রিপন দে, মৌলভীবাজার

১৫ মার্চ, ২০২১ ২১:১০

সাতছড়ির মান্দার গাছ: দেশে জনপ্রিয়, বিদেশেও পরিচিত

মান্দার বা পারিজাত যে নামেই গাছটিকে লোকে চিনে থাক তার লাল ভুবন ভোলানো ফুল, যে কারোরই নজর কাড়ে। মান্দারের একটি গাছ দেশে বিদেশে বিখ্যাত হয়ে ওঠেছে; বলা চলে এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই মান্দার গাছটি। হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ওয়াচ টাওয়ারের পাশে এই মান্দার গাছের অবস্থান। যে গাছটির জন্য প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন অনেকেই। এই গাছের দিকে লেন্স তাক করে দাঁড়িয়ে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

সাতছড়ি একটি জাতীয় উদ্যান হলেও এই গাছটিই প্রকৃতিপ্রেমী এবং আলোকচিত্রীদের কাছে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষার এবং পরিচিত। শুধু তাই নয় বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড জয় করে নিয়েছে এই গাছের ছবি। বসন্তের দিনে এই গাছের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশের আর কোথাও বা কোন বনে একটি গাছের সামনে এত ভিড় বা একটি গাছের পরিচিতি বিশ্বব্যাপী আছে বলে জানা নেই কারো। সে হিসেবে দেশের সব চেয়ে জনপ্রিয় গাছ এই মান্দার গাছটি। দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে ছুটে আসছেন বন্যপ্রাণি আলোকচিত্রীরা। তাঁবু রাত কাটিয়ে দিচ্ছেন এই মান্দার গাছের পাশেই।

বিশেষ এই গাছটির জনপ্রিয়তা নিয়ে কথা বলেন সম্প্রতি সাতছড়ি ঘুরে যাওয়া আইইউসিএনের মুখ্য গবেষক সীমান্ত দিপু। তিনি জানান, সাতছড়ির এই মান্দার গাছে যেন পুরো একটি বনের পরিচয়! প্রকৃতিপ্রেমিক কিংবা পর্যটক সবাই এখন এই গাছটিকে চেনেন। বসন্তে কত মানুষ যে এর ছবি তুলতে যান তা বলে শেষ করা যাবে না। বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন আলোকচিত্রী বিশ্বখ্যাত অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন এর ছবি তুলে। এই গাছটিকে উপভোগ করতে হলে একটি টাওয়ারে উঠতে হয়। ছুটির দিনগুলোতে এই টাওয়ারে জায়গা পাওয়া মুশকিল। আমাদের দেশে একটি বনের সৌন্দর্য দেখতে আর কোথাও এত মানুষের ভিড় আছে কিনা সন্দেহ!

মান্দার গাছটি শুধু মানুষের কাছেই জনপ্রিয় নয়। পশুপাখির কাছেও সমান প্রিয়। প্রায় ৪০ জাতের পাখি ঘুরে ফিরে এই গাছে দেখা যায়। বেশিরভাগই পোকাখেকো। কিছু কিছু মধু খেকো। পতঙ্গদেরও প্রিয় জায়গা এই গাছের ফুল। দেখা মিলে কাঠবিড়ালিসহ গিরগিটি।

এই মান্দার গাছের উপর বসা কাঠশালিকের ছবি তুলে উইকিলিকস অ্যাওয়ার্ড জয় করেছেন বগুড়ার আলোকচিত্রী তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব। তিনি জানান, যারা বার্ডিং (পাখির ছবি তোলা) পছন্দ করেন তাদের জন্য সাতছড়ি একটি স্বর্গ। ওয়াচ টাওয়ারের সামনে থাকা মান্দার গাছটি সারাদেশের সব বন্যপ্রাণি আলোকচিত্রী পর্যটকসহ দেশ বিদেশে পরিচিত। বসন্তে এই গাছের কাঠ শালিকের ছবি অনেক আন্তর্জাতিক বিখ্যাত বিখ্যাত অ্যাওয়ার্ড জয় করেছে। বসন্তে এখানে এক বা একাধিকবার যেতেই হয়। আমি অন্তত ৫০ বার এখানে গিয়েছি। এই বছরও গত সপ্তাহে একবার গিয়ে এসেছি আগামী সপ্তাহে আবার যাব। তবে গত সপ্তাহে পুরোটা সময় আমরা প্রায় ১০ জন যেমন মান্দার গাছের সামনেই কাটিয়ে দিয়েছি আগামীতেও তাই হবে। আমরা পাখির ছবি তুলতে যাই। সবচেয়ে দূর পঞ্চগড় থেকেও আমাদের সাথে একজন যোগ দিয়েছিলেন। বসন্তে মান্দার গাছে কাঠ শালিকের ছবির চেয়ে সুন্দর ছবি আর কি হতে পারে। তবে প্রচুর ভীর থাকে ফটোগ্রাফারসহ পর্যটকদের। পছন্দমত ছবিতোলার জন্য জায়গা পাওয়াই কঠিন।

উল্লেখ্য, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় ভারত সীমান্তবর্তী দেশের সবচেয়ে ছোট জাতীয় উদ্যান সাতছড়ি। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা নিয়ে বিস্তৃত বনটি মূলত ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট বা মিশ্র চির সবুজ এবং পাতাঝরা বন। পার্শ্ববর্তী পাম বাগানসহ সব মিলিয়ে বনটির আয়তন ২৪৩ হেক্টর। আকারে ছোট হলেও উদ্যানটি পাখিদের জন্য স্বর্গরাজ্য। এত ছোট জায়গায় এত বেশি পাখি দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। বিশ্বের অনেক সমৃদ্ধ বনেও এত পাখির দেখা মেলে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, যে কোনো বনে প্রতি এক কিলোমিটারের ভেতর সাধারণত ৫০ প্রজাতির বেশি পাখি বসবাস করে। কিন্তু সাতছড়ি একমাত্র বন যেখানে এক কিলোমিটারের ভেতর প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। অনেক বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির পাখিও পাওয়া যায় এখানে। তাই দেশের পাখিপ্রেমী ও ফটোগ্রাফারদের কাছেও এই বন রয়েছে পছন্দের তালিকায় একেবারে শীর্ষে। এখানে রয়েছে বিরল লালমাথা-কুচকুচি পাখি। আছে শ্যামাঘুঘু, হরিয়াল, সবুজ-ধুমকল, পাপিয়া, হুতুম-প্যাঁচা, নীলদাড়ি-সুইচোরা, সুমচাসহ নানা জাতের বিপন্ন, বিরল এবং মহাবিপন্ন পাখি, যা সুন্দরবন ছাড়া দেশের অনেক বনেই নেই। ময়না-টিয়ার দেখা এখানে খুব সহজেই পাওয়া যায়। এবার করোনার কারণে মানুষের ভিড় কম থাকায় সাতছড়ি বনে পাখিরা নিজেদের মতো প্রজনন করতে পারছে। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতি বছর পাখির প্রজনন মৌসুমে মানুষের যাতায়াত বন্ধ রাখা যেতে পারে।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা পাখিবিদ ড. ইনাম আল হক জানান, এক কিলোমিটার বনে ৫০ প্রজাতির জায়গায় সাতছড়িতে ২০০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। এটা মোটেও ভালো খবর নয়। এত বড় দেশ আমাদের। কিন্তু পাখিদের বসবাসের ভালো জায়গা না থাকায় সেগুলো এখানে থেকে যায়।

তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে বনটি আমার কাছে খুবই প্রিয়। কারণ এখানে এত বৈচিত্র্যপূর্ণ গাছ এবং লতাপাতা আছে সেই সঙ্গে আছে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ। যা এই বনকে সমৃদ্ধ করেছে। ছোট একটি বনে দুইশ প্রজাতির পাখি তখনই থাকবে যখন তাদের জন্য আলাদা আলাদা খাবার পাওয়া যাবে। এটা একটা ভালো দিক। আমি প্রায় শতবার এই বনে গেয়েছি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত