সালেহ আহমদ খসরু

২২ এপ্রিল, ২০২২ ২২:০৮

গোলাপগঞ্জের ‘গোলাপ’!

‘খান বাড়ির’ মানবিক কর্মের সুনাম এমনিতেই চলমান। ধর্মকর্ম করেন সকলেই, মরহুম কমর উদ্দিন আহমদ খান ও বেগম লুৎফুন্নেছা খান যে শিষ্টাচারে পরিপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ রেখে গিয়েছিলেন তার অণু-রেণু ছড়িয়ে আছে তাঁদের বহমান অস্থিমজ্জা জুড়ে।

মহান রব আল্লাহ পাকের ইচ্ছেতে কমর উদ্দিন আহমদ খান বেশিদিন পৃথিবীতে ছিলেন না।  কিন্তু বেগম লুৎফুন্নেছা খান তাঁর সাত ছেলে ও এক মেয়েকে আঁচল দিয়ে আগলে রেখে থেমে যাননি, বরং সকলের একাডেমিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধ সুনিশ্চিত করতে কদম-কদম নিবিড়ভাবে যেমন চোখের আড়াল করেননি তেমনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কালক্ষেপণ করেননি। তাই আজ তাঁরা কেউ ব্যাংকার-ডাক্তার-উকিল-সামরিক বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা-ঔষধ ব্যবসায়ী-প্রবাসী; কিন্তু একজনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির বাইরে নয়। এমন আলোকিত পরিবারে আলোর ধারা বইবে এটাই মানুষ আশা করে, এবং সেই বিশ্বাসে তারা চলমান ও অবিচল।

প্রবাসী ভাই শরীফ উদ্দিন আহমদ খান যুক্তরাজ্যে হতে এসে ঘুরে গেলেন গত মার্চ মাসে, অবসর কাটানোর সময় যেন তাঁর ছিলো না। গড়ে তোলা 'কমর উদ্দিন খান ও লুৎফুন্নেছা ফাউন্ডেশন' যা পিতামাতার নামে-সেটি সক্রিয় করতে উদ্যমী হয়ে কার্যক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ লক্ষ্যে ভাই সহযোগী অধ্যাপক ডা. রফিক উদ্দিন আহমদ খান চক্ষু বিশেষজ্ঞ, তিনি তাঁর সহযোগী নিয়ে ব্যাপক আয়োজনে ফ্রি চক্ষু শিবির করেন বিগত ১৭ মার্চ দিনভর। সরকারি ছুটির দিন হওয়াতে চিকিৎসক হতে রোগীর কারোরই মেডিকেল ক্যাম্পে আসতে বেগ পেতে হয়নি। এ আয়োজন যাতে সাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে সে আয়োজনেও কমতি ছিলো না; মাইকিং করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রচার করা হয় যাতে শেকড়ের সব মানুষের কানে পৌঁছে এ উদ্যোগ। এমন উদ্যোগে শতাধিক নারী-পুরুষ এবং শিশু পর্যন্ত এসে চিকিৎসা নিয়ে যান গোলাপগঞ্জের দাড়িপাতনের খান বাড়িতে। চক্ষু শিবির কার্যক্রম উদ্বোধন করেন গোলাপগঞ্জ পৌরসভার মাননীয় মেয়র আমিনুল ইসলাম রাবেল; শত ব্যস্ততা এড়িয়ে মানবিক কাজে নিজের হাত প্রসারিত করেন। আরও এসেছেন সমাজ কল্যাণ দপ্তরের গোলাপগঞ্জ প্রধানসহ তাঁর সঙ্গীয় অপরাপর কর্মকর্তা।
 
আমি হতে শুরু করে নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন (অব.) খান বাড়ির আরেক রত্ন গিয়াসউদ্দিন আহমদ খান, মিসেস তাহমিনা সীমা খান। কবি মিসেস নার্গিস জাহান খান আসেননি নাজিমউদ্দীন খান এপ্রিলের ১১ তারিখ ওপেন হার্ট সার্জারি করাবেন সেই প্রস্তুতি নিতে। না হলে কবিতার আড্ডা আরও একটু করে জম্পেশ হতো নিশ্চিত। ছিলেন মিসেস রফিকউদ্দিন আহমদ খান বা শেফা আপা। প্রাঞ্জল মিশুক এবং প্রকৃতি বিলাসী বলেই মনে হলো শেফা বোনকে। আরও ছিলেন ছড়াকার শাহাদাৎ বখত, সাংবাদিক ছড়াকার সাদির মোহাম্মদসহ প্রমুখ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। জানানো উচিত হবে, ছড়াকার বখত সাহেব খান সাহেবদের মামাতো ভাই।

শত ফুলের খুশবু, আর সকল কাজের মুল ঠিকানা খান পরিবারের অন্যতম দিশারি নাজিমুদ্দিন আহমদ খান। যিনি শারীরিক অসুস্থতা হেতু নিজে উপস্থিত না থেকেও বাকি সকলে যাতে হাজির হন সেজন্য তার হাতের মুঠোফোন সচল রেখেছেন পরম মমতায়। ভাই শফি উদ্দিন আহমদ খান মোহন ও মহিউদ্দিন আহমদ খান মহি ভাই যেন খান বাড়ির এ কোন সে কোন এপার-ওপার করা গোদারা। কখন ঘাটে ভিড়বে তরী, যাত্রী পারাপারে কোথাও কি ব্যত্যয় হলো কি-না তার চুলচেরা নজরদারি করা ফরজ মনে করে যেন ব্যস্ততার রেলগাড়ি। মোহন ভাইয়ের ভোজন গল্প রসের রসিকতায় পৌঁছাতে ব্যস্ত যেমন সকল প্রাণ, তেমনি স্বজন সবে ভাবনার অকুল হয়ে ত্রস্ত হরিণের মতো ঘুরেফিরে একই কথা, পরিমিত খাওয়া দাওয়া করবে বেশ- কিন্তু আজ পরিমিত হতেই হবে তা কে বললো!  এবং সে নিজের জন্যে যতোখানি সকলের জন্যও অতোখানি।  স্ত্রী সন্তানদের তরে তারচেয়ে বেশি কথা হলো—হালাল সব খেতে হবে তবেই তো শক্তিশালী শরীর ভবিষ্যতে স্থিতিশীল জীবন দেবে, এমন হরেক রঙ মাখানো বাতচিত।

মহি ভাই পানের রসে আস্বাদিত ঠোঁট ও চকমকে চোখে ঝিলিক দিয়ে বললেন—হু, কিছু মোটা হয়েছি! কী বলেন! এমন সাবলীল প্রশ্নের উত্তর কী হতে পারে!  হয়, যখন হয় তখন সবটুকু তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলতেই হয়—হ্যাঁ, একটু তাজা সরস লাগছে বটে! এমন সচলায়তনে মনে পড়ছে খান বাড়ির প্রধান খান সিরাজ উদ্দিন আহমদ খান সাহেবের কথা।  যিনি কোভিড-১৯ এর ভয়ঙ্কর ক্রান্তিলগ্নে যুক্তরাষ্ট্র হতে এসে ঘুরে গেছেন প্রিয় স্বদেশ৷ ছেলের বিয়ে দিয়েছেন, আমন্ত্রণ জানিয়ে খুব করে বলেছিলেন যেতে। কিন্তু আমি তখন করোনা হতে সদ্যস্নাত নতুন জীবন পেয়ে ক্লান্তি ও ভয় মিশ্রিত দিনাতিপাত করছি, যাওয়া হয় নি। আবার আসুন বড় ভাই, নিশ্চয়ই অনেক কথা হবে, ভাব হবে ভাবের রাজ্যে ইনশাআল্লাহ।