২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:২৫
আমি গ্রাম থেকে আসা মানুষ; শিক্ষাজীবনের প্রথম দশ বছর ভালো স্কুল, ভালো বই, গ্রন্থাগার, শিক্ষক-সঙ্গ, সংস্কৃতিচর্চা প্রভৃতিতে পিছিয়ে পড়া। মাধ্যমিক পাশের পর সিলেট শহরে এসে কলেজে ভর্তি হই এবং বাতাসে প্রথমেই ভেসে আসে একটি নাম সফিউদ্দিন আহমদ।
এমসি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রছিলাম আমি, এখানে ইংরেজি পড়াতেন অধ্যাপক শফিকুল আমিন; তাঁর মুখে প্রথম শুনি গ্রিক মিথলজির কথা, শেক্সপিয়র ও ও’ হেনরির কথা। আনোয়ারুল হক বলে একজন শিক্ষককে পাই যিনি গ্রিক নিয়তিবাদের সবক দিতেন। কলেজের লাইব্রেরিটা ছিল সমৃদ্ধ; এখান থেকে বই নেওয়া শুরু করি এবং একদিন সফিউদ্দনকে আবিষ্কার করি শহরের একটি অনুষ্ঠানে, দেখে তাজ্জব বনে যাই; ভুল বলা হলো, যতটা না দেখে তারচেয়ে বেশি তার মুখনিঃসৃত বাণী শুনে।
দীঘল চেহারা, শোভনভঙ্গি ও পাজামা-পাঞ্জাবিপরা অত্যন্ত রুচিশীল মানুষ এর আগে দেখেছি বলে মনে পড়েনা; যেমন তাঁর উচ্চারণ-সাবলিলতা, তেমনি কথায় ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। জ্ঞানী মানুষ; দেখলেই মনে সমীহ জাগে, ভক্তি আসে। প্রথম যে কথাটি শুনছিলাম তাঁর মুখে : ‘নানান বরণ গাভীরে ভাই/একই বরন দুধ/জগৎ ভরমিয়া দেখি একই মায়ের পুত।’ কথাটি হয়তো সহজ, কিন্তু কি গভীর কথা! হয়তো একই বক্তৃতায় শুনে থাকব আরেকটি কথা : ‘শুনহ মানুষ ভাই/ সবার উপরে মানুষ সত্য/তাহার উপরে নাই।’ মধ্যযুগের এক বাঙালি কবির নামও প্রথম শোনা হলো জীবনে। কবি চণ্ডীদাস। কে জানত এই চণ্ডীদাসের কীর্তনই পরবর্তী কালে আমার জীবনের প্রধান একটি অবলম্বন হয়ে উঠবে!
এবারে শ্রেণিকক্ষের পালা। এমসি কলেজের আর্টস বিল্ডিংয়ের শ্রেণিকক্ষে যেদিন তাঁর ক্লাস, সেদিন তো লোকে লোকারণ্য। কে কোন ক্লাসের, কে কোন সেকশনের ইয়াত্তা নেই। সবাই এসে ভীড় করত তাঁর ক্লাসে, আগেবাগে জায়গা দখল না করলে বসে লেকচার শুনতে মুশকিল হয়ে পড়ত। অনেকে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকত, কেউ-বা বারান্দার দিকের জানালায়, পেছনের দরজায়। আর সবাই মন্ত্রমুদ্ধ হয়ে শুনছে তাঁর কথা।
তিনি হয়তো ক্লাসে পাঠক্রমের কিছুই পড়ালেন না; হয়তো প্রসঙ্গটা তুললেন ‘হৈমন্তী’র, কিন্তু তার পর কোথায় যে গিয়ে থামতেন, আমার সহপাঠীরা ভালো জানে। অনার্সের ক্লাসেও কোনো টেক্সট যে ধরে ধরে পড়াতেন তাও নয়, কিন্তু একজন শিক্ষকের যা করার দরকার তা-ই করতেন। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানব্রতী করো তোলা, ভিতরে শক্তির যোগান দেওয়া।
নব্বইয়ের দশকের শুরুটা নানা কারণে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই সময়টাতেই আমি সফিউদ্দিনের ছাত্র ছিলাম। তখনও তিনি অধ্যাপক হননি। অথচ নিজে ছিলেন একজন বড়ো মাপের অধ্যাপকের প্রতিকৃতি।
শ্রেণিকক্ষে তিনি বিশেষ এজন্ডা নিয়ে আসতেন তিনি। সেটা কী? ‘মানুষের মতো মানুষ হওয়া’! এই কথাটা কত যে বলেছেন ক্লাসে ‘মানুষ হও’। এই বড়ো মাপের মানুষ হওয়ার সঙ্গে তিনি যুক্ত করতেন পুরাণের কাহিনি, ইতিহাস, কিংবদন্তি আর কত গালগল্প। মানুষের অনেক দায়িত্ব আছে, এই কথাটাও প্রথম শুনেছিলাম তাঁর কাছে। তাই বলতেন : তোমাদের একহাতে থাকবে কলম, আর অন্য হাতে হাতুড়ি। প্রসঙ্গত মার্কসবাদের কথা এসে যায়, কিন্তু প্রকাশ্যভাবে শ্রেণিকক্ষে রাজনীতির কথা বলেছেন সেটা মনে পড়ে না। তিনি সমাজপরিবর্তনের কথা বলতেন; ঘুণেধরা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গঠনের কথা বলতেন। যেন এটাই তাঁর স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা।
বলতেন ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যাও। বাঙালিত্বের কথা বলতেন। হ্যাঁ, প্রাচীন কবি ভুসুকু পা-র কথা বলতেন। ‘আজি ভুসুকু বাঙালি ভইলি’; যে-আত্ম পরিচয়ের সংকট বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে তীব্রভাবে বিদ্যমান, হয়তো সেটাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করত এমন কথা বলতে।
বাঙালির জাগরণের গল্পও এসে যেত অনায়াসে ওই মানুষ হওয়ার উপদেশে। রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত বারবার উঠে আসত তাঁর কথায়, যে কোনো ক্লাসে। হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও তো আসতোই সারাক্ষণ। মেয়েদের দিকে ঝুঁকে ধমকের সুরে বলতেন, রোকেয়ার নাম শুনেছ? সেই যে বাংলার নারীজাগরণের অগ্রদূত? সেই রোকেয়ার কথা শুনতে হবে! অবরুদ্ধ সমাজের অর্গল ভাঙতে হবে।
কিন্তু মানুষ কত বড়ো? মানুষ কতই-বা ছোটো? এ কিন্তু বলতেন না কখনো। উদাহরণ দিতেন শুধু। বলতেন আলেকজান্ডারের দিগি¦জয়ের কথা; আবার নাৎসি-জার্মানও এসে যেত কথায় কথায়; আধিপত্যবাদের প্রসঙ্গে, নিজেদের জাহিরের প্রসঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কনসেনট্রেশন সেলের কথাও আসত। আর মানুষের অগ্রগতির কথা আসলেই বলতেন সক্রেটিস থেকে সার্ত্রে, হোমার থেকে শেলি, বোদলেয়ার থেকে র্যবো, গোর্কি থেকে আনা আখমাতোভা, কালিদাস থেকে জয়দেব প্রমুখের কথা।
সামনে যারা তাঁর শ্রোতৃমণ্ডলী, এরা হয়তো প্রস্তুত নয়, এসবে। গ্রাম থেকে যারা কলেজে এসেছে, পাঠ্যবইয়ের বাইরে একটাও বই দেখেনি যে; একটা পংক্তিও পড়েনি যে; পড়া প্রয়োজন মনে করেনি যে তাদের সামনেই অনর্গল বলে যেতেন নিজের কথাগুলো। আমার মনে হয় তাঁর উদ্দেশ্য সকল সময় আপামর ছাত্র ছিল না, এসব কথা যাদের মাথায় ঘা মারতে পারে, তেমন এক-দুজনের উদ্দেশ্যেই তিনি বক্তৃতা দিতেন।
না হলে ইন্টারমিডিয়েটের ক্লাসে, অথবা ফার্স্টইয়ার অনার্সের ক্লাসে তিনি ফরাসি প্রতীকবাদী কবি মালার্মের কথা বলবেন কেন? সার্ত্র কিংবা বার্টার্ন্ড রাসেলের কথা বলবেন কেন? কেন পবলো পিকাসোর গোয়ের্নিকা ছবির কথা বলবেন? অস্ত্রের মুখে শ্বেতকপোত চিত্রকর্মের কথা বলবেন? তাঁর আপমর ছাত্রছাত্রী কি তা মনে রেখেছে এসব?, ভেবেছে কিংবা ভেবেছিল এসবের তাৎপর্য তখন?
