিয়ার বন্দুক এবং সামনে মুক্তিকামী মানুষের অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা।' ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আত্ম জাগৃতির দীর্ঘ পথ বেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাকাব্য রচিত হলো। তাতে সর্বত্রই শেখ মুজিবুর রহমানের কথা কাহিনী বর্ণিত আছে। সেই মহাকাব্যে ক্ষুদ্র পরিসরে আছেন আমাদের বঙ্গমাতা। বঙ্গমাতার বিশালতা ও ব্যাপ্তি প্রতি পাতায় পাতায় হওয়া উচিত ছিল।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ও যুদ্ধকালীন তিনি তাঁর ডানার আড়ালে রেখেছেন সন্তানদের। তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে সন্তানদেরকে বলেছেন- ' কতবার কত দুর্দশায় পড়েছি, এবার না হয় একটু বেশি কষ্ট হবে।' চারিদিকে যুদ্ধ, যত্রতত্র হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, এরমাঝে সমস্ত দেশের দায়িত্ব ছিলো বঙ্গবন্ধুর উপর। সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেনাপতিকে পেছন থেকে সাহস যুগিয়েছেন যিনি, তিনি আর কেউ নন, আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শেখ ফজিলাতুন্নেছা একে অপরের সাথে এত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত যে, কাউকে আলাদা করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। ফজিলাতুন্নেছা তিন বছর বয়স থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে মৃত্যু পর্যন্ত একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। তাঁরা পরস্পর পরস্পরের সৌরভে বিমোহিত ছিলেন। রেনুকে শেখ মুজিবের অলংকার মনে করা হলেও শুধুমাত্র শেখ মুজিবই জানতেন তাঁর জীবনীশক্তি আর প্রাণরস তিনি রেনুর থেকেই প্রতিনিয়ত পেয়ে রাজনীতির স্বর্ণশিখরে উঠেছিলেন।

'দেবী নহি, নহি আমি সামান্যা নারী
পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্ব, সে নহি নহি
হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে, সে নহি নহি
যদি পার্শ্বে রাখো মোরে সংকটে, সম্পদে
দুরূহ চিন্তার যদি অংশ দাও
সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতের সহায় হতে
পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে।'

রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদার এই ক'টি লাইনের ভাবার্থ সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত হয় আমাদের জাতির জনক-জননীর জীবনে। বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের কোথাও বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছার নাম উচ্চারিত হয়নি, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও হয়নি সেরকমভাবে। তবুও তাঁর অবদানের কথা চাপা পড়েনি, পড়বে না কোনদিন। সূর্যের আলোর মত এখন তা বাংলার দিকে দিকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত