২৫ মে, ২০২৩ ১৮:৪৪
অরুন বিশ্বাস (১৬)। ছবি: সংগৃহীত, অস্পষ্ট (সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী)।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় অরুন বিশ্বাস (১৬) নামের এক হিন্দু যুবককে জোর করে তুলে নিয়ে হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত শনিবার (২০ মে) দিবাগত রাতে উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়নের আখালিমুরা গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটেছে। অরুন বিশ্বাস ওই এলাকার বাসিন্দা প্রবাসী জিতেন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে।
এ ঘটনায় ধর্মান্তরিত হওয়া অরুন বিশ্বাসের পরিবারের পক্ষে তার দাদা মনমোহন বিশ্বাস বড়লেখা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগের পরপরই ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে জানাজানি হয়।
থানায় পরিবারের দেওয়া লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার আখালিমুরা গ্রামের মনমোহন বিশ্বাস বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বড়লেখা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তার ছেলে শ্রী সত্যেন্দ্র বিশ্বাস বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বড়লেখা উপজেলা কমিটির প্রচার সম্পাদক। তারা সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতের লোকজনের সাথে তাদের রাজনৈতিক বিষয়ে বিরোধ চলছিল দীর্ঘদিন ধরে। শনিবার বিকেলে প্রাইভেট কারযোগে বাজারে যাওয়ার পথে মনমোহন বিশ্বাসের ছেলে শ্রী সত্যেন্দ্র বিশ্বাসের গাড়ির গতিরোধ করে বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতের কয়েকজন যুবক। এসময় তাদের সাথে সত্যেন্দ্র বিশ্বাসের কথা কাটাকাটি এবং মারামারির ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে তারা সত্যেন্দ্র বিশ্বাসের গাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে এবং তার উপর (সত্যেন্দ্রের) গুলি ছুড়ে তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলিতে গুরুতর আহত হন সত্যেন্দ্র বিশ্বাস। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে সিলেট ওসামানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। এদিকে সত্যেন্দ্র বিশ্বাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় শনিবার দিবাগত রাত ৮টার দিকে তালিমপুর ইউনিয়নের বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজতের ৪০-৫০ জনের একদল লোক দেশীয়-অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মনমোহন বিশ্বাসের বাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা চালায়। এসময় ভয়ে মনমোহনের বাড়ির ও আশপাশের বাড়ির লোকজন পালিয়ে যান। পরে তারা ঘরে আক্রমণ করে জোর করে মনমোহন বিশ্বাসের নাতি অরুন বিশ্বাসকে তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি মসজিদে নিয়ে তাকে (অরুন বিশ্বাসকে) জোরপূর্বক হিন্দু ধর্ম থেকে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। পরদিন রবিবার বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতের লোকজন অরুন বিশ্বাসের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের লোকজনকে হুমকি দিয়ে বলে যে, এ ঘটনায় বাড়াবাড়ি করলে পরিবারের সবাইকে প্রাণে হত্যা করে ফেলবে। এতে পরিবারের সদস্যরা এখন আতঙ্কিত এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (২৫ মে) দুপুরে এলাকায় গেলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ লক্ষ্য করা যায়। এলাকার লোকজন প্রাণ ভয়ে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলছে না।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার কয়েকজন হিন্দু বাসিন্দা বলেন, আমরা নিরীহ কয়েকটি পরিবার এলাকায় বসবাস করছি। আমাদের আশপাশে মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজন বেশি বসবাস করেন। এমনিতেই আমরা ভয়ে থাকি। অরুন বিশ্বাসের বিষয়ে প্রকাশ্যে সংবাদপত্রে বক্তব্য দিলে আমরা বড় ধরনের বিপদে পড়ে যাব।
অভিযোগকারী অরুন বিশ্বাসের দাদা মনমোহন বিশ্বাস বলেন, মৌলবাদী গোষ্ঠী আমাদের বাড়িতে আক্রমণ করে আমার নাতিকে জোর করে তুলে নিয়ে ধর্মান্তরিত করেছে। আমরা নিরীহ মানুষ। কোথাও ন্যায় বিচার পাচ্ছি না। থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। পুলিশও খুব একটা সহযোগিতা করছে না। আমরা আতঙ্কিত এবং চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।
যুবককে জোর করে তুলে নিয়ে হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার বিষয়টি সঠিক নিশ্চিত করেছেন তালিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ কান্তি দাস। তিনি বলেন, এই বিষয়ে পরিবারটিকে কোনো সহযোগিতা করতে পারছি না। কারণ ঘটনাকারীরা ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। এখানে আমি নিজেও খুব অসহায়।
বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়ারদৌস হাসান বলেন, এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করছেন এসআই অজয় কুমার পাল।
আপনার মন্তব্য