ক্লাসের মধ্যে এমন নায়কোচিত যিনি, তিনি আবার ছিলেন খুব হাতের কাছের মানুষ। চাইলেও তাঁর দেখা মিলত, তাঁর সঙ্গ লাভ করা যেত। আমার মনে হয় এটা তার সবচেয়ে বড়ো গুণ ছিল। অনাবশ্যক দূরে ঠেলে না দিয়ে ছাত্রদের কাছে টানা, এ যুগে যেটা বিরল ঘটনা বলে মনে হয়। কলেজের নিজকক্ষে যে শুধু সান্নিধ্য মিলত তা নয়, ছাত্র যদি চায় তাঁর বাসভবনের সদরকক্ষেও দেখা মিলত। থার্ড গ্রেডের একট ছাত্রকেও দিতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ভাবিকেও জ্বালাতন করতেন আপ্যায়নের প্রস্তাব করে।
আমার মনে আছে মুরারিচাঁদ কলেজে যখন সবে ভর্তি হয়েছি, একদিন আবিষ্কার করি নিজেকে তাঁর ড্রইংরুমে। তাঁর সারা বাড়ি ছিল বইয়ে ভরা। রবীন্দ্র রচনাবলি থেকে শেক্সপিয়ারের রচনা পর্যন্ত। অত্যন্ত যত্ন করে গ্লাসের ভিতরে রাখা সেসব বইপত্র। বসার ঘরে, কিংবা বারান্দার দিকে রয়েছে নিজের দৃষ্টিনন্দন কিছু পোর্টেট, তারুণ্যের, যৌবনের এবং মধ্য বয়সের। অভিভূত হওয়ার মতো। সেই সন্ধ্যার কথা কখনো ভুলি না আমি। আমাকে বলেছিলেন একটি বইয়ের কথা লাস্ট ডেইজ অব সক্রেটিস। অনুবাদ করছিলেন তিনি। বলেছিলেন পড়ার জন্য। তখনো বাংলা অনুবাদে রাসেলের হ্যাভ ম্যান ফিউচার বের হয়নি। বলেছিলেন পড়ে দেখো।
আমার কাছে তখনো ‘ক অক্ষর গোমাংস’। আর তিনি কিনা সক্রেটিস আর রাসেল পড়তে বলছেন! সেটা কি আমাকে উদ্দীপনা দেয়নি তখন? আমাকে সাহস দেয়নি? আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়নি? অনেক বছর পর ২০২৫ সালে আমি সক্রেটিসের ওপর একটা বই লিখতে গিয়ে বার বার তাঁর কথা মনে হয়েছিল। বিষয়টি কি এমন যে, সে-সন্ধ্যার রোপিত সেই বীজ দীর্ঘকাল পরে মাটি ভেদ করে উপরে উঠে এসেছে? এ জন্যই কি রাসেল ও সার্ত্রে আমার প্রিয় দার্শনিক?
ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবতাবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এই কথাগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতেন তিনি। বলতেন মানবমুক্তির কথা। অনেক পরে জেনেছিলাম তিনি উদীচীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আছেন; যে-উদীচী এদেশে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব করতে চায়, যে-বিপ্লব মানবমুক্তি ও মানবপ্রগতির। তিনি মনে করতেন তারুণ্য এমন এক শক্তি যা দিয়ে অসম্ভবকে জয় করা যায়, হয়তো এজন্যে বারবার তারুণ্যকেই তোয়াজ করতেন; ডিরোজিও কথা বলতেন, স্রোতের বিরুদ্ধে চলা শক্তির কথা বলতেন। তরুণদের মনে যে-ঘুমন্ত মানুষটি আছে, সেই মানুষটিই তিনি জাগাতে চাইতেন, এটাই তাঁর জীবনের অভীপ্সা ছিল। একবার একটা সাক্ষাৎকারে বলেওছিলেন তিনি।
মানবসভ্যতার কোনো কালই মানবতাবাদ প্রচারের অনুকূল ছিল না; অধ্যাপক সফিউদ্দিনযে-সময়টাতে এবং যে-প্রতিবেশে ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবপ্রগতির কথা বলতেন সে সময়টা কি খুব অনুকূল ছিল তাঁর পক্ষে? নিশ্চয় তা নয়, এখন আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে দাঁড়াই, ভাবি সেই সময়ে তিনি কিভাবে এমনসব কথা বলতে পারতেন? ছাত্রদের সঙ্গে ধর্মকাহিনির নানা কল্পকথার নিসংকোচে বলতে পারতেন? চিন্তার পরিসর তৈরি করতেন? আমার কাছে এটা বিস্ময় লাগে। তিনি বলতে পারতেন, কারণ তিনি নির্ভীক ও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। এখন আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তিনি সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন এবং নিজেও প্লেটো তৈরির জন্য একটা জীবন পার করে দিয়েছেন!
তাই বলে সক্রেটিসের মতো নির্যাতিত ও নিপীড়িত হননি কি তিনি? অপপ্রচার, কৃৎসা ও চরিত্রহননের শিকারও কি হননি? কিন্তু এতে কি তাঁর ক্ষতিবৃদ্ধি হয়েছে কিছু? তাঁর কাজটি তো তিনি করে গেছেন। গীতার সে বাণী ধারণ করেই : ফলের আশা না করে কাজ করে যাও।
আমার জিজ্ঞাস্য: যে প্লেটোর খোঁজে সারাজীবন তিনি কাটিয়ে দিলেন, তেমন প্লেটো কি তৈরি হয়েছিল তাঁর জ্ঞানকাণ্ড থেকে? জ্ঞানতাত্ত্বিক জগতে সক্রেটিসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন প্লেটো, সফিউদ্দিনকে কেউ করেছে? না হলে করেনি কেন? তিনি তবে ব্যর্থ?
সক্রেটিস স্তাবকদের পছন্দ করতেন না, সফিউদ্দিন কি করতেন? আমার জানা নেই। কিন্তু যে-বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবপ্রগতির কথা বলতেন, যুক্তি দিয়ে বিশ্বাস বা আবেগকে বিচার করতে বলতেন তাঁর ছাত্ররা কি সেই সবক নিতে পেরেছে তাঁর কাছ থেকে? এটা এক বড়ো প্রশ্ন। কারণ তাঁর অনেক ছাত্রদের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে!
সফিউদ্দিন শেক্সপিয়র বড়ো পছন্দ করতেন; গ্রিক ট্রাডেডিও তাঁর প্রিয় ছিল। নিজে বলেছেন আমাকে, হয়তো অনেককে যে, শেক্সপিয়র কিংবা সফোক্লিস নিজে ট্রাজিক চরিত্র হওয়ার কারণেই এমনসব ট্রাজেডি তাঁরা তৈরি করতে পেরেছিলেন। আমার বিচারে, যে-ক্ষণে সফিউদ্দিন আহমদ প্রয়াত হন; তাঁকেও কেন জানি আমার একজন ট্রাজিক হিরোর মতোই মনে হয়েছে; গ্রিক নিয়তিবাদে নিয়তি ছিল অদৃশ্য এক সত্তা, আর তাঁর নিয়তি নিজের দ্যাশ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, স্বকালের মানুষ অথবা সময়।
ডক্টর জফির সেতু: কবি, আখ্যান-লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
আপনার মন্তব্